ইসলামিক ব্যাংক কি সুদ মুক্ত?
৯ মিনিটে পড়ুন১৯ আগস্ট ২০২০
ইসলামী ব্যাংকিং এর নেপথ্যে
উসমানীয় খিলাফতের শেষের দিকে খিলাফত রাষ্ট্রের মধ্যে পশ্চিমা ভাবধারায় বেড়ে ওঠা কতিপয় তথাকথিত ইসলামী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। এদের মধ্যে খাইর“দ্দিন আত তিউনিস (১৮১০-৯৯), জামাল আদ দ্বীন আল আফগানী (১৮৩৮-১৮৯৭), রাশিদ রিদা (১৮৬৫-১৯৩৫) ও এদের ভাবধারায় বেড়ে ওঠা হাসান আল বান্না (১৯০৪-১৯৪৯) প্রমুখ। এরা সমস্যা সঙ্কুল ও ধ্বংসন্মোখ খিলাফত ব্যবস্থাকে উদ্ধারের জন্য পশ্চিমা গণতন্ত্র, ফ্রিডম অব বিলিফ, ইত্যাদি কনসেপ্ট এর মাধ্যমে খিলাফত ব্যবস্থা সংস্কারের দাবী তোলেন। ইতোমধ্যেই ১৯২৪ সালে ধ্বংস হয়ে যায় খিলাফত ব্যবস্থা। তখন এই সংস্কার পন্থীরাই খিলাফত পুনরদ্ধারের জন্য কাজ শুর“ করলে অনেক উদ্দেশ্যহীন আন্দোলনের জন্ম হয়। কুফর শক্তির বিরদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে অকথ্য অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে ইখওয়ানুল মুসলিমিন প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে আপোষ করে খিলাফত পুনরদ্ধারের উদ্দেশ্য থেকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে দূরে সরে আসে ।
এই পরাজিত সৈনিকদের পরাজিত মানসিকতা থেকে আসতে থাকে ইসলামের নামে নানান কুফরী ধারণাসমুহ। ইসলামী পুঁজিবাদ, ইসলামী গ্লোবালাইজেশন, ইসলামী ব্যাংকিং এরই ফলাফল। কারণ খিলাফত পুনরদ্ধার করা তখন তাদের কাছে দুঃসাধ্য বা অসম্ভব বলে মনে হয়। তাই একমাত্র সমাধান বাদ দিয়ে তারা সাময়িক ভাল থাকার উদ্দেশ্যে এইসব কনসেপ্টের জন্ম দেন এবং উম্মাহর মধ্যে যে হকপন্থীরা ছিলেন তাদের চিন্তাকে তারা এই ইসলামাইজেশন ধারনা দিয়ে ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলেন। তাই অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার অধিকারী তথাকথিত ইসলাম পন্থিদের সাথে সাথে সাধারণ উম্মাহও ইসলামী অর্থনীতি বলতে ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী বীমা বোঝেন যা সংস্কারপন্থী তথাকথিত আলেমদের দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার ফসল।
ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাস
আহম্মেদ নাজ্জার নামে এক মিশরীয় মুসলিম ১৯৬৩ সালে মুনাফা বন্টনের উপর ভিত্তি করে মিশরের মিট ঘামর শহরে সেভিংস ব্যাংক নামে ইসলামী মোড়কে প্রথম আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এই প্রজেক্ট চালু থাকে। ১৯৭২ সালে এই প্রজেক্ট ‘নাসের সোস্যাল ব্যাংক’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়, যা আজ পর্যন্ত চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। আর প্রথম ইসলামিক কমার্সিয়াল ব্যাংক হিসাবে ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুর করে “দুবাই ইসলামী ব্যাংক”। বাংলাদেশে এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় “ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠিত হয়।
তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদদের দুরদর্শী চিন্তা না থাকায় ইসলাম তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা তারা দেখতে না পেয়ে সাময়িকভাবে ভালো থাকার দর্শন গ্রহণ করেন এবং খিলাফত পুনরদ্ধারের কঠিন ও কন্টকাকীর্ন পথ বাদ দিয়ে প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ইসলামীকরণ প্রকল্প হাতে নেন। এটি তাদের দুর্নীতিগ্রস্ততা ও সংকীর্ণ চিন্তারই পরিচায়ক। বস্তুত প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ঠিক রেখে কিভাবে তা ইসলামিক করা যায় এই চি চিন্তার ফসলই হল ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামি হাসপাতাল, ইসলামিক স্কুল, ইসলামিক টিভি ইত্যাদি।
ইসলামী ব্যাংক কি সুদ মুক্ত?
মায়ের পেটের বাচ্চা কি হালাল খাবার খায়? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে মা কী খাবার খান তার উপর। মায়ের খাবার মেন্যুই যদি হয় সর্বদা হারাম তাহলে পেটের বাচ্চাকে কিভাবে হালাল খাবার সরবরাহ করা যায় তা বোধগম্য নয়। যে কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তফসিলভুক্ত অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে জমা রাখে, এছাড়াও রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক-বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক-বাণিজ্যিক ব্যাংক লেনদেন। ফলশ্রতিতে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের সাথে লেনদেনে যে সুদ জড়িত থাকে তা নস্ট্রা একাউন্টের মাধ্যমে বাদ দিয়ে জনকল্যাণমূলক কাজে খরচ করে তথাকথিত ইসলামী ব্যাংকের সুদমুক্ত থাকার যে অপচেষ্টা তা মূলত: পঁচা পানির ড্রেনে ডুব দেয়ার পর নাপাক সাপ্লাই পানি (যার সাথে সুয়ারেজ লাইন এক হয়ে গেছে) দিয়ে গোসল করারই নামান্তর। যার ভিত্তিই হল সুদ তা সুদমুক্ত করার চেষ্টা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।যেখানে ইসলামে রয়েছে অর্থনীতির সুষ্পষ্ট নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা, সেখানে ব্যাংক ব্যবস্থাকে সুদমুক্ত করে ইসলামী নাম দিয়ে ব্যবহার করার মানসিকতা ইসলামের প্রতি আস্থার অভাব ব্যতীত আর কী নির্দেশ করতে পারে?
ইসলামী ব্যাংক প্রয়োজন কেন?
একটু সহজ কিন্তু কিছুটা কঠোর ভাষায় না বললেই নয়। পতিতালয়ের বাচ্চাদের বাবা খোঁজার শখ ও প্রয়োজনীয়তা থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ তারা তাদের বাবাকে চেনেনা। স্কুলে ভর্তির সময় সাময়িক সমাধান হিসেবে কোন বাবার নাম লিখতে হতে পারে, যাকে আমরা জন্মসূত্রে বাবা বা ইসলামিক বাবা বলতে পারি। কিন্তু যার বাবা আছে তারতো ইসলামিক বাবা খোঁজার দরকার নেই। কারণ সে জন্ম থেকেই চেনে তার বাবাকে। তেমনিভাবে ইসলামী ব্যাংক তাদেরই দরকার, যাদের সাময়িক বাবা প্রয়োজন। মায়ের উপর ১০০% বিশ্বাস থাকলে জন্ম থেকে যে বাবা হিসেবে পরিচিত, সে-ই সারা জীবন বাবা হিসেবে ভুমিকা পালন করে। তেমনি ইসলামকে দ্বীন হিসেবে ১০০% বিশ্বাস করলে যে কোন সমাধান ইসলামের কাছ থেকেই নেয়া যায়, সাময়িক সমাধান হিসেবে পুঁজিবাদী জীবন ব্যবস্থা থেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নেয়ার দরকার হয়না। ইসলাম দিয়েছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার বাস্তবায়ন একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। যারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা কঠিন বা অসম্ভব বলে মনে করেন এবং দারুল কুফরের মধ্যেই ভাল থাকতে চান তাদেরই শুধু ইসলামী ব্যাংক দরকার। কারন এরা না বোঝেন দারুল কুফর, না বোঝেন দারুল ইসলাম। সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল সৌদী আরবের মত রাষ্ট্রকে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের মডেল মনে করেন, সেই জালিম বাদশাহদেরকে মনে করেন মুসলমানদের অভিভাবক। ঐসব তাগুত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের অনুকরণে এরাই ইসলামী ব্যাংকের জন্ম দিয়েছেন এবং এরাই ইসলামী শরীয়াহ্র নাম করে চুটিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ব্যাংকের কাজ কী ?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে ব্যাংকের কাজ হল যাদের উদ্ধৃত্ব অর্থ আছে তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে যাদের অর্থ সংকট আছে তাদের প্রদান করা। ব্যাংক এখানে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং মুনাফা অর্জন করে থাকে। অন্য কথায় টাকা দিয়ে টাকার ব্যবসা বা সুদের কারবার করাই হল ব্যাংকের কাজ।
এই কাজ করার জন্য কি একমাত্র ব্যাংকই দরকার? বর্তমান ভোগবাদী ব্যক্তিতান্ত্রিক এই সমাজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা। তাই উদ্ধৃত্ব অর্থের মালিকরা বিনিয়োগের নিরাপদ কোন খাত খুঁজে না পেয়ে দ্বারস্থ হয় ব্যাংকের। ব্যাংক সকল উদ্ধৃত্ব অর্থের মালিকদের কাছ থেকে কম সুদে অর্থ সংগ্রহ করে চড়া সুদে আর্থিক সংকটাপন্ন ব্যক্তিকে প্রদান করে থাকে। এভাবেই মধ্যসত্বভোগী হিসেবে সুদের ব্যবসা করে থাকে ব্যাংক। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিমানে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যাংক অধিক পরিমানে কতিপয় লোককে ধার দিয়ে থাকে। ফলে টাকা সমাজের নির্দিষ্ট কিছু লোকের হাতে চলে যায় এবং কুক্ষিগত থাকে। ফলে ধনী-দারিদ্রের বৈষম্য দিন দিন বাড়তেই থাকে।
প্রশ্ন হল, এই সমাজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা কেন? যাদের টাকা নেই, উদ্ধৃত্ব অর্থের মালিকরা তাদের সাথে ব্যবসা করতে সাহস পায়না কেন? যার টাকা নেই সে কেন কাকুতি মিনতি করেও কারও কাছ থেকে ব্যবসা করার জন্য টাকা পায়না? ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায় আজ বিনিয়োগের পরিবেশ নেই কেন? এর একটাই উত্তর- পুঁজিবাদী ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ; যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা, যেখানে সকল কাজের মাপকাঠি হচ্ছে লাভ লোকসান। এখানে জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে জীবনকে চরমভাবে ভোগ করা। তাই যার অর্থ আছে, সেই টিকে থাকবে এবং যার অর্থ নেই সে হবে এই সমাজে বঞ্চিত। প্রকৃতপক্ষে তা-ই হচ্ছে। এখানে কেউ কারো প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়না, কেউ কাউকে দেখাশুনা করা নিজের দায়িত্ব মনে করেনা, সবাই শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। এরকম একটি সমাজে ব্যবসা করার জন্য তাই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থা, ঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজন হচ্ছে বীমা কোম্পানীর।
সব সমস্যার মূল তাই একটিমাএ জায়গায় এবং তা হল বর্তমান পুঁজিবাদী, ভোগবাদী জীবন ব্যবস্থা। কিন্তু এর বিকল্প জীবন ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক হয় আল্লাহকে ভয় করার ভিত্তিতে, একজন আর একজনকে দেখাশুনা করে আল্লাহর জন্য। এই বিকল্প সমাজে ব্যবসার জন্য রয়েছে নিরাপদ পরিবেশ। কারণ এখানে সমাজের জনমতই প্রতিষ্ঠিত আল্লাহ ভীতির উপর। এখানে ব্যবসা করার পুঁজির জন্য রয়েছে অন্য ভাইয়ের সহায়তা, ঝুঁকি নিরসনে রয়েছে প্রতিবেশী ও মুসলিম ভাইদের সাহায্য এবং সর্বোপরি সরকারী সহায়তা।
খিলাফত ব্যবস্থায় বায়তুল মাল বা কেন্দ্রীয় কোষাগার জনগণের কাছ থেকে উদ্ধৃত্ত অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার অর্থ বন্টন করে থাকে। এখানে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার কারনে মুদ্রাস্ফীতি হয়না, অর্থ সরবরাহ শুধু স্বর্ণ বা রৌপ্য জমার বিপরীতে করা হয়। মানুষের সঞ্চয়-বিনিয়োগ ও ব্যবসায় অর্থ সংকটে বায়তুল মালের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যায় বলে এখানে ব্যাংক, বীমার মত সুদী প্রতিষ্ঠানের দরকার হয়না।
ইসলামী ব্যাংক কি শরীয়াহ ভিত্তিক?
প্রকৃতপক্ষে, যে জিনিস হারাম, তা কিভাবে শরীয়াহ ভিত্তিক হয়- তাই প্রশ্ন সাপেক্ষ। তারপরও এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসা স্বাভাবি, ইসলামী ব্যাংক যে বিনিয়োগের বিভিন্ন মাধ্যম তথা মুদারাবা, মুশারাকা, বাই-মুয়াজ্জাল বাই-সালাম, আল-ওয়াদিয়া কারেন্ট একাউন্ট এর কথা বলে তা-কি শরীয়ত সম্মত নয়?
কেউ যদি ইসলামী পতিতালয় খুলে নিয়ম চালু করে যে, কোন খদ্দের ঢুকলে প্রথমে তাকে ইসলাম সম্মত উপায়ে পছন্দের নারীর সাথে বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে এবং এর পর তার সাথে রাত্রি যাপন করার পর সকাল বেলা বের হয়ে যাওয়ার সময় তালাক নামায় সাক্ষর করে যেতে হবে; এভাবে বিয়ে-তালাকের ভিত্তিতে পরিচালিত পতিতালয় কি তাহলে শরীয়াত সম্মত হবে? বিয়ে-তালাক তো ইসলামে রয়েছে, তাহলে এটা শরীয়াত সম্মত কেন হবেনা?
মুদারাবা, মুরাবাহা শব্দগুলি সুদী ব্যাংকের ভিতর ঢুকলে যদি ব্যাংক শরীয়াহ্ ভিত্তিক হয়, তাহলে বিয়ে-তালাকের ভিত্তিতে পরিচালিত পতিতালয় কেন শরীয়াত সম্মত হবেনা?
ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার অর্থনীতিতে বর্তমান পুঁজিবাদী কোম্পানী বৈধ নয়, তাই ঐ সমাজে ব্যবসা করার জন্য রয়েছে অংশীদারী কারবারী ব্যবস্থা যার বিভিন্ন রূপ হল- আল ইনান, আল আদনান, মুদারাবা, মুফাওয়াদা ও উযু। এর ভিত্তিতে অংশীদারী কারবার গড়ে উঠে ও পরিচালিত হয়। এই শব্দগুলি ব্যাংকের ভিতর ঢুকিয়ে ব্যাংককে শরীয়ত সম্মত বলার অপপ্রয়াস মানুষকে প্রকৃত ইসলামী অর্থনীতির বাস্তবায়ন ও তা থেকে দূরে রাখারই নামান্তর। খিলাফত ব্যবস্থায় রয়েছে বায়তুল মাল কিন্তু তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়। খিলাফত ব্যবস্থায় রয়েছে মাজলিস আল ইসলাম (মজলিসে শূরা) কিন্তু তা যদি কোন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ব্যবহার করে, দলের অর্থের ভান্ডারকে বায়তুল মাল বলে তাহলে তা শরীয়তের পরিভাষায় অর্থ প্রকাশ করেনা। তেমনিভাবে মুদারাবা, মুরাবাহার মত ইসলামী অর্থনীতির অংশীদারী ব্যবসায়ের শব্দগুলিকে ব্যাংকের মধ্যে ব্যবহারে তা শরীয়তের পরিভাষায় কোন অর্থ প্রকাশ করেনা। মানুষ আজ তাই এইসব শব্দের প্রকৃত ব্যবহারের ক্ষেত্রই জানেনা এবং তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীতাও বোধ করেনা। এগুলো হচ্ছে খিলাফতের অর্থনীতি থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র মাত্র, যা তথাকথিত ইসলামিক ব্যাক্তিরা বুঝে (পুঁজিবাদের দালাল) অথবা না বুঝে (সংকীর্ণ ইসলামী জ্ঞান) প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে যাচ্ছেন।
ইসলামাইজেশন নীতির ভয়াবহতা:
ব্যাংকের সামনে ইসলাম লিখে ইসলামাইজেশন করার প্রক্রিয়ার মত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সকল বিষয়কে ইসলামাইজেশন করার এই নীতির ফলে সাধারণ জনগণ একদিকে যেমন প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তেমনি অন্যদিকে ইসলামের মোড়কে কুফর পেয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে তা গ্রহণ করছে এবং তা নিয়েই আজ সন্তুষ্ট থাকছে। তাদের মধ্যে কুফর সমাজ পরিবর্তন করে খিলাফত ব্যবস্থার অপরিহার্যতা বা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝাতো দূরে থাক, খিলাফত সম্পর্কিত কোন ধারণাও জন্মে না। কারণ তার চারপাশের সবজায়গাতেই সে ইসলাম দেখতে পায়। যেমন: সকাল বেলা উঠে সে ইসলামী পত্রিকা পড়ে, ইসলামী ব্যাংকে যায় চাকুরী করতে, ছেলে-মেয়েদের পাঠায় ইসলামী স্কুলে, বউ চাকুরী করে ইসলামী হাসপাতালে, বিকেল বেলা বাসায় ফেরার পথে ইসলামী গানের সিডি কিনে এবং রাত্রে ইসলামী টিভি দেখতে দেখতে ঘুমায়। এই লোকগুলি ইসলাম বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাও বুঝেনা এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হল, এরা নিজেদের প্রকৃত ইসলামিক ব্যক্তি ভেবে সন্তুষ্ট থাকে। ইসলামাইজেশন নীতি এভাবেই মুসলমানদেরকে বাস্তবায়নের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে তাই এটা নি:সন্দেহে একটি শয়তানী কাজ কারণ শয়তান সকল মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত।
তাই আমাদের শয়তানের পথ পরিহার করে আবার সেই খিলাফত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, যে রাষ্ট্র ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করবে; এবং সেইসাথে বর্তমান তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদদের দুর্নীতিগ্রস্তত চিন্তাকে আলোচনার মাধ্যমে দূর করার চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে আমাদের সকলকে দুআ করতে হবে- যদি ঐসব তথাকথিত আলেমরা সংকীর্ণ ইসলামী জ্ঞানের কারণে এসব করে থাকেন তাহলে আল্লাহ যেন তাদের সঠিকভাবে ইসলাম বোঝার তৌফিক দান করেন।
উসমানীয় খিলাফতের শেষের দিকে খিলাফত রাষ্ট্রের মধ্যে পশ্চিমা ভাবধারায় বেড়ে ওঠা কতিপয় তথাকথিত ইসলামী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। এদের মধ্যে খাইর“দ্দিন আত তিউনিস (১৮১০-৯৯), জামাল আদ দ্বীন আল আফগানী (১৮৩৮-১৮৯৭), রাশিদ রিদা (১৮৬৫-১৯৩৫) ও এদের ভাবধারায় বেড়ে ওঠা হাসান আল বান্না (১৯০৪-১৯৪৯) প্রমুখ। এরা সমস্যা সঙ্কুল ও ধ্বংসন্মোখ খিলাফত ব্যবস্থাকে উদ্ধারের জন্য পশ্চিমা গণতন্ত্র, ফ্রিডম অব বিলিফ, ইত্যাদি কনসেপ্ট এর মাধ্যমে খিলাফত ব্যবস্থা সংস্কারের দাবী তোলেন। ইতোমধ্যেই ১৯২৪ সালে ধ্বংস হয়ে যায় খিলাফত ব্যবস্থা। তখন এই সংস্কার পন্থীরাই খিলাফত পুনরদ্ধারের জন্য কাজ শুর“ করলে অনেক উদ্দেশ্যহীন আন্দোলনের জন্ম হয়। কুফর শক্তির বিরদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে অকথ্য অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে ইখওয়ানুল মুসলিমিন প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে আপোষ করে খিলাফত পুনরদ্ধারের উদ্দেশ্য থেকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে দূরে সরে আসে ।
এই পরাজিত সৈনিকদের পরাজিত মানসিকতা থেকে আসতে থাকে ইসলামের নামে নানান কুফরী ধারণাসমুহ। ইসলামী পুঁজিবাদ, ইসলামী গ্লোবালাইজেশন, ইসলামী ব্যাংকিং এরই ফলাফল। কারণ খিলাফত পুনরদ্ধার করা তখন তাদের কাছে দুঃসাধ্য বা অসম্ভব বলে মনে হয়। তাই একমাত্র সমাধান বাদ দিয়ে তারা সাময়িক ভাল থাকার উদ্দেশ্যে এইসব কনসেপ্টের জন্ম দেন এবং উম্মাহর মধ্যে যে হকপন্থীরা ছিলেন তাদের চিন্তাকে তারা এই ইসলামাইজেশন ধারনা দিয়ে ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলেন। তাই অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার অধিকারী তথাকথিত ইসলাম পন্থিদের সাথে সাথে সাধারণ উম্মাহও ইসলামী অর্থনীতি বলতে ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী বীমা বোঝেন যা সংস্কারপন্থী তথাকথিত আলেমদের দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার ফসল।
ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাস
আহম্মেদ নাজ্জার নামে এক মিশরীয় মুসলিম ১৯৬৩ সালে মুনাফা বন্টনের উপর ভিত্তি করে মিশরের মিট ঘামর শহরে সেভিংস ব্যাংক নামে ইসলামী মোড়কে প্রথম আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এই প্রজেক্ট চালু থাকে। ১৯৭২ সালে এই প্রজেক্ট ‘নাসের সোস্যাল ব্যাংক’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়, যা আজ পর্যন্ত চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। আর প্রথম ইসলামিক কমার্সিয়াল ব্যাংক হিসাবে ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুর করে “দুবাই ইসলামী ব্যাংক”। বাংলাদেশে এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় “ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠিত হয়।
তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদদের দুরদর্শী চিন্তা না থাকায় ইসলাম তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা তারা দেখতে না পেয়ে সাময়িকভাবে ভালো থাকার দর্শন গ্রহণ করেন এবং খিলাফত পুনরদ্ধারের কঠিন ও কন্টকাকীর্ন পথ বাদ দিয়ে প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ইসলামীকরণ প্রকল্প হাতে নেন। এটি তাদের দুর্নীতিগ্রস্ততা ও সংকীর্ণ চিন্তারই পরিচায়ক। বস্তুত প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ঠিক রেখে কিভাবে তা ইসলামিক করা যায় এই চি চিন্তার ফসলই হল ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামি হাসপাতাল, ইসলামিক স্কুল, ইসলামিক টিভি ইত্যাদি।
ইসলামী ব্যাংক কি সুদ মুক্ত?
মায়ের পেটের বাচ্চা কি হালাল খাবার খায়? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে মা কী খাবার খান তার উপর। মায়ের খাবার মেন্যুই যদি হয় সর্বদা হারাম তাহলে পেটের বাচ্চাকে কিভাবে হালাল খাবার সরবরাহ করা যায় তা বোধগম্য নয়। যে কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তফসিলভুক্ত অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে জমা রাখে, এছাড়াও রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক-বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক-বাণিজ্যিক ব্যাংক লেনদেন। ফলশ্রতিতে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের সাথে লেনদেনে যে সুদ জড়িত থাকে তা নস্ট্রা একাউন্টের মাধ্যমে বাদ দিয়ে জনকল্যাণমূলক কাজে খরচ করে তথাকথিত ইসলামী ব্যাংকের সুদমুক্ত থাকার যে অপচেষ্টা তা মূলত: পঁচা পানির ড্রেনে ডুব দেয়ার পর নাপাক সাপ্লাই পানি (যার সাথে সুয়ারেজ লাইন এক হয়ে গেছে) দিয়ে গোসল করারই নামান্তর। যার ভিত্তিই হল সুদ তা সুদমুক্ত করার চেষ্টা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।যেখানে ইসলামে রয়েছে অর্থনীতির সুষ্পষ্ট নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা, সেখানে ব্যাংক ব্যবস্থাকে সুদমুক্ত করে ইসলামী নাম দিয়ে ব্যবহার করার মানসিকতা ইসলামের প্রতি আস্থার অভাব ব্যতীত আর কী নির্দেশ করতে পারে?
ইসলামী ব্যাংক প্রয়োজন কেন?
একটু সহজ কিন্তু কিছুটা কঠোর ভাষায় না বললেই নয়। পতিতালয়ের বাচ্চাদের বাবা খোঁজার শখ ও প্রয়োজনীয়তা থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ তারা তাদের বাবাকে চেনেনা। স্কুলে ভর্তির সময় সাময়িক সমাধান হিসেবে কোন বাবার নাম লিখতে হতে পারে, যাকে আমরা জন্মসূত্রে বাবা বা ইসলামিক বাবা বলতে পারি। কিন্তু যার বাবা আছে তারতো ইসলামিক বাবা খোঁজার দরকার নেই। কারণ সে জন্ম থেকেই চেনে তার বাবাকে। তেমনিভাবে ইসলামী ব্যাংক তাদেরই দরকার, যাদের সাময়িক বাবা প্রয়োজন। মায়ের উপর ১০০% বিশ্বাস থাকলে জন্ম থেকে যে বাবা হিসেবে পরিচিত, সে-ই সারা জীবন বাবা হিসেবে ভুমিকা পালন করে। তেমনি ইসলামকে দ্বীন হিসেবে ১০০% বিশ্বাস করলে যে কোন সমাধান ইসলামের কাছ থেকেই নেয়া যায়, সাময়িক সমাধান হিসেবে পুঁজিবাদী জীবন ব্যবস্থা থেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নেয়ার দরকার হয়না। ইসলাম দিয়েছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার বাস্তবায়ন একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। যারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা কঠিন বা অসম্ভব বলে মনে করেন এবং দারুল কুফরের মধ্যেই ভাল থাকতে চান তাদেরই শুধু ইসলামী ব্যাংক দরকার। কারন এরা না বোঝেন দারুল কুফর, না বোঝেন দারুল ইসলাম। সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল সৌদী আরবের মত রাষ্ট্রকে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের মডেল মনে করেন, সেই জালিম বাদশাহদেরকে মনে করেন মুসলমানদের অভিভাবক। ঐসব তাগুত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের অনুকরণে এরাই ইসলামী ব্যাংকের জন্ম দিয়েছেন এবং এরাই ইসলামী শরীয়াহ্র নাম করে চুটিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ব্যাংকের কাজ কী ?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে ব্যাংকের কাজ হল যাদের উদ্ধৃত্ব অর্থ আছে তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে যাদের অর্থ সংকট আছে তাদের প্রদান করা। ব্যাংক এখানে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং মুনাফা অর্জন করে থাকে। অন্য কথায় টাকা দিয়ে টাকার ব্যবসা বা সুদের কারবার করাই হল ব্যাংকের কাজ।
এই কাজ করার জন্য কি একমাত্র ব্যাংকই দরকার? বর্তমান ভোগবাদী ব্যক্তিতান্ত্রিক এই সমাজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা। তাই উদ্ধৃত্ব অর্থের মালিকরা বিনিয়োগের নিরাপদ কোন খাত খুঁজে না পেয়ে দ্বারস্থ হয় ব্যাংকের। ব্যাংক সকল উদ্ধৃত্ব অর্থের মালিকদের কাছ থেকে কম সুদে অর্থ সংগ্রহ করে চড়া সুদে আর্থিক সংকটাপন্ন ব্যক্তিকে প্রদান করে থাকে। এভাবেই মধ্যসত্বভোগী হিসেবে সুদের ব্যবসা করে থাকে ব্যাংক। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিমানে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যাংক অধিক পরিমানে কতিপয় লোককে ধার দিয়ে থাকে। ফলে টাকা সমাজের নির্দিষ্ট কিছু লোকের হাতে চলে যায় এবং কুক্ষিগত থাকে। ফলে ধনী-দারিদ্রের বৈষম্য দিন দিন বাড়তেই থাকে।
প্রশ্ন হল, এই সমাজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা কেন? যাদের টাকা নেই, উদ্ধৃত্ব অর্থের মালিকরা তাদের সাথে ব্যবসা করতে সাহস পায়না কেন? যার টাকা নেই সে কেন কাকুতি মিনতি করেও কারও কাছ থেকে ব্যবসা করার জন্য টাকা পায়না? ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায় আজ বিনিয়োগের পরিবেশ নেই কেন? এর একটাই উত্তর- পুঁজিবাদী ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ; যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা, যেখানে সকল কাজের মাপকাঠি হচ্ছে লাভ লোকসান। এখানে জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে জীবনকে চরমভাবে ভোগ করা। তাই যার অর্থ আছে, সেই টিকে থাকবে এবং যার অর্থ নেই সে হবে এই সমাজে বঞ্চিত। প্রকৃতপক্ষে তা-ই হচ্ছে। এখানে কেউ কারো প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়না, কেউ কাউকে দেখাশুনা করা নিজের দায়িত্ব মনে করেনা, সবাই শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। এরকম একটি সমাজে ব্যবসা করার জন্য তাই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থা, ঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজন হচ্ছে বীমা কোম্পানীর।
সব সমস্যার মূল তাই একটিমাএ জায়গায় এবং তা হল বর্তমান পুঁজিবাদী, ভোগবাদী জীবন ব্যবস্থা। কিন্তু এর বিকল্প জীবন ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক হয় আল্লাহকে ভয় করার ভিত্তিতে, একজন আর একজনকে দেখাশুনা করে আল্লাহর জন্য। এই বিকল্প সমাজে ব্যবসার জন্য রয়েছে নিরাপদ পরিবেশ। কারণ এখানে সমাজের জনমতই প্রতিষ্ঠিত আল্লাহ ভীতির উপর। এখানে ব্যবসা করার পুঁজির জন্য রয়েছে অন্য ভাইয়ের সহায়তা, ঝুঁকি নিরসনে রয়েছে প্রতিবেশী ও মুসলিম ভাইদের সাহায্য এবং সর্বোপরি সরকারী সহায়তা।
খিলাফত ব্যবস্থায় বায়তুল মাল বা কেন্দ্রীয় কোষাগার জনগণের কাছ থেকে উদ্ধৃত্ত অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার অর্থ বন্টন করে থাকে। এখানে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার কারনে মুদ্রাস্ফীতি হয়না, অর্থ সরবরাহ শুধু স্বর্ণ বা রৌপ্য জমার বিপরীতে করা হয়। মানুষের সঞ্চয়-বিনিয়োগ ও ব্যবসায় অর্থ সংকটে বায়তুল মালের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যায় বলে এখানে ব্যাংক, বীমার মত সুদী প্রতিষ্ঠানের দরকার হয়না।
ইসলামী ব্যাংক কি শরীয়াহ ভিত্তিক?
প্রকৃতপক্ষে, যে জিনিস হারাম, তা কিভাবে শরীয়াহ ভিত্তিক হয়- তাই প্রশ্ন সাপেক্ষ। তারপরও এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসা স্বাভাবি, ইসলামী ব্যাংক যে বিনিয়োগের বিভিন্ন মাধ্যম তথা মুদারাবা, মুশারাকা, বাই-মুয়াজ্জাল বাই-সালাম, আল-ওয়াদিয়া কারেন্ট একাউন্ট এর কথা বলে তা-কি শরীয়ত সম্মত নয়?
কেউ যদি ইসলামী পতিতালয় খুলে নিয়ম চালু করে যে, কোন খদ্দের ঢুকলে প্রথমে তাকে ইসলাম সম্মত উপায়ে পছন্দের নারীর সাথে বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে এবং এর পর তার সাথে রাত্রি যাপন করার পর সকাল বেলা বের হয়ে যাওয়ার সময় তালাক নামায় সাক্ষর করে যেতে হবে; এভাবে বিয়ে-তালাকের ভিত্তিতে পরিচালিত পতিতালয় কি তাহলে শরীয়াত সম্মত হবে? বিয়ে-তালাক তো ইসলামে রয়েছে, তাহলে এটা শরীয়াত সম্মত কেন হবেনা?
মুদারাবা, মুরাবাহা শব্দগুলি সুদী ব্যাংকের ভিতর ঢুকলে যদি ব্যাংক শরীয়াহ্ ভিত্তিক হয়, তাহলে বিয়ে-তালাকের ভিত্তিতে পরিচালিত পতিতালয় কেন শরীয়াত সম্মত হবেনা?
ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার অর্থনীতিতে বর্তমান পুঁজিবাদী কোম্পানী বৈধ নয়, তাই ঐ সমাজে ব্যবসা করার জন্য রয়েছে অংশীদারী কারবারী ব্যবস্থা যার বিভিন্ন রূপ হল- আল ইনান, আল আদনান, মুদারাবা, মুফাওয়াদা ও উযু। এর ভিত্তিতে অংশীদারী কারবার গড়ে উঠে ও পরিচালিত হয়। এই শব্দগুলি ব্যাংকের ভিতর ঢুকিয়ে ব্যাংককে শরীয়ত সম্মত বলার অপপ্রয়াস মানুষকে প্রকৃত ইসলামী অর্থনীতির বাস্তবায়ন ও তা থেকে দূরে রাখারই নামান্তর। খিলাফত ব্যবস্থায় রয়েছে বায়তুল মাল কিন্তু তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়। খিলাফত ব্যবস্থায় রয়েছে মাজলিস আল ইসলাম (মজলিসে শূরা) কিন্তু তা যদি কোন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ব্যবহার করে, দলের অর্থের ভান্ডারকে বায়তুল মাল বলে তাহলে তা শরীয়তের পরিভাষায় অর্থ প্রকাশ করেনা। তেমনিভাবে মুদারাবা, মুরাবাহার মত ইসলামী অর্থনীতির অংশীদারী ব্যবসায়ের শব্দগুলিকে ব্যাংকের মধ্যে ব্যবহারে তা শরীয়তের পরিভাষায় কোন অর্থ প্রকাশ করেনা। মানুষ আজ তাই এইসব শব্দের প্রকৃত ব্যবহারের ক্ষেত্রই জানেনা এবং তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীতাও বোধ করেনা। এগুলো হচ্ছে খিলাফতের অর্থনীতি থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র মাত্র, যা তথাকথিত ইসলামিক ব্যাক্তিরা বুঝে (পুঁজিবাদের দালাল) অথবা না বুঝে (সংকীর্ণ ইসলামী জ্ঞান) প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে যাচ্ছেন।
ইসলামাইজেশন নীতির ভয়াবহতা:
ব্যাংকের সামনে ইসলাম লিখে ইসলামাইজেশন করার প্রক্রিয়ার মত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সকল বিষয়কে ইসলামাইজেশন করার এই নীতির ফলে সাধারণ জনগণ একদিকে যেমন প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তেমনি অন্যদিকে ইসলামের মোড়কে কুফর পেয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে তা গ্রহণ করছে এবং তা নিয়েই আজ সন্তুষ্ট থাকছে। তাদের মধ্যে কুফর সমাজ পরিবর্তন করে খিলাফত ব্যবস্থার অপরিহার্যতা বা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝাতো দূরে থাক, খিলাফত সম্পর্কিত কোন ধারণাও জন্মে না। কারণ তার চারপাশের সবজায়গাতেই সে ইসলাম দেখতে পায়। যেমন: সকাল বেলা উঠে সে ইসলামী পত্রিকা পড়ে, ইসলামী ব্যাংকে যায় চাকুরী করতে, ছেলে-মেয়েদের পাঠায় ইসলামী স্কুলে, বউ চাকুরী করে ইসলামী হাসপাতালে, বিকেল বেলা বাসায় ফেরার পথে ইসলামী গানের সিডি কিনে এবং রাত্রে ইসলামী টিভি দেখতে দেখতে ঘুমায়। এই লোকগুলি ইসলাম বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাও বুঝেনা এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হল, এরা নিজেদের প্রকৃত ইসলামিক ব্যক্তি ভেবে সন্তুষ্ট থাকে। ইসলামাইজেশন নীতি এভাবেই মুসলমানদেরকে বাস্তবায়নের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে তাই এটা নি:সন্দেহে একটি শয়তানী কাজ কারণ শয়তান সকল মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত।
তাই আমাদের শয়তানের পথ পরিহার করে আবার সেই খিলাফত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, যে রাষ্ট্র ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করবে; এবং সেইসাথে বর্তমান তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদদের দুর্নীতিগ্রস্তত চিন্তাকে আলোচনার মাধ্যমে দূর করার চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে আমাদের সকলকে দুআ করতে হবে- যদি ঐসব তথাকথিত আলেমরা সংকীর্ণ ইসলামী জ্ঞানের কারণে এসব করে থাকেন তাহলে আল্লাহ যেন তাদের সঠিকভাবে ইসলাম বোঝার তৌফিক দান করেন।
✦আরও পড়ুন
হারাম তহবিল বিতরণের ব্যাপারে ইসলামিক বিধি কি?What is the Islamic Ruling on Disposal of Haram Funds? Answer: 1- It seems that you were confused and assumed that our statement: “you must dispose…অর্থনীতিকৃষি জমি ইজারা দেওয়া কি অনুমোদিত?When two people who have a co-partnership in the cultivation of land; the first owns the land whilst the second cultivates it. Is this permissible or…অর্থনীতিগাছের থাকা অবস্থায় ফল বিক্রি করা যাবে কি?This type of transaction is widespread in many Muslim countries and in Fiqh it is called: “selling of fruits while on it source” and it is commonly…অর্থনীতিহালাল ও হারামকে তার মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করে না এমন কারও কাছ থেকে ঋণ নেওয়া যাবে কি?Borrowing from Someone who does not take Halal and Haram as his Criteria? Answer: 1- A thing that is forbidden specifically for itself like…অর্থনীতিবিটকয়েনের ব্যাপারে ইসলামিক হুকুম কি?What is the Islamic Ruling on Bitcoin? Answer: 1- Bitcoin is not a currency; it does not fulfill the conditions of a currency because the currency…অর্থনীতিযাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ কতটুকু যাকাত দেওয়া যায়?Question: How much money can a person receive in Zakat? For example, can a person get enough money to build a house if he has no house? Or is there a…অর্থনীতি