মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
খিলাফতের ইতিহাস

জাহাজ পোড়ানো তারিক (তারিক বিন যিয়াদ)

৩ মিনিটে পড়ুন ৩ বার দেখা হয়েছে১ জুন ২০২০
জাহাজ পোড়ানো তারিক (তারিক বিন যিয়াদ)
মূসা বিন নুসাইর ৭১০-৭১১ সালে তানজিয়ার জয়ের পর তারিককে এর গভর্নর নিয়োগ দেন। কিন্তু সিউটায় একটি ভিসিগথ চৌকি জয় করা যায়নি। এটি জুলিয়ান নামক এক সম্রান্ত ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।

রডারিক স্পেনের ক্ষমতায় এলে জুলিয়ান তার কন্যাকে প্রথা অনুযায়ী শিক্ষা অর্জনের জন্য গিসিগথিক রাজার দরবারে পাঠান। কথিত আছে যে রডারিক তাকে ধর্ষণ করেন এর ফলে জুলিয়ান অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে আরবদেরকে গিসিগথ রাজ্যে আসতে আমন্ত্রণ জানান। সে সাথে মুসলিমদেরকে জিব্রাল্টার প্রণালী গোপনে পার করে দেয়ার ব্যাপারে তিনি তারিকের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হন। জুলিয়ানের কাছে বেশ কিছু বাণিজ্য জাহাজ ও স্পেনিশ মূলভূমিতে নিজস্ব দুর্গ ছিল।

ভূ-মধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত ‘জিব্রাল্টার’ যুক্তরাজ্যের অধীনস্থ একটি এলাকা। এর দক্ষিনে রয়েছে স্পেন এবং এটি আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরের প্রবেশপথে অবস্থিত। এটি ব্রিটিশদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নৌঘাঁটি।

জিব্রাল্টার নামটির আরবি নাম "জাবাল আল তারিক" । ৭১১ সালে উমাইয়াহ খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের নির্দেশে বার্বার গোত্রীয় সেনানেতা তারিক ইবন যিয়াদ স্পেন বিজয়ের উদ্দেশ্যে উত্তর আফ্রিকা থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী পার হয়ে তার সৈন্যদের নিয়ে স্পেনে পৌছে প্রথমে একটি পাহাড়ের ধারে অবতরন করেন। যা পরবর্তীতে "জাবাল আল তারিক" বা "তারিকের পাহাড়" নামে পরিচিত হয়। এই "জাবাল আল তারিক" থেকেই "জিব্রাল্টার" শব্দটি এসেছে।

৭১১ সন। মুসলিম সেনাপতি তারিক ইবন যিয়াদ ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনের মাটি জিব্রালটারে পা রাখলেন। তারিকের সেনাবাহিনীতে মোট ৭০০০ জন সৈন্য ছিল। বলা হয় যে মূসা ইবনে নুসাইর আরো ৫০০০ সৈনিক পাঠিয়েছিলেন।

এ ক্ষুদ্র বাহিনীর কথা শুনে স্পেনরাজ রডারিক হেসেই আকুল। রডারিক হামলা মোকাবেলার জন্য ১,০০,০০০ জন সৈনিক সমাবেশ করেন। সাগর-উর্মির ন্যায় বিপুল রডারিকের সৈন্যের মুকাবিলায় দাঁড়িয়ে মুসলিম সৈনিকদের মনেও অজ্ঞাতে নানা প্রশ্ন ভিড় জমিয়েছিল।

কিন্তু সেনাপতি তারিক অচল-অটল। বিজয় আসে সত্য-ন্যায়ের শক্তিতে, সংখ্যাধিক্যে নয়। বদর, উহুদ, ইয়ারমুক, কাদেসিয়া প্রভৃতি কত ক্ষেত্রে কতবার তা প্রমাণ হয়ে গেছে।

অকুতোভয় তারিক ইবন যিয়াদ জিব্রালটারে নেমে জাহাজে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিলেন সব জাহাজ। তারপর সৈন্যদের দিকে চেয়ে বললেন,” চেয়ে দেখ বন্ধুগণ, গভীর সমুদ্র আমাদের পেছনে গর্জন করছে। আর সামনে অন্যায় অবিচারের প্রতীক বিশাল রডারিক বাহিনী।

যদি আমরা সামনে অগ্রসর হই, তাহলে ন্যায় ও বিশ্ব-কল্যাণ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আমরা শহীদ হবো, কিংবা বিজয় মাল্য লাভ করে আমরা গাজী হবো।

এই জীবনমরণ সংগ্রামে কে আমার অনুগামী হবে?” মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি সৈনিকই বজ্র নির্ঘোষে ‘তাকবীর‘ দিয়ে সেনাপতি তারিকের সাথে ঐক্যমত ঘোষণা করল। স্পেনরাজ রডারিকের প্রধান সেনাপতি থিওডমিরের নেতৃত্বাধীন বিশাল এক বাহিনীর সাথে মুসলিম সৈন্যের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হলো, সে এক অসম যুদ্ধ।

যুদ্ধ বিজ্ঞানের উচিত অনুচিতের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হবে, নিতান্ত আত্মহত্যার খাহেশ নিয়েই ৭০০০ সৈন্যের মুসলিম বাহিনীটি এ বিদেশ বিভুয়ে এসে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু এই অসম যুদ্ধই এক ইতিহাসের সৃষ্টি করল।

জানবাজ মুসলিম বাহিনীর প্রচন্ড পাল্টা আক্রমণে রডারিক বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো।

মুসলিম সৈন্য ও তাদের সেনাপতির সৌর্যবীর্য ও সাহস দেখে সেনাপতি থিওডমির বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়ে রাজা রডারিককে লিখে পাঠালেন, ”সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও অদ্ভুত শৌর্য বীর্যের অধিকারী মুসলিম বাহিনীর অগ্রগতি আমি রুখতে পারলাম না।?”

তারিক বিন জিয়াদ তার সেনাদলকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কর্ডোবা, গ্রানাডা ও অন্যান্য অঞ্চল জয় করতে পাঠান। এসময় তিনি মূল সেনাদলের সাথে অবস্থান করেন।

১৯ জুলাই গুয়াডালেটের যুদ্ধে রডারিক পরাজিত ও নিহত হন। ফলে ভিসিগথ রাজ্যের বিরুদ্ধে তারিক বিন জিয়াদ চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেন।

এই ভাবেই সত্যের জয় হল-ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডিন হল স্পেনে। তারপর গৌরবময় মুসলিম শাসন চললো সেখানে দীর্ঘ ৭শ বছর ধরে।

কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগাকে কেন্দ্র করে যে মুসলিম সভ্যতার বিকাশ ঘটল, তা সারা ইউরোপকে আলোকিত করে তুললো।

অন্ধকার ইউরোপের বুকে সূর্যশিখার মতোই জ্বলছিল কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান শিখা। সেখানে জ্ঞান আহরণের জন্য ইউরোপের সব দেশ থেকেই ছুটে এসেছিল জ্ঞান পিপাসুরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম মনীষীদের কাছ থেকে সেদিনের অন্ধকার ইউরোপ জ্ঞানের A,B,C,D শিক্ষা শুরু করল। কর্ডোভার এই ছাত্রারাই ছিল ইউরোপীয় জাগরণের স্হপতি।

সুতরাং আজকের যে ইউরোপ, তার ঘুম ভাংগিয়েছে মুসলমানরাই। আর তাদের এ ঘুম ভাংগার প্রথম গান গেয়েছিলেন তারিক ইবন যিয়াদ।

তিনি গোথিক শাসনের নির্মম নিষ্পেষণ থেকে শুধু স্পেনকেই মুক্ত করেননি,বলা চলে স্মরণাতীত কালের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকেও তিনি জাগিয়েছেন ইউরোপকে।

মূল লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি)

EDITED BY: মোঃ সাইফুল ইসলাম

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
কুরআনের সংরক্ষণ ও একজন ইহুদী পন্ডিতের ইসলাম গ্রহণ
খিলাফতের ইতিহাস

কুরআনের সংরক্ষণ ও একজন ইহুদী পন্ডিতের ইসলাম গ্রহণ

আব্বাসীয় খলীফা মামূনুর রশীদের দরবারে মাঝে মাঝে শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হত। এতে তৎকালীন বিভিন্ন বিষয়ে বিদগ্ধ পন্ডিতগণ…

গর্ব করার মত এক ইতিহাস!!
খিলাফতের ইতিহাস

গর্ব করার মত এক ইতিহাস!!

ওসমানীয় খেলাফত চলছে তখন, ১৮৪৫ সাল। খলিফা আব্দুল মাজিদ ইস্তাম্বুলের মসনদে। এসময়ে এসেও ইউরোপের অবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিলনা, বিভিন্ন আর্থিক-সামাজিক…

হযরত ওমরের চুমু!
খিলাফতের ইতিহাস

হযরত ওমরের চুমু!

হযরত ওমরের শাসন চলছে। শুরু হয়েছে রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যুদ্ধে বন্দি হয়েছেন অনেক মুসলিম সৈনিক। সঙ্গে বন্দি একজন সাহাবিও। রাসূল (সাঃ) - এর…