মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
খিলাফতের ইতিহাস

বাদশাহর বিচার

৩ মিনিটে পড়ুন১৩ জুন ২০২০
বাদশাহর বিচার
বাদশাহ মালিক শাহ ছিলেন আন্দালুসের (স্পেনের) স্বাধীন সুলতান। তার শখ ছিল হরিণ শিকার করা। তাই রাজকার্যে একটু ফুরসত পেলেই হরিণ শিকারের উদ্দেশ্যে ইস্পাহানের জঙ্গলে গমন করতেন।

একদিন কিছু সৈন্য নিয়ে তিনি হরিণ শিকারে বের হলেন এবং বনের পাশে এক গ্রামে অবস্থান নিলেন। সেই গ্রামে ছিল এক গরীব বিধবা মহিলা। সে তার সন্তানদের নিয়ে এক পর্ণ কুটিরে বাস করত। তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন বলতে ছিল একটি গাভী, যার দুধ পান করে তার তিনটি শিশু লালিত-পালিত হত। কিন্তু বাদশাহর অজান্তে সৈন্যরা সেই গাভীটি যবেহ করে খেয়ে ফেলল। বিধবা তাদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করল যে, তার গাভীটি যেন তারা ছেড়ে দেয়। কারণ এটাই তাদের জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু সৈন্যরা তাকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিল। এতে অসহায় মহিলা চোখে অন্ধকার দেখল। গাভী হারিয়ে সে পাগলপ্রায় হয়ে গেল।

সৈন্যদের কাজে বাঁধা দেওয়ার কেউ ছিল না বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে গাভী যবহের দৃশ্য দেখা ছাড়া তার কিছুই করার ছিল না। রাতে সে ঘুমাতে পারল না। ক্ষুধার্ত শিশুদের বুকফাটা কান্না ও চিৎকার তার হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করল। হঠাৎ উৎকণ্ঠার কুহেলিকা ভেদ করেও তার মনে আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল যে, বাদশাহ যেহেতু ন্যায়বিচারক সেহেতু অবশ্যই তাঁর কাছে এর সঠিক বিচার পাওয়া যাবে।

সুতরাং প্রত্যুষেই সে বাদশাহর কাছে যাবার জন্য মনস্থির করল। কিন্তু বাদশাহর কাছে পৌঁছা তার কাছে দুরূহ ছিল। ইতিমধ্যে সে জানতে পারল বাদশাহ শিকারে বের হয়েছেন এবং অমুক স্থান দিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরবেন। বিধবা মহিলাটি এই সুযোগকে হাতছাড়া না করে ইস্পাহানের এক প্রসিদ্ধ পুলে দাঁড়িয়ে থেকে বাদশাহর আগমনের প্রহর গুণতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই অভিযোগ পেশ করার সেই মহেন্দ্রক্ষণটি উপস্থিত হল। বাদশাহ পুলের উপর পৌঁছার সাথে সাথেই বিধবা সাহস ও দাপটের সাথে বলল, ‘হে আন্দালুসের সুলতান! আমার ব্যাপারে এই পুলের উপরেই ইনছাফ করবেন, নাকি আখেরাতের পুলছিরাতে? আপনার যেটা পসন্দ বেছে নিন। বিধবার কথাটি যেন বিষাক্ত বান হয়ে বাদশাহর কলিজায় বিঁধে গেল। মহিলার এমন নির্ভিক ও অকপট কথায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় সৈন্যরাও একে অপরের দিকে তাকাতাকি করতে লাগল।

বাদশাহ দ্রুত ঘোড়া থেকে নেমে সাগ্রহে বললেন, ‘হে মা! পুলছিরাতে কিছু করার কোনই সামর্থ্য আমার নেই, এই পুলেই আমি ফায়ছালা করতে চাই। আপনি নির্ভয়ে আপনার অভিযোগ পেশ করুন।

বিধবা তাকে সবকিছু খুলে বলল। ঘটনা শুনে বাদশাহ অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন এবং তার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল। সাথে সাথেই তিনি অপরাধী সৈন্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলেন। আর সৈন্যদের এমন নিপীড়নে আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করলেন। বাদশাহ গাভীটির পরিবর্তে বিধবাকে ৭০টি গাভী প্রদান করলেন। বাদশাহর ইনছাফে বিধবা প্রীত হল এবং সন্তুষ্ট চিত্তে তার কুটিরে ফিরে গেল।

সম্মানিত পাঠক মন্ডলী! সেই যামানার অভিযোগকারীরা কতই না সাহসী ছিলেন আর শ্রবণকারীরাও কতবড় ন্যায়ের প্রতীক ছিলেন, যা বর্তমান সভ্যতায় রূপকথার গল্পের মতই মনে হয়। কিন্তু তাদের ন্যায়পরায়ণতার প্রধান কারণ ছিল তারা ছিলেন আল্লাহভীরু।

আখেরাতের শাস্তিকে তারা ভীষণভাবে ভয় পেতেন। সবুজের বুকে লাল পতাকার এই স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকদের হৃদয়তন্ত্রীতে যদি একবার আল্লাহভীতির দীপশিখা জ্বলে ওঠে, তবে বাংলার আকাশেও উদিত হবে ইনছাফের সোনালী সূর্য। মহান আল্লাহর সকাশে আমাদের বিনীত প্রার্থনা তিনি যেন সত্বর সেই দিনের উন্মেষ ঘটান এবং এদেশ ও জাতিকে রক্ষা করেন- আমীন!

মাসিক আত-তাহরীক থেকে সংগৃহীত

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
কুরআনের সংরক্ষণ ও একজন ইহুদী পন্ডিতের ইসলাম গ্রহণ
খিলাফতের ইতিহাস

কুরআনের সংরক্ষণ ও একজন ইহুদী পন্ডিতের ইসলাম গ্রহণ

আব্বাসীয় খলীফা মামূনুর রশীদের দরবারে মাঝে মাঝে শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হত। এতে তৎকালীন বিভিন্ন বিষয়ে বিদগ্ধ পন্ডিতগণ…

গর্ব করার মত এক ইতিহাস!!
খিলাফতের ইতিহাস

গর্ব করার মত এক ইতিহাস!!

ওসমানীয় খেলাফত চলছে তখন, ১৮৪৫ সাল। খলিফা আব্দুল মাজিদ ইস্তাম্বুলের মসনদে। এসময়ে এসেও ইউরোপের অবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিলনা, বিভিন্ন আর্থিক-সামাজিক…

হযরত ওমরের চুমু!
খিলাফতের ইতিহাস

হযরত ওমরের চুমু!

হযরত ওমরের শাসন চলছে। শুরু হয়েছে রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যুদ্ধে বন্দি হয়েছেন অনেক মুসলিম সৈনিক। সঙ্গে বন্দি একজন সাহাবিও। রাসূল (সাঃ) - এর…