মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
প্রবন্ধ

দূরত্ব রেখে নামাজ পড়া একটি বিদয়াত

৫ মিনিটে পড়ুন৩০ এপ্রিল ২০২১
দূরত্ব রেখে নামাজ পড়া একটি বিদয়াত (উদ্ভাবন) যার ধারা শাসকরা পাপ করছে। শরীয়াতে সংক্রামক রোগের সময় সুস্থ মানুষকে জামায়াতে নামাজ থেকে দূরে রাখবে অথবা দূরত্ব রেখে নামাজ পড়বে এরকম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

১. রাসূলুল্লাহ (সা:) নামাজের জন্য যে পদ্ধতিটি তৈরি করেছেন তা পরিবর্তন করা একটি বিদয়াত। বরং এ ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হ'ল স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি যথারীতি নামাজ পড়তে যাবে এবং একসাথে সারিতে ফাঁক ছাড়াই নামাজ পড়বে। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এমন ব্যক্তিকে যাওয়া যাবে না যাতে সে অন্যকে সংক্রামিত করতে না পারে।

ইসলামী শরীয়তের (আইনের) চতুর্থ উৎস হলো কিয়াস। কিয়াস হচ্ছে কুরআন ও হাদিসকে কেয়ামত পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করা। এটা নতুন কোনো বানানো বিষয় নয়।

এর ছোট্ট একটা উদাহরণ হলো এই কাগজে কুরআন লেখা কি নিষেধ? এখানে কিয়াস হচ্ছে অবশ্যই না। কারণ তত্কালীন সময়ে চামড়ায় গাছের পাতায় বাকলে লেখা হত , যদি কাগজ থাকত তবে কাগজেও লেখা হত। এই যে ১৪৫০ বছর আগে নাজিল হওয়া কুরআনের বিধান বর্তমান সময়ে সমন্বয় করা এটাই কিয়াস। বিল্লাল (রাঃ) কে উচ্চ স্বরে আজান দিতে বলা হত যাতে বেশি দূর পর্যন্ত লোকে আজান শুনতে পায়!। এবং এক অন্ধ লোককে আজান শুনতে পেলে মসজিদে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল । আজান যত বেশি দূর পর্যন্ত পৌছবে তত সয়াব অর্জনের কথা হাদিসে এসেছে। ইসলাম জীবনের প্রয়োজনে নতুন টেকনোলজি ব্যবহার নিষেধ করে না। অতএব বুঝা যাচ্ছে যদি তখন মাইক থাকত তাহলে মাইক ব্যবহার করা হত। মাইক ব্যবহার দ্বীন ইসলামের বিধান পরিবর্তন করে না।

কিন্তু কিয়াসের নামে কুরআন ও সুন্নাহের বিপরীত কোনো বিষয় গ্রহণ করা কিভাবে সমীচীন হবে?

“যে আমাদের এ ধর্মে এমন কোন নতুন বিষয় উদ্ভাবন করবে যা ধর্মে অন্তর্ভুক্ত ছিল না তা প্রত্যাখ্যাত হবে”। (বুখারী ও মুসলিম)

২. অনুরূপভাবে, যদি রাষ্ট্র রাসূলুল্লাহ (সা:) কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে নামাজ পড়তে নিষেধ করে এবং সংক্রমণ এর ভয়ে যাদের মধ্যে লক্ষণগুলি প্রদর্শন করছে না এমন একজন নামাজির সাথে পাশের নামাজির মধ্যে এক বা দুই মিটারের ব্যবধান রাখতে বাধ্য করে, তবে এটি একটি বড় পাপ হবে।

তোমরা তোমাদের সারিগুলো সোজা করো, কেননা সারি সোজা করা নামায ক্বায়িমের অন্তর্ভুক্ত বিষয় [সহীহ বুখারী]

তোমরা তোমাদের সারিগুলো সোজা; ঠিকঠাক করো, কেননা সারি সোজা করা নামাযের পরিপূর্ণতার অন্তর্ভুক্ত [সহীহ মুসলিম]


রাসূলুল্লাহ (সা:) এবং সাহাবারা জামা‘আতে সালাত আদায়কালীন সারি ঠিক করার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত সারি সোজা ও ঠিকঠাক না হতো ততক্ষণ তারা নামাযই শুরু করতেন না। রাসূলুল্লাহ (সা:) জামা‘আতে নামায শুরু করার আগে একাধিকবার সাহাবায়ে কিরামকে শীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করে একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে ক্বাতার সোজা করে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতেন। ক্বাতার সোজা করার জন্য প্রয়োজনে তিনি লাঠিও ব্যবহার করতেন।

ঠিকভাবে সোজা সমান্তরাল হয়ে দাঁড়াও! ঠিকভাবে সোজা সমান্তরাল হয়ে দাঁড়াও! ঠিকভাবে সোজা সমান্তরাল হয়ে দাঁড়াও! কেননা যার হতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে আমার পশ্চাৎ থেকে তেমনি দেখতে পাই যেমনি আমি তোমাদেরকে সম্মুখ থেকে দেখে থাকি। [সহীহ বুখারী , সুনানে নাসায়ী]

উমার (রা:) নামাযের সারিগুলো (নামাযের সফগুলো) সোজা ও ঠিকঠাক করার জন্য কিছু লোককে দায়িত্ব দিয়ে রাখতেন, ঐ লোক এসে যতক্ষণ না তারা সারি পুরোপুরি সোজা-সঠিক হয়েছে বলে তাকে অবগত করতেন, ততক্ষণ তিনি তাকবীর (তাকবীরে তাহ্রীমা) বলতেন না। [জামে আত-তিরমিযী]

রাসূলুল্লাহ (সা:) সালাতের সময় আমাদের কাঁধ ছুঁয়ে দেখতেন আর বলতেন: সমান্তরাল হও, পরস্পর ভিন্নতা অবলম্বন করো না, নতুবা তোমাদের অন্তরও পরস্পর বিভক্ত-বিভেদপূর্ণ হয়ে যাবে [সহীহ মুসলিম, সহীহ ইবনে হিব্বান]

রাসূলুল্লাহ (সা:) (সালাতে) আমাদের সফগুলো এমনভাবে সোজা করাতেন যেন তিনি এর দ্বারা কামানের কাঠ সোজা করছেন, যতক্ষণ না তিনি উপলব্ধি করলেন যে, আমরা তার থেকে (বিষয়টি) পুরোপুরি বুঝে গেছি। অতঃপর একদিন তিনি বেরিয়ে এসে সালাতে দাঁড়িয়ে তাকবীর দিতে যাবেন (তাকবীরে তাহ্রীমাহ বলে নামায শুরু করতে যাবেন) এমন সময় দেখলেন যে, এক ব্যক্তির বক্ষ সফ থেকে এগিয়ে আছে। তখন তিনি বললেন:- “আল্লাহ্র বান্দাহগণ! অবশ্যই তোমরা তোমাদের সফগুলো সোজা-সঠিক করে নেবে, অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের পরস্পরের চেহারায় (পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তাধারার মধ্যে) বিভেদ-মতানৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম]

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, তোমরা (সালাতে) ফাক-ফোঁকর বন্ধ করো। [সুনানে আবূ দাঊদ]

যদি কেউ ক্বাতারে কোন খালি জায়গা দেখে তাহলে সে নিজে থেকেই যেন তা পূরণ করে নেয়। যদি সে ব্যক্তি তা না করে, তাহলে (প্রয়োজনে) তার ঘাড়ে পা দিয়ে (হলেও) কেউ যেন ঐ খালি জায়গাটুকু পূরণ করতে যায়। কেননা তার কোন সম্মান নেই। [আত-তাবারানি]


৩. সংক্রামক ব্যাধি হলে তা মসজিদে না যাওয়ার ওজর হিসেবে বিবেচিত হবে, কিন্তু মসজিদে গমন করা এবং নামাযে পাশের ইবাদতকারী থেকে ১ বা ২ মিটার দূরত্বে থাকার ওজর হিসেবে এটি বিবেচিত হবে না!! কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেও সংক্রামক রোগের (প্লেগের) প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক এটা বর্ণিত নেই যে, প্লেগে আক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তি নামায পড়তে গিয়েছে এবং তার ভাই থেকে ২ মিটার দূরত্ব বজায় রেখেছে, বরং তাকে এ বিষয়ে অব্যাহতি দেয়া হতো এবং সে গৃহে নামায আদায় করে নিত... যে অঞ্চলে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সেখানে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে বিনা খরচে ও সযত্নে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হয়, এবং অসুস্থদের সুস্থদের সাথে মেশানো/একত্রিত করা হয় না... যেমনটি উসামা বিন যায়েদ হতে মুসলিম তার সহীহ্-তে বর্ণনা করেছেন যে,

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «الطَّاعُونُ آيَةُ الرِّجْزِ ابْتَلَى اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهِ نَاساً مِنْ عِبَادِهِ، فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ فَلَا تَدْخُلُوا عَلَيْهِ وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَفِرُّوا مِنْهُ» “প্লেগ হচ্ছে দুর্যোগের নিদর্শন, যার দ্বারা মহিমান্বিত ও গৌরবময় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যকার জনগোষ্ঠীকে আক্রান্ত করেন। সুতরাং, যখন তোমরা এর উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হবে তখন সেখানে প্রবেশ করো না (যেখানে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে), এবং যখন এটি কোন ভূ-খন্ডে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তোমরা সেখানে অবস্থান করছো, তখন সেখান থেকে পালিয়ে যেও না।”

অর্থাৎ, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগী সুস্থ লোকের সাথে মিশবে না এবং তাকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নির্দেশ মোতাবেক পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেয়া হবে। সুস্থ ব্যক্তিগণ মসজিদে যাবে এবং শুক্রবার ও জামাতে নামায আদায় করবে, কোনরূপ দূরত্ব বজায় না রেখেই।

তাই দূরত্ব রেখে নামাজ পড়া যাবে না। যদি কেউ ভুলবশত দূরত্ব রেখে নামাজ পড়ার পক্ষে বলে তবে তা সঠিক হবে না।]

[আল্লাহই শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং তিনিই সর্বজ্ঞ] ]

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
প্রবন্ধ

শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ

ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…

প্রবন্ধ

ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম

১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…

প্রবন্ধ

মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা

হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…