মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
প্রবন্ধ

বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব: পুঁজিবাদ ও ইসলাম

১২ মিনিটে পড়ুন৩০ এপ্রিল ২০২১
বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব: পুঁজিবাদ ও ইসলাম
“দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, এখন কী করবো বলেন? মানুষ সন্তানের লাশ ফেলে দেয় না? এখন আমাকে ওটাই মনে করতে হবে- যে আমার সন্তান মারা গেছে, আমাকে এটা ফেলে রেখেই চলে যেতে হবে”। উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সর্বশান্ত হয়ে এভাবেই কেঁদে কেঁদে বলছিলেন ফুলকড়ি স্কুলের পরিচালক তাকবীর আহমেদ। (বিবিসি.কম-৯/৭/২০)

“সুদের উপর ১৬,০০০ টাকা ধার করে এনে বাড়িওয়ালাকে টাকা দিয়ে ঘরের মালামাল নিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছি। লকডাউন হওয়ার পর বাসা ভাড়া দিতেই পারিনি। কাজই ছিলো না দিবো কীভাবে? এখানে আমার ফ্রিজ আছে ওটা বিক্রি করে দিয়েছি। কারণ আমি ফ্রিজ দিয়ে কী করবো যদি না খেয়ে জানে না বাঁচি। তারপর এই যে টিভি আছে বিক্রি করার জন্য লোক ঠিক করে রাখছি, আমরা গ্রামে গেলেই তারা এটা নিয়ে যাবে। গ্রামে আবার তেমন কাজ থাকে না। তারপরও যাইতেছি উপরওয়ালার দিকে তাকিয়ে। গরিবের তো কেউ নাই আল্লাহই আছে। স্বামীর উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সর্বশান্ত হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যাওয়ার কষ্ট এভাবেই বলছিলেন গৃহবধু সোনিয়া বেগম। (বিবিসি.কম-৬/৭/২০)

বিবিসির তথ্য মতে, করোনা পরিস্থিতিতে আয় কমেছে ৯৫% মানুষের। কাজ হারিয়েছেন ৬২% নিম্ন আয়ের মানুষ। কর্মহীন হয়ে পড়েছে ২৮% মানুষ। (বিবিসি.কম-৬/৭/২০। সংগৃহীতঃ ব্র্যাক)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য মতে, গত এপ্রিলে কর্মসংস্থানের বিজ্ঞাপন কমেছে ৮০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে ৮০ শতাংশ। (বণিক বার্তা-৮/০৮/২০)। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ছয়জন যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ২৭.৩৯ শতাংশ যুবক বেকার হয়ে পড়েছে (বণিক বার্তা-০৮/০৮/২০)। South Asia Network on Economic Modeling (SANEM)- এর তথ্য মতে, দেশে পারিবারিক আয় ৭৪ শতাংশ কমে গেছে। দারিদ্র বেড়ে ৪০.৯ শতাংশ হয়ে যাবে। দেশে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর এক তৃতীয়াংশই বেকার। (প্রথমআলো.কম-২.১২.১৯)। এই যখন বাস্তব চিত্র, তখন সরকার নিজেই করোনাকালে সোনালী আঁশ খ্যাত ২৫ টি পাটকল বন্ধ করে দিয়ে ২৫,০০০ শ্রমিককে কর্মহীন করেছে।

অন্যদিকে, US Census Bureau একটি জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ মিলিয়ন মানুষ বলেছে তাদের পর্যাপ্ত খাবার নেই যা দিয়ে তারা স্বাভাবিক ভাবে অন্ন নির্বাহ করতে পারে (সিএনএন.কম-৩১/০৭/২০)। যুক্তরাষ্ট্রে এই করোনাকালীন সময়ে প্রাপ্ত বয়স্কদের ৫০% মানুষ তাদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে অবস্থান করছেন। (সিএনএন.কম-৩০/০৭/২০)। করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মহীন হয়ে পড়েছে আড়াই কোটির বেশি মানুষ। সারা বিশ্বে প্রায় ২৭ কোটি তরুণ-তরুণী কর্মহীন হয়ে পড়েছে (বণিকবার্তা-৮/০৮/২০)। আফ্রিকা ও আমেরিকায় ৮১ শতাংশ, এশিয়া প্যাসিফিকে ২১.৬ শতাংশ, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ৭০ শতাংশ শ্রমিক তাদের উপার্জন হারিয়েছে। (ilo.org)। বিবিসির তথ্য মতে, যুক্তরাজ্যে ২.৬ মিলিয়ন মানুষ দাবি করেছে তাদের কোন কর্মসংস্থান নাই। (বিবিসি.কম)। ভারতে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। (প্রথমআলো.কম-৬.৫.২০)। করোনাকালে লাখো প্রবাসী কর্মী বেকার হয়ে পড়েছে। (প্রথমআলো.কম-২৫.০৪.২০)। আইএলও এর তথ্য মতে, ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ৩ কোটি ৮৪ লাখ লোক বেকার থেকে যাবে। (প্রথমআলো.কম-২১.০১.২০)। আইএলও তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসের মধ্যে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছেন। (প্রথমআলো.কম-১৫.৬.২০)।

সুতরাং অতীত রেকর্ড সহ করোনাকালীন সময়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত বিশ্বে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য নূন্যতম উপার্জনের ক্ষেত্র সৃষ্টির বিষয়টি শাসক শ্রেণীর নিকট সবসময় উপেক্ষিত থেকেছে।

বেকারত্বের যে সংস্কৃতি গোটা বিশ্বে বিদ্যমান তার কারণ কী?

মূলত দুটি কারণ প্রত্যক্ষ করা যায়। বর্তমান প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আদলে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী এই শাসক শ্রেণী। পুঁজিবাদী ত্বত্ত্ব অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রের মানুষের মৌলিক চাহিদা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে ঐ রাষ্ট্রের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর তথা জিডিপি প্রবৃদ্ধির উপর। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেহেতু সম্পদ ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড মূলত সমাজের কতিপয় ব্যক্তির হাতে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। আর সেই কতিপয় ব্যক্তিরা হলো সমাজের কিছু পুঁজিপতি বা এলিট শ্রেণী। এই পুঁজিপতি শ্রেনীর অদৃশ্য ও দৃশ্যমান ছায়ার বদৌলতে তাদের সম্পদ ও উৎপাদন যতই বৃদ্ধি পাবে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও ব্যক্তিক মানুষের অর্থনীতি ততই সমৃদ্ধ হবে!!!!

ফলে, প্রতিটি ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখানে খুবই অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। যার বাস্তব উদাহরণ আমরা এই করনাকালীন বিশ্বে দেখতে পেয়েছি। যেখানে বিলগেটস, ফেসবুক সহ ১০ শীর্ষ কোম্পানির আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে একই সাথে সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়েছে এবং যারা কর্মসংস্থানে যুক্ত আছেন তাদের আয় হ্রাস পেয়ে তলানীতে চলে এসেছে এবং সাধারণ মানুষ দরিদ্র থেকে আরও দরিদ্র হয়েছেন।

অন্যদিকে, এই সরকার গুলো সারা বিশ্ব ও দেশকে অমানবিক লকডাউন ঘোষণার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ব্যহত করে সাধারণ মানুষদেরকে চাকুরিচ্যত করেছে ও তাদের আয় কমিয়ে দিয়েছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথকে জটিল করে তুলেছে। অধিকন্তু, সরকারগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বেল আউট প্যাকেজ, ইঊরোপের পুনরুদ্ধার তহবিল, বাংলাদেশের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার মাধ্যমে এলিট দেরকে কিভাবে আরও সম্পদশালী করা যায় এবং তাদের আয় কে আরও বৃদ্ধি করা যায় সেটি নিশ্চিত করেছে। যার উদাহরণ, ইউরোপের ৮৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার তহবিল গঠন, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গার্মেন্টস শিল্প সহ অন্যান্য এলিট ব্যবসায়ীদের জন্য ১ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ যা পাওয়ার পর অনেক গার্মেন্টস মালিক শ্রমিকদের কে ছাটায় করেছে এবং অনেকেই ব্যবসায় বন্ধ করে শ্রমিকদের পথে বসিয়েছে। কারণ আগামী কয়েক বছর ব্যবসায় করে যে লাভ হবে তার থেকে বেশি টাকাতো তারা প্রণোদনা প্যাকেজ হিসেবে ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছেন।

মূলত পুঁজিবাদ যেহেতু প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র সমাজের কতিপয় পুঁজিপতি শ্রেণীর অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধিকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সে কারণে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের পুঁজিবাদী শাসকগুলোর দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকল্পে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের উপার্জনকে নিশ্চিত করার জন্য কোন বাস্তবিক উদ্দ্যোগ কখনই গ্রহণ করে নি, করছেও না ও ভবিষ্যতেও করবে না এবং এটি নিশ্চিতকল্পে তাদের কখনই কোন সুদূরপ্রসারী ভিশন ও কার্যকর উদ্যোগ ছিলনা। কারণ তারা তা করতে দায়বদ্ধ নন। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের অতীতে এবং বর্তমান এই করোনাকালীন সময়ে তাদের উপার্জনের পথ রুদ্ধ হয়েছে।

অর্থাৎ বেকারত্ব পুঁজিবাদের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। যেখানে শুধুমাত্র ধনীরাই যে কোন ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা (হতে পারে সেটা করোনা পূর্ব সময়ে অথবা বর্তমান করোনাকালীন সময়ে) পায় কারণ তারা তথাকথিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক জিডিপি বৃদ্ধিতে বেশি ভূমিকা রাখে। ফলশ্রুতিতে বেকারত্ব আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।

সুতরাং বাস্তবতা বিবর্জিত এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও এই ব্যবস্থার আলোকে শাসক কর্তৃক গৃহীত অকার্যকর নীতি ও উদ্যোগ এবং এই ব্যবস্থায় শাসকের জনগণের উপর দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা না থাকায় অতীত কে অনুসরণ করে বর্তমানে বেকার সমস্যা আরও প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে।

বেকারত্ব দূরীকরণে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইসলামের কী কোন বাস্তবিক সমাধান আছে?

মানবজাতির সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) কর্তৃক প্রদত্ত ব্যবস্থার নাম ইসলাম। মানুষের সকল সমস্যার মূল কারণ, স্বরূপ ও সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সম্যক অবগত। এক্ষেত্রে ইসলাম প্রত্যেক সক্ষম নাগরিকের উপর তার নিজের ও তার উপর নির্ভরশীলদের জন্য জীবিকা অর্জন করার জন্য কাজ করা ফরজ করে দিয়েছে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন- “তিনিই মহান সত্তা যিনি ভূমিকে তোমাদের অধীন করে বানিয়েছেন, তোমরা (যেভাবে চাও) এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ করো এবং তার রিযিক থেকে তোমরা আহার করো।” [সূরা মূলক: ১৫]

বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূল (সা) সাদ বিন মুয়াজ (রা) এর সাথে করমর্দন করলেন এবং তার হাতে রুক্ষতা অনুভব করলেন। যখন রাসূল (সা) তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, সাদ (রা) বললেন, “আমি আমার পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য কোদাল দিয়ে খনন করি।” রাসূল (সা) সাদ (রা) এর হাতে চুম্বন করে বললেন “এ দুটো হাতকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) পছন্দ করেন। কেউই তার নিজ হাতের উপার্জন ছাড়া উত্তম কোন খাবার আহার করতে পারে না।”


কর্মসংস্থান বিষয়টি যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পূরনের সাথে সম্পর্কিত তাই ইসলাম মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি সামষ্টিকভাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন সাপেক্ষে পৃথকভাবে বিবেচনা করে। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করা তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে তা দেখানো ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।

ইসলাম একজন শাসককে জনগনের উপর দায়িত্বশীল করে এবং তাকে বাধ্য করে প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা প্রয়োজনের নিমিত্তে তার উপার্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করা। যা একজন শাসকের জন্য ফরয করা হয়েছে।

রাসূল (সা) বলেন- “ইমাম (খলিফা) হচ্ছেন অভিভাভক এবং তিনি তার নাগরিকের জন্য দায়িত্বশীল”। [বুখারী ও মুসলিম]

অর্থাৎ শাসক হিসেবে খলিফা যেমন-জনগণের দেখাশুনা করার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সন্তুষ্টি অর্জন করে এবং একই ভাবে জনগণের দেখাশুনার দায়িত্ব অবহেলার শাস্তির বিষয়েও ভীত থাকে। আমরা সবাই অবগত, প্রথম যখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন স্বয়ং রাসূল (সা) একজন শাসক হিসেবে তার রাষ্ট্রের নাগরিকদের কর্মসংস্থান কিভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

আনসারদের মধ্যে একজন ব্যক্তি রাসুল (সা) এর নিকট আসল এবং ভিক্ষা (সাহায্য) চাইল। রাসুল (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তোমার বাসায় কি কিছুই নেই? সে বলল: হ্যা, এক টুকরা কাপড়, যার একটি অংশ আমরা গায়ে দেই এবং যার একটি অংশ আমরা নিচে বিছাই, এবং একটি কাঠের বড় পানির পাত্র যেটা দিয়ে আমরা পানি পান করি। তিনি (সা) বললেন: সেগুলি আমার নিকট নিয়ে আস। তখন ঐ ব্যক্তি সেগুলি রাসূল (সা) এর নিকট নিয়ে আসল এবং রাসূল (সা) সেগুলি তার হাত থেকে নিলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন কে এগুলিকে কিনবে? একজন ব্যক্তি বলল: আমি এগুলো এক দিরহামে কিনতে পারি। তখন রাসূল (সা) দুই থেকে তিন বার আবার বললেন: কে এক দিরহামের বেশি দিয়ে এগুলো কিনবে? তখন একজন ব্যক্তি বলল: আমি এগুলো দুই দিরহাম দিয়ে কিনতে চাই। তখন রাসূল সাঃ তাকে জিনিসগুলো দিল এবং তার নিকট হতে দুই দিরহাম নিয়ে ঐ আনসার ব্যক্তিকে দিলেন, তিনি বললেনঃ তুমি কিছু খাবার ক্রয় করো এবং তোমার পরিবারের জন্য রাখ এবং একটি কুঠার ক্রয় করো এবং আমার নিকট নিয়ে এসো। তখন সে ব্যক্তি রাসূল (সা) এর নিকট কুঠার নিয়ে আসলেন এবং রাসূল (সা) নিজে তার হাতল লাগিয়ে দিলেন এবং বললেন: যাও এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করো এবং সেগুলি বিক্রি করো............................তখন সে ব্যক্তি চলে গেল এবং কাঠ সংগ্রহ করল এবং তা বিক্রয় করল। যখন তা বিক্রি করে সে দশ দিরহাম পেল তখন সে একটি কাপড় কিনল এবং কিছু খাবার কিনে রাসূলের নিকট আসল। রাসূল (সা) বললেন: এটাই তোমার জন্য উত্তম ভিক্ষা বৃত্তির চাইতে...................................।” [তিরমিযি]

উপরোক্ত হাদীস ও ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, প্রতিটি মানুষের কর্মসংস্থান তথা উপার্জন নিশ্চিত করতে ইসলাম মূলত শাসকের উপরই দায়িত্ব অর্পন করেছে। যা শাসক হিসেবে খলিফা এই দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। আসন্ন খিলাফত রাষ্ট্র বেকারত্ব দূরীকরণে তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে বিভিন্ন বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সে বিষয়ে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কারণে খিলাফত রাষ্ট্রের খলিফা অবশ্যই –

“রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে”।

সুতরাং খলিফা মানুষের মৌলিক চাহিদা পুরণ নিশ্চিতকল্পে ও দারিদ্র দুরীকরণে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। খলিফা সকল সক্ষম ও অক্ষম ব্যক্তিদের (শিক্ষিত বেকার ও অশিক্ষিত বেকার) সামর্থ্য অনুযায়ি কাজের পরিবেশ নিম্নোক্তভাবে সৃষ্টি করবেন-

কর্মমূখী শিক্ষা প্রবর্তনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি: খলিফা কর্মমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করবেন যেমন- খনিজ সম্পদ তথা তেল, গ্যাস, কয়লা, ইউরেনিয়াম, লৌহ ইত্যাদি গবেষণা ও আহরণ এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি প্রযুক্তি শিক্ষা, চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষা, অটোমোবাইল প্রযু্ক্তি, তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষা এবং অন্যান্য কর্মমূখী শিক্ষা প্রবর্তন করবেন এবং এগুলোর কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করবেন।

খিলাফত রাষ্ট্রে শিপন রায়ের মত কোন ঘটনা ঘটবে না। যে কিনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে এখন কোন রকমে কাকড়া ও আলু-ভাত খেয়ে দিন যাপন করছে। (প্রথমআলো.কম-১.৮.২০) ভারতের ড. রাইসা আনসারির মত মেটেরিয়াল সায়েন্সে পিএইচডি করে রাস্তার ধারে সবজি বিক্রি করতে হবে না। (ইনকিলাব-২৬.০৭.২০)

ভারী শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান: খিলাফত রাষ্ট্রের অর্থনীতি হবে মূলত ভারী শিল্প ভিত্তিক। তাই রাষ্ট্র ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটাবে এবং শিল্পকে বিদেশী নিয়ন্ত্রণমুক্ত করবেন (যা বর্তমানে আমাদের শাসক গোষ্ঠী বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্টের নামে নতুন আরও ১০০ টি অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে বিদেশ নির্ভর করে চলেছেন)। যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের দূয়ার উন্মুক্ত হবে। খলীফা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে শিল্পায়নের জন্য যে ক্ষেত্রগুলো অগ্রাধিকার দিবেন তা হলো ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান, লৌহ ও ইস্পাত শিল্প, গ্যাস ও কয়লা ভিত্তিক শিল্প (যেমন- বিদ্যুৎ, সার ইত্যাদি), মোটর তৈরী শিল্প (যা ট্রাক্টর, ট্যাংক, জাহাজ, উড়োজাহাজ ইত্যাদি), গাড়ী, জাহাজ, উড়োজাহাজ তৈরী শিল্প ইত্যাদি। যেখানে রাষ্ট্রের দক্ষ নাগরিক সহ এবং অদক্ষ নাগরিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরও ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া হবে।

সচ্ছ প্রশাসনিক নিয়োগ ভিত্তিক কর্মসংস্থান: প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে সচ্ছতার সাথে এবং যোগ্যতা অনুযায়ি লোক নিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বর্তমানের মত একটি পিয়নের চাকরি পেতে ৫,০০,০০০ টাকা ঘুষের প্রয়োজন হবে না। কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হবে যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিক দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সাধীন ভাবে কর্মে নিযুক্ত হতে পারবেন।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি ভিত্তিক কর্মসংস্থান: খিলাফত রাষ্ট্র সকল সক্ষম নাগরিক কিন্তু অর্থাভাবে যারা ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না তাদের কে বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সুদ মুক্ত অর্থায়ন করবেন যাতে তারা নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে ব্যবসা করতে পারেন এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন।

যখন উমর (রা) খলিফা ছিলেন তখন তিনি ইরাকের কিছু কৃষককে বাইতুল মাল থেকে কিছু অর্থ প্রদান করেন যাতে তারা জমি চাষ করতে পারে.....................”।

অন্যদিকে, খিলাফত রাষ্ট্রে যেহেতু সম্পদের অবাহ প্রবাহ নিশ্চিত হবে সুতরাং ধনীরা তাদের পুঞ্জিভূত অর্থ বিনিয়োগ করবে ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সষ্টি হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন- “সম্পদ যেন তোমাদের কতিপয় লোকের হাতে কুক্ষিগত না থাকে”। [সূরা হাশর: ৭]

কৃষি শিল্প ভিত্তিক কর্মসংস্থান: যেহেতু বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ এবং বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটিৃ রাষ্ট্র। তাই খিলাফত রাষ্ট্র নাগরিকদের কৃষি উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলবে এবং কৃষি পণ্য ও উপকরণ সহজ লভ্য করার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।

ভূমি মালিকদের হাতে অব্যবহৃত জমি এবং যা তারা সরাসরি ব্যবহার করেনা, সেসব জমি খলীফা তাদের কাছ থেকে অধিগ্রহণ করবেন। অর্থাৎ কোন জমি যদি তার মালিকের কাছে তিন বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকে, তবে খলীফা সে জমি অধিগ্রহণ করবেন। যারা এই জমি ব্যবহার করতে সক্ষম, খলীফা সেসব দরিদ্র মানুষের কাছে তা বন্টন করে দিতে পারেন। ফলে তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। রাসূল (সা) আলকামাহ বিন ওয়াইলের বাবাকে হাজরা মাউতের রাষ্ট্রীর কিছু খাস জমি দেন, তিনি (সা) বলেন: তিনি মুয়াবিয়্যা কে পাঠিয়েছেন এটা তাকে দেয়ার জন্য”। এবং তামিম আল দারি রাসূল (সা) বললেন আল শামসের কিছু জমি আমাকে দেন.............এবং রাসূল (সা) তাকে চাষ করার জন্য তা প্রদান করেন।”

একই সাথে খিলাফত রাষ্ট্র গবাদী পশু, পোল্ট্রি ও মৎস শিল্পকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা দিয়ে সেখানে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবেন। সুতরাং খিলাফত রাষ্ট্র বিভিন্ন বাস্তবিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিকদের বাস্তবতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবেন। যা নিশ্চিত করতে খলিফা বদ্ধপরিকর থাকবেন।

তাই আসুন আমরা খিলাফত রাষ্ট্র ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করি ও আল্লাহর কাছে দোয়া করি এবং ইসলামের ছায়াতলে থেকে সত্যিকারের উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবন যাপন উপভোগ করি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- “যে ব্যক্তি আমার স্বরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, অবশ্যই তার রিযিক সংকচিত হয়ে যাবে, এবং তাকে আমি কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় হাযির করব”। [সূরা ত্বা-হা: ১২৪]

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
প্রবন্ধ

শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ

ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…

প্রবন্ধ

ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম

১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…

প্রবন্ধ

মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা

হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…