মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
প্রবন্ধ

টেলিভিশন সিরিয়াল ও ইসলাম

১১ মিনিটে পড়ুন২ জুলাই ২০২১
টেলিভিশন সিরিয়াল ও ইসলাম
১৯৯০ দশক থেকে শুরু করে ২০ বছরের মধ্যে দেশের আনাচে-কানাচে বিস্তৃতি লাভ করে স্যাটেলাইট টিভির নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে মানুষের ঘরে ঘরে বেডরুমে দখল করে নেয় হিন্দি সিনেমা, ড্যান্স এবং সিরিয়ালসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠান ঘিরে সবসময়ই অভিযোগ ছিল অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা এবং বেহায়াপনা।

এর প্রভাবে আমাদের সমাজেও অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা এবং বেহায়াপনার বিস্তার এবং তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এসব বন্ধেরও দাবি উঠে বারবার। সামাজিক অবক্ষয়, অনাচার, অশ্লীলতা, লজ্জাহীনতা, পরকীয়া, পারস্পরিক সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরানো, কূটনামির বিষবাষ্প ছড়াতে ভারতীয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিশেষ কুপ্রভাব বিস্তার করছে। তরুণ-তরুণীরা হিন্দি সিনেমা, ড্যান্সের প্রতি যেমন আসক্তিতে জড়ায় তেমনি গৃহিনীরা আসক্ত হয়ে পড়ে হিন্দি সিরিয়ালের প্রতি।

ইন্টারনেটের বদৌলতে তরুণ প্রজন্মের কাছে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ফেসবুক। এছাড়া ইউটিউব, গুগল, টুইটার ছাড়াও রয়েছে হাজারো উপায়। যার মাধ্যমে মানুষ সহজে তার চাহিদার বিষয় খুঁজে বের করতে পারে এবং সময় কাটাতে পারে। যে পর্নোগ্রাফি ছিল একসময় ভিডিও দোকানে সীমাবদ্ধ, তা এখন চাহিবামাত্র ক্লিক করলেই চলে আসে সামনে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে না চাইতেও বিভিন্নভাবে কোনো না কোনো লিংকের সূত্র ধরে এসব সাইটে ক্লিক করার জন্য বিজ্ঞাপন আকারে অফার আসতে থাকে ইন্টারনেট জগতে বিচরণ করার সময়। ছেলে আর মেয়ে বলে কথা নয়, মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও নেই এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন ব্যাপার। এমনকি স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদের মোবাইলফোনে রয়েছে পর্নো ভিডিও।

যেকোনো সমাজে মিডিয়ার প্রভাব খুবই জোরালো। বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে ভারত এই মাধ্যমটিকেই মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। আর এতে ভারত শতভাগ সফলতা পেয়েছে। এক সময় যে নারী, যে শিশু সারাজীবন একটিও হিন্দি ছবি দেখার সুযোগ পায়নি; আজ এরা বাংলাদেশের ঘরে বসে দেখছে শত শত হিন্দি ছবি আর সিরিয়াল। এর মাধ্যমে এরা ক্রমেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে। আজ আমাদের বিয়ের উৎসব-আয়োজনও হারাতে বসেছে মুসলিম ঐতিহ্য। আমাদের পোশাক-আশাকে আসছে ভারতীয় ঢং। মুসলমানদের বিয়ের উৎসবেও চলে হিন্দিগান আর নাচের অশ্লীল আয়োজন, আলাদা আলাদা দিনে। এজন্য বিয়ের উৎসবের সময়-পরিধিও বেড়ে গেছে কয়েক দিন। বাড়তি দিনগুলোতে ভারতীয় সিরিয়ালের আদলে চলে হিন্দি নাচ-গান, যা কয় বছর আগেও এদেশে ছিল অকল্পনীয়। আজ দরজিবাড়িতে হিন্দি সিরিয়াল আর সিনেমার নায়কের পোশাকের আদলে পোশাক তৈরি করতে অর্ডার যাচ্ছে। ড্রেস ডিজাইনারেরাও শিকার একই প্রবণতার। মরণঘাতী এ ছোবল আমাদেরকে ক্রমেই করে তুলছে পরনির্ভর সংস্কৃতির ধারক-বাহক। ভারতীয় সংস্কৃতি আজ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে আমাদের অনেক মেধাবীদেরকেও। এরা নিজস্ব আইডিয়ার স্ফুরণ ঘটানোর পরিবর্তে আজ ভারতীয় কুসংস্কৃতি অনুকরণেই বেশি আগ্রহী। ভারতীয় অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কুপ্রভাব আজ আমাদের সমাজে চলে গেছে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে।

রাসূল সা: বলেন, যে ব্যক্তি ভিন্ন ধর্মের লোকদের পোশাক পরবে, সে আমার দলের অন্তর্ভুক্ত নয়। (তাবরানি, হাদিস ৩৯২১)

সাপ্তাহিক ব্লিটজ পত্রিকার সাম্প্রতিক এক জরিপে উল্লেখ করেছে, ভারতীয় কোন্ চ্যানেল বাংলাদেশ থেকে কত আয় করছে। বিদেশী টিভি চ্যানেল, যার বেশির ভাগই ভারতীয় বাংলাদেশের ক্যাবল নেটওয়ার্কে অনুমোদিত। পত্রিকাটি জানিয়েছে, প্রতি মাসে ভারতীয় চ্যানেলগুলো মোটা অঙ্কের অর্থ বাংলাদেশ থেকে আয় করছে গ্রাহকচাঁদা ও বিজ্ঞাপন বিক্রি থেকে।

উল্লেখ্য, ভারতীয় চ্যানেলগুলোর কোনটি বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে কত আয় করছে, তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ব্লিটজ জরিপদল। এই তালিকা মতে, এসব চ্যানেলের মাসিক আয় এরূপ:
স্টার প্লাস ১ লাখ ৯৫ হাজার ইউএস ডলার, স্টার মুভিজ ১ লাখ ১৮ হাজার ডলার, জি স্টুডিও ৯৪ হাজার ডলার, জিটিভি ৬৭ হাজার ডলার, সনি ১ লাখ ২৩ হাজার ডলার, সেটম্যাক্স ৭২ হাজার ডলার, স্টার গোল্ড ৬১ হাজার ডলার, জি-সিনেমা ৯৫ হাজার ডলার, স্টার স্পোর্টস ৭০ হাজার ডলার, বিএইউ পাঁচ হাজার ডলার, স্টার জলসা ১৭ হাজার ডলার, জি প্রিমিয়ার ৩৯ হাজার ডলার, জি-অ্যাকশন ২৯ হাজার ডলার, জি-কাফে ১৯ হাজার ডলার, জি-বাংলা ১৭ হাজার ডলার, সাব টিভি ৬ হাজার ডলার, তারা টিভি ৬ হাজার ডলার, তারা মিউজিক ৬ হাজার ডলার, স্টারওয়ান ২৩ হাজার ডলার এবং স্টারওয়ার্ল্ড ২৩ হাজার ডলার।

উল্লেখ্য, এ তালিকা সম্পূর্ণ নয়, তবে এ থেকে আন্দাজ-অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি ডলার বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে।

ভারতের ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক আগ্রাসনে যুব সমাজ শেষ হবার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবার পর এবার ঐ দেশের টিভি সিরিয়ালের আগ্রাসনে রীতিমতো মগজ ধোলাই হতে চলেছে এই জাতির। মুসলিম জন্ম পরিচয় আর নামে আমরা যতই মুসলমান হই না কেন- চলনে, বলনে, কথনে, মননে আমরা হবো ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক। নাউযুবিল্লাহ! নিজস্ব স্বকীয়তা বলতে আমাদের কিছু থাকবে না। এটাই হয়তো ভারতীয় সিরিয়াল নির্মাতা কুবুদ্ধিজীবীদের টার্গেট। একটা জাতিকে মননে ভারতীয় বানাতে পারলে স্বার্থ হাসিল করা কোনো কষ্টকর ব্যাপারই নয়। তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করে দেশ দখলের যুগ এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখনকার বুদ্ধিজীবীদের ধ্যান-ধারণা হলো মানুষের মনের জগতটাকে দখল করা। ভারতীয় সিরিয়ালগুলো বাংলাদেশের মানুষের মগজধোলাই কাজে বেশ পারঙ্গমতার পরিচয় ইতোমধ্যেই দিয়েছে।

ভারতীয় টিভি সিনিয়ালগুলোর মূল বিষয়বস্তু তিনটি।

প্রথমত, সিরিয়ালগুলোতে ভরপুর থাকে পারিবারিক ও সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ, প্রতিযোগিতা, প্রতিহিংসা ও ঝগড়া। এটাকে কেন্দ্র করে গোটা সিরিয়ালজুড়েই থাকে কুটবুদ্ধির চর্চা।

প্রতিহিংসা রূপ নেয় একে অপরকে ধ্বংস বা হত্যা অথবা হত্যা ষড়যন্ত্রের পর্যায়ে। গৃহবধূ, নারী এবং কিশোরীরা এই ঝগড়া-ঝাটি দেখতে বেশ পছন্দ করে। এটা তাদের মনের মধ্যে দাগ কাটে, নিজেদের প্রবৃত্তিটাও আস্তে আস্তে সেভাবেই বিকশিত হয়। আর পরিণত বয়সীদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে এই সিরিয়াল দেখে। তাদের ভিতরের স্বভাবটাও আস্তে আস্তে ঝগড়াটে স্বভাবে রূপ নেয়। এটা যখন বাস্তবে রূপ লাভ করে; তখন পরিবারগুলোতেও দেখা দেয় প্রতিহিংসা, দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও ঝগড়াটে পরিস্থিতি। এরূপ প্রতিহিংসার জন্ম হয় মা-মেয়ের মধ্যে, বোনে-বোনে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, বাপ-ছেলে, স্বামী-স্ত্রীতে, বউ-শাশুড়িতে, বউ-ননদে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাঝে। সব মিলিয়ে এক পারিবারিক দ্বন্দ্ব যেন আমাদের পরিবার প্রথাকেই হেয় করে প্রস্ফুটিত করা এসব সিরিয়ালের মৌলিক উদ্দেশ্য। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাঝে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও মুহব্বতের সম্পর্ক থাকার কথা আমাদের ধর্ম আমাদের পরিবার প্রথা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুসারে। কিন্তু সেটাকে সূক্ষ্মভাবে ভেঙে দেয়ার চেষ্টা চলছে টিভি সিরিয়ালের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে।

দ্বিতীয় বিষয়বস্তু হলো ‘পরকীয়া’। ভারতের বাংলা চ্যানেল জি-বাংলা, স্টার জলসা, ইটিভি, হিন্দি চ্যানেল জিটিভি এবং স্টার প্লাস সর্বাধিক সিরিয়াল প্রচার করে থাকে। এগুলোর সবই বাংলাদেশে জনপ্রিয়। এসব সিরিয়ালের অন্যতম মৌলিক বিষয়বস্তু থাকে ‘পরকীয়া’। এক নারীর সাথে একাধিক পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক, বিবাহবহির্ভূত মেলামেশা, আবার এক পুরুষের সাথে একাধিক নারীর দৈহিক সম্পর্ক ও মেলামেশাকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হয় ভারতের চ্যানেলগুলোর টিভি সিরিয়ালে। এগুলোকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবর্তে সৃষ্টি হয় সন্দেহের। স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী স্ত্রীকে সন্দেহ করে। ফলে সুখের সংসারে আগুন লাগে। কখনো কখনো নতুন বউ ঘরে আসতে না আসতেই এই সন্দেহ দানা বেঁধে উঠে।

মাদকাসক্তির মতো আগ্রহ নিয়ে এইসব সিরিয়ালের কাহিনী পর্যবেক্ষণের কারণে আমাদের সমাজেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। স্বামী সকালে বাসা থেকে বের হয়ে সারা দিন কি করে, সে কি চাকরি করে, না প্রেম করে, না আরেক মেয়ের কাছে সময় কাটিয়ে আসে, অফিসে কি সে তার কোনো নারী কলিকের সাথে বা কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে কিনা- এমন সন্দেহ ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে এই টিভি সিরিয়ালের কুপ্রভাবে। একইভাবে উল্টো সন্দেহের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক স্বামীর মাঝে। কারণ তিনি থাকেন সারা দিন বাইরে, ঘরে একা নারী অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এভাবে একে অপরকে সন্দেহ করার বিষয়টি দাঁড়িয়েছে এখন আমাদের ঘরে ঘরে। এ কারণে বিশ্বাসের জায়গা, মুহব্বতের জায়গা, একে অপরের অধিকারের জায়গাটা আগের মতো আর থাকছে না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে চলে ভারতের একেকটি সিরিয়াল। যার পুরোটাজুড়েই আবর্তিত থাকে পরকীয়া।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, মুহব্বতের মধ্য দিয়েই পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতা এবং শান্তির আবাসস্থল। বিশ্বাস না থাকলে বাস্তবে পৃথিবীতে কোনো সভ্যতাই গড়ে উঠতো না। সেই বিশ্বাস যেন ভেঙে দিতে চাইছে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো।

‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ’ [বনী ইসরাঈল ১৭/৩২]

মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। [সূরা নূর-৩০-৩১]


ভারতীয় টিভি সিরিয়ালগুলোর তৃতীয় মৌলিক বিষয়বস্তু হলো পূজা। সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, পরকীয়া বা যা কিছু নিয়েই দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা বা প্রতিহিংসা যখন চরম পরিণতির দিকে যায় তখন পূজা করলে তার সমাধান হয়ে যায়। নাউযুবিল্লাহ! পূজাই তথাকথিত সত্যের উপর অবিচল থাকা নায়ক বা নায়িকার শেষ আশ্রয়স্থল। নাউযুবিল্লাহ! ভারতের বাংলা বা হিন্দি সিরিয়ালগুলোতে সেটাই দেখা যায়। চরম সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতিতে যখন কেউই তার পক্ষে নেই বলে মনে হয়, তখন দেখা যায় যে, সংক্ষুব্ধ নায়ক, নায়িকা বা সংশ্লিষ্ট চরিত্রের ব্যক্তি দেবীদুর্গার কাছে, কখনো কালির কাছে, কখনো স্বরসতীর কাছে, কখনো গণেশ, আবার কখনো রাম বা অন্য কোনো দেবতার মন্দিরে মূর্তির কাছে কান্নাকাটি করছে। দেবতার কাছে পূজা দিচ্ছে, তার কাছেই সব সমস্যার সমাধান খুঁজছে। শেষ পর্যন্ত সমাধানও তাদের দেবতার কাছে গিয়েই হচ্ছে। একটা বিষয় খুবই লক্ষণীয় যে, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে চলা মেগা সিরিয়ালের কাহিনী, কথোপকথন এবং ঘটনা পরম্পরায় যখন যে পূজা তখন সেখানে গিয়ে আবর্তিত হয়। সিরিয়ালের সুদক্ষ কাহিনীকার, পরিচালক, প্রযোজক পূজার পর্বগুলো এমনভাবে সাজায়, যেন কাহিনী এই পূজা উপলক্ষে সবেমাত্রই লেখা হয়েছে। সিরিয়ালের শেষ মীমাংসাও হয় পুজায়। বাস্তবে কৌশলে সিরিয়ালগুলোতে তারা তাদের হিন্দু ধর্মটাকেই প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করছে। পূজাকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দিচ্ছে সিরিয়ালগুলোতে।

অর্থাৎ হিন্দি সিরিয়ালের কারণে বাংলাদেশের মুসলমানদের ঘরে ঘরে প্রতিদিনই নয়; বরং প্রতিঘন্টাতেই পূজা হচ্ছে। নাউযুবিল্লাহ!

এই সিরিয়ালগুলোর কারণে আমাদের যে শুধু পাপ কামাই হচ্ছে তাই নয়, এর ফলে ছেলে মেয়েদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

যে সিরিয়ালগুলোতো মূর্তির পূজা থাকে, মূর্তির কাছে অকাতরে প্রার্থনার দৃশ্য থাকে, আমরা যারা পাগলের মতো সেই সিরিয়ালগুলো দেখি, তারা কি ক্ষমার যোগ্য? আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনি শুধু দেখছেন, কিন্তু না, আপনি শুধু দেখছেন না, আপনি এইসব সিরিয়াল দেখার মাধ্যমে মূর্তিপূজাকে নীরব সমর্থনও দিচ্ছেন! আপনার দেখার কারণে এইসব ঘৃণ্য সিরিয়ালের নির্মাতারা প্রচুর বিনিময় অর্জন করছে এবং তারা এরকম শতশত সিরিয়াল নির্মাণের সমর্থন পাচ্ছে!

আমরা কোথায় চলে গেছি! সিরিয়ালগুলোতে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটা নিয়ে মেয়েদের মন খারাপ। ইনডিয়ান স্টাররা কী করছে না করছে সেটা নিয়ে অকারণ আলাপ। এই অস্থায়ী স্টারদের যে কী পরিমাণ তারা পছন্দ করে, কী যে ক্রেইজি ফ্যান তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না। অথচ একজন মানুষের তাদের সাথেই কেয়ামত হবে যাদের সে ভালোবাসে, পছন্দ করে। যদি এইসব অমুসলিম আর্টিস্টদের সাথে একজন মুসলিমের কেয়ামত হয়, কী ভয়ঙ্কর আজাবপ্রাপ্তই না হতে পারে মুসলিম মানুষটা!

আসলে আমাদের এইসব সিরিয়াল এতবেশি আমাদের মনে ছায়া ফেলেছে যে, এগুলোকে আমাদের আর পাপ বলে মনে হয় না। অথচ এই সিরিয়ালগুলো এমন ট্যাবলেট, সমাজে শুধু অশ্লীলতা আর অবাধ্যতাই নয়, ধীরে ধীরে একদিন ভয়ঙ্কর আজাব ডেকে আনবে!

রাসূল সা: বলেন, “মানুষ কিয়ামাতে তার সাথেই থাকবে যাকে সে ভালোবাসে।” [সহীহ মুসলিম, হা/৬৪৭৭]

‘হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ শয়তানের নাপাক কর্ম বৈ কিছুই নয়। অতএব এগুলি থেকে বিরত হও। তাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হবে। শয়তান তো কেবল চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও ছালাত হ’তে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করতে। অতএব তোমরা নিবৃত্ত হবে কি? [মায়েদাহ ৫/৯০-৯১]

উমার ইবনে খাত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন “তোমরা মুশরিকদের উপসনালয়ে তাদের উৎসবের দিনগুলোতে প্রবেশ করোনা। কারন সেই সময় তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হতে থাকে। (বায়হাক্বী)


তাই আসুন, আমরা এসব পরিহার করি। হয়তো আপনি নিজে আক্রান্ত নন। তাহলে আপনার চেনা কেউ না কেউ, যে আক্রান্ত; তাদের বলি। তাদের হাতে এসবের বিপরীতে বই তুলে দেই। খাদিজা (রা:), আয়েশা (রা:), হাফসা (রা:), ফাতেমা (রা:) নারী জাতির রোল মডেল। আমাদের মুসলিম মা, বোন, ভাবীদের উচিত তাদেরকে অনুসরণ করা। উমর (রা:), মুসআব (রা:), সাদ বিন মুয়াজ (রা:), আলী (রা:) আমাদের মুসলিম যুবকদের রোল মডেল হওয়া উচিত।

এই নষ্ট পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের প্রতিনিয়ত কুফর ও শিরকীয় কাজে উৎসাহিত করছে এবং ফিতনা তৈরী করছে। ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থা অশ্লীলতা, পরকীয়া, শিরক ও মাদক মুক্ত সমাজ তৈরি করবে। আমাদের উচিত খিলাফত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে চেষ্টা করা ও বেশি বেশি নামাজ পরে আল্লাহর কাছে দুআ করা।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে আমাদের ছেলে মেয়ে, মা, ভাই, বোন, আত্মীয়-স্বজন ও সকল মুসলমানকে চলমান এ ফিতনা থেকে বেঁচে থেকে সঠিক পন্থায় আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে সচেষ্ট হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
প্রবন্ধ

শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ

ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…

প্রবন্ধ

ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম

১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…

প্রবন্ধ

মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা

হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…