উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের প্রভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত গরিবি বাংলাদেশ
৭ মিনিটে পড়ুন১৪ মার্চ ২০২২
বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হলেই হতদরিদ্র, অপুষ্ট, প্রাকৃতিক দূর্যোগে পর্যুদস্ত একটি জনপদের চিত্র মানুষের চোখে ভেসে উঠে। সচেতন লোকমাত্রই জানে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের ‘মিসকীন’ নামে ডাকা হয়। যদিও বর্তমান সরকারের সময়ে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এ রূপান্তরিত হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা হয়। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র বাংলাদেশ ও ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এর মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পায় না। ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ তকমাটির সাথে সরকার কিছু পরিসংখ্যানের কথা বলছে। সেগুলো হল: মাথাপিছু আয়, দৃঢ় জিডিপি, বিভিন্ন সামাজিক সূচক (স্বাক্ষরতার হার, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতাধীন জনগণ, বাল্যবিবাহ, চিকিৎসা সুবিধার আওতাধীন জনগণ ইত্যাদি) প্রভৃতি। এসব ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে কিনা এটি প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য পরিসংখ্যান একটি ভাল উপায় এবং এসব উপাত্ত অর্জনের প্রক্রিয়ার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। তাছাড়া পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে আমাদের শাসকদের বিশ্বাস করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় যুতসই শাসক জনগণকে ধোঁকা দেয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হবে-এটাই স্বাভাবিক ও নিয়ম।
মনে রাখা দরকার যে, পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ প্রত্যেকটি ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ব নেয় না বা দায়িত্ব নেয়াও তার লক্ষ্য নয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সূচক সমূহ প্রতারণামূলক। এসব সূচক সর্বদা একটি গড় ধারণা দেয়। ভাল জিডিপি বা মাথাপিছু আয় থেকে ধারণা পাওয়া যাবে না যে- দেশে প্রত্যেকটি মানুষের উন্নয়ন হচ্ছে, গরীব ও ধনীর মধ্যকার বৈপরীত্য হ্রাস পেয়েছে, দেশে শিল্পায়নের বিকাশ ঘটেছে, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, বেকারত্ব হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে- ওয়াল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোট ২০১৭: চীন ভারতের চেয়েও দ্রুতহারে ধনী বাড়ছে বাংলাদেশে (সূত্র: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর), মাথাপিছু ঋণ ৬০ হাজার টাকা (সূত্র: ০৯ জুন- ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)- এ সুদের পরিমাণ পদ্মা সেতুর ব্যয়ের দ্বিগুন, দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ২০১৮)।
বিগত দশ বছরে বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ায় বাংলাদেশে বড় কোন বিনিয়োগ হয়নি এবং সেকারণে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বিধায় তাদের ভাগ্যেরও কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে ভাগ্যের যে কারও পরিবর্তন হয়নি এমন নয়। সরকার দলীয় লোকদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫০% এরও বেশী, সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংকসমূহ লুট হয়েছে, মালয়েশীয় সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে, সুইস ব্যাংকে কালো টাকার পাহাড় বেড়েছে, দূর্নীতির দায়ে পানামা পেপার্সে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগকারী সামিট পাওয়ার সিঙ্গাপুরের শীর্ষ দশ ধনীর একজনে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক সম্পদশালী পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর সম্পদশালীদের চেয়ে বেশী ধনী। ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউনের অনলাইন রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে প্রাইভেট গাড়ি বিক্রয় বেড়েছে তিনগুন। ঢাকার রাস্তায় চলা হ্যারিয়ার, লেক্সাস, প্রাডো, বি এম ডব্লিউ প্রভৃতি বিলাসবহুল গাড়ির ক্রমবর্ধমান সংখ্যাই দেশের ধনী লোকদের সম্পদের পরিমাণ সর্ম্পকে আমাদের ধারণা দেবে। অর্থাৎ দেশের সাধারণ জনগনকে দরিদ্র রেখে বিশাল সম্পদ কিছু রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর পকেটে চলে গেছে। বেইজিং ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Hurun Global এর মতে, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারী খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান ১.৩ বিলিয়ন ইউ এস ডলার নিয়ে বিশ্বের ২২৫৭ জন বিলিওনিয়ারের মধ্যে ১৬৮৫ তম অবস্থানে রয়েছে। অপরদিকে ফোর্বস ম্যাগাজিনের মতে, সালমান এফ রহমানের সম্পদের পরিমাণ ৫.৫ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। এয়াড়াও বাংলাদেশের বিখ্যাত বিলিওনিয়ারদের মধ্যে যাদের নাম শীর্ষে রয়েছে তারা হলেন, ড্যাটকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মুসা বিন শমসের (সম্পদের পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান (সম্পদের পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় (সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আবুল হোসেন (সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), বসুন্ধরা গ্রুপের কর্ণধার আহমেদ আকবর সোবহান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর। ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের ধনীরা চীন, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং, আয়ারল্যান্ড, ইসরাইল, পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি হারে ধনী হচ্ছে। রাষ্ট্রের পুরো ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিশেষত কর ব্যবস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত উপার্জন লুট করা হচ্ছে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশ একটি দরিদ্র রাষ্ট্র।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে পশ্চিমাদের তাবেদার শাসকগোষ্ঠী একের পর এক উপনিবেশবাদী কাফেরদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (পুঁজিবাদ) বাস্তবায়ন করছে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর শোষণমূলক নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি দারিদ্রতাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অর্থাৎ তিন বিলিওনের চেয়ে বেশী লোক দরিদ্র অর্থাৎ দৈনিক ২.৫ ডলারেরও কম আয় করে। ১.৩ বিলিওয়নের চেয়েও বেশি লোক অতি দরিদ্র অর্থাৎ ১.২৫ ডলারেরও কম আয় করে। ১ বিলিয়ন শিশু দারিদ্রতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। ইউনিসেফের মতে, প্রতিদিন ২২০০০ শিশু দারিদ্রতার কারণে মারা যাচ্ছে। ৮০৫ মিলিয়ন লোকের খাওয়ার মত যথেষ্ট খাবার নেই। ৭৫০ মিলিয়নের বেশী লোক নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। অপর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি, পয়নিষ্কাশন এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে প্রতিদিন ডায়রিয়াতে ২৩০০ লোক মারা যাচ্ছে। ২০০১ সালে সম্পদের চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে অকুপাই ওয়ার্ল্ড স্ট্রীট আন্দোলন হয়েছিল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়রা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে সম্পদ লুট করছে। একারণে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার আওতায় বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর নিয়ন্ত্রন বাংলাদেশে দারিদ্রতার প্রধান কারণ।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে পরোক্ষ উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদে প্রবেশ করে। নব্য উপনিবেশবাদে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহ প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও একজন দালাল শাসক দ্বারা ঐ দেশের জনগণকে পরোক্ষভাবে শাসন, শোষন করে। সে পুতুল শাসক কাফের উপনিবেশবাদীদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে, আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী শোষণমূলক অর্থনীতিকে ঢেলে সাজায়, উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে দেশের গণমালিকানাধীন সম্পদ (খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ) তুলে দেয়। বিনিময়ে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ঐ দালাল শাসককে ক্ষমতায় টিকে থাকার গ্যারান্টি প্রদান করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লার মালিকানা এ দেশের জনগণের হলেও উপনিবেশবাদী বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর (শেভরণ, ইউনোকল, কনকো ফিলিপস, এশিয়া এনার্জি, গ্যাসপ্রম, নাইকো প্রভৃতি) কাছে বিভিন্ন সরকার মালিকানার সত্ত্ব বিক্রি করে এবং পরবর্তীতে উচ্চ আর্ন্তজাতিক মূল্যে সেগুলো জনগণের কাছে বিক্রি করে। এভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের কাছে চলে যায় এবং জনগণকে দারিদ্রের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ রাখা হয়।
মোদ্দাকথা, উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এবং তাদের ঘৃণিত জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজকে গরীব হয়ে আছে।
অমিত সম্ভাবনার এক দেশ-বাংলাদেশ। একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য সব যোগ্যতাই বাংলাদেশের রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই সমতল ও উর্বর। দীর্ঘদিন যাবত ক্রমহ্রাসমান উর্বর কৃষিজমি ক্রমবর্ধমান জনগনের খাদ্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করে আসছে । এখানকার প্রায় সব লোক এক ভাষাতেই কথা বলার কারণে তথ্য আদান প্রদান এবং ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা খুবই সহজ । বাংলাদেশের গ্যাস, কয়লা, ইউরেনিয়ামের মজুদ জনগণের জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের রোদ, নদী, বিশাল সৈকতের বাতাস থেকেও শক্তি উৎপাদন সম্ভব। আমাদের রয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত-যাও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। আমাদের সামুদ্রিক জল সীমানাও খনিজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ। তিন দিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ের সারি ও দক্ষিণ দিকে থাকা অসভীর সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশকে সামরিকভাবে ‘ডিফেন্ডারস হেভেন’ এ পরিণত করেছে। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও চীনের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের জনগনের বড় একটি অংশ তরুণ-যাদেরকে সহজেই জনসম্পদের পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনগণ পরিশ্রমী, মেধাবী ও সৃজনশীল। খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন, ণির্মাণ শিল্প, বস্ত্রশিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। এতসব আর্শীবাদ থাকা সত্ত্বেও দূরদর্শী আদর্শিক নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশকে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শাসন, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা উপনিবেশবাদী শক্তি দ্বারা আরোপিত। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস ইসলাম থেকে এসেছে কিন্তু জীবন পরিচালনার সব ব্যবস্থা ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন কিছু থেকে এসেছে। সেকারণে বিশ্বাস ও ব্যবস্থার বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশ এগুতে পারছে না। বাংলাদেশকে যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি পরাশক্তিতে পরিণত করতে চাই তাহলে ইসলামি মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থা লাগবে। আর এরকম ব্যবস্থাই হল খিলাফত ব্যবস্থা। একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
মনে রাখা দরকার যে, পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ প্রত্যেকটি ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ব নেয় না বা দায়িত্ব নেয়াও তার লক্ষ্য নয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সূচক সমূহ প্রতারণামূলক। এসব সূচক সর্বদা একটি গড় ধারণা দেয়। ভাল জিডিপি বা মাথাপিছু আয় থেকে ধারণা পাওয়া যাবে না যে- দেশে প্রত্যেকটি মানুষের উন্নয়ন হচ্ছে, গরীব ও ধনীর মধ্যকার বৈপরীত্য হ্রাস পেয়েছে, দেশে শিল্পায়নের বিকাশ ঘটেছে, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, বেকারত্ব হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে- ওয়াল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোট ২০১৭: চীন ভারতের চেয়েও দ্রুতহারে ধনী বাড়ছে বাংলাদেশে (সূত্র: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর), মাথাপিছু ঋণ ৬০ হাজার টাকা (সূত্র: ০৯ জুন- ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)- এ সুদের পরিমাণ পদ্মা সেতুর ব্যয়ের দ্বিগুন, দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ২০১৮)।
বিগত দশ বছরে বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ায় বাংলাদেশে বড় কোন বিনিয়োগ হয়নি এবং সেকারণে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বিধায় তাদের ভাগ্যেরও কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে ভাগ্যের যে কারও পরিবর্তন হয়নি এমন নয়। সরকার দলীয় লোকদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫০% এরও বেশী, সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংকসমূহ লুট হয়েছে, মালয়েশীয় সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে, সুইস ব্যাংকে কালো টাকার পাহাড় বেড়েছে, দূর্নীতির দায়ে পানামা পেপার্সে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগকারী সামিট পাওয়ার সিঙ্গাপুরের শীর্ষ দশ ধনীর একজনে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক সম্পদশালী পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর সম্পদশালীদের চেয়ে বেশী ধনী। ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউনের অনলাইন রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে প্রাইভেট গাড়ি বিক্রয় বেড়েছে তিনগুন। ঢাকার রাস্তায় চলা হ্যারিয়ার, লেক্সাস, প্রাডো, বি এম ডব্লিউ প্রভৃতি বিলাসবহুল গাড়ির ক্রমবর্ধমান সংখ্যাই দেশের ধনী লোকদের সম্পদের পরিমাণ সর্ম্পকে আমাদের ধারণা দেবে। অর্থাৎ দেশের সাধারণ জনগনকে দরিদ্র রেখে বিশাল সম্পদ কিছু রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর পকেটে চলে গেছে। বেইজিং ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Hurun Global এর মতে, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারী খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান ১.৩ বিলিয়ন ইউ এস ডলার নিয়ে বিশ্বের ২২৫৭ জন বিলিওনিয়ারের মধ্যে ১৬৮৫ তম অবস্থানে রয়েছে। অপরদিকে ফোর্বস ম্যাগাজিনের মতে, সালমান এফ রহমানের সম্পদের পরিমাণ ৫.৫ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। এয়াড়াও বাংলাদেশের বিখ্যাত বিলিওনিয়ারদের মধ্যে যাদের নাম শীর্ষে রয়েছে তারা হলেন, ড্যাটকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মুসা বিন শমসের (সম্পদের পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান (সম্পদের পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় (সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আবুল হোসেন (সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), বসুন্ধরা গ্রুপের কর্ণধার আহমেদ আকবর সোবহান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর। ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের ধনীরা চীন, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং, আয়ারল্যান্ড, ইসরাইল, পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি হারে ধনী হচ্ছে। রাষ্ট্রের পুরো ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিশেষত কর ব্যবস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত উপার্জন লুট করা হচ্ছে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশ একটি দরিদ্র রাষ্ট্র।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে পশ্চিমাদের তাবেদার শাসকগোষ্ঠী একের পর এক উপনিবেশবাদী কাফেরদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (পুঁজিবাদ) বাস্তবায়ন করছে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর শোষণমূলক নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি দারিদ্রতাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অর্থাৎ তিন বিলিওনের চেয়ে বেশী লোক দরিদ্র অর্থাৎ দৈনিক ২.৫ ডলারেরও কম আয় করে। ১.৩ বিলিওয়নের চেয়েও বেশি লোক অতি দরিদ্র অর্থাৎ ১.২৫ ডলারেরও কম আয় করে। ১ বিলিয়ন শিশু দারিদ্রতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। ইউনিসেফের মতে, প্রতিদিন ২২০০০ শিশু দারিদ্রতার কারণে মারা যাচ্ছে। ৮০৫ মিলিয়ন লোকের খাওয়ার মত যথেষ্ট খাবার নেই। ৭৫০ মিলিয়নের বেশী লোক নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। অপর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি, পয়নিষ্কাশন এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে প্রতিদিন ডায়রিয়াতে ২৩০০ লোক মারা যাচ্ছে। ২০০১ সালে সম্পদের চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে অকুপাই ওয়ার্ল্ড স্ট্রীট আন্দোলন হয়েছিল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়রা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে সম্পদ লুট করছে। একারণে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার আওতায় বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর নিয়ন্ত্রন বাংলাদেশে দারিদ্রতার প্রধান কারণ।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে পরোক্ষ উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদে প্রবেশ করে। নব্য উপনিবেশবাদে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহ প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও একজন দালাল শাসক দ্বারা ঐ দেশের জনগণকে পরোক্ষভাবে শাসন, শোষন করে। সে পুতুল শাসক কাফের উপনিবেশবাদীদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে, আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী শোষণমূলক অর্থনীতিকে ঢেলে সাজায়, উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে দেশের গণমালিকানাধীন সম্পদ (খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ) তুলে দেয়। বিনিময়ে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ঐ দালাল শাসককে ক্ষমতায় টিকে থাকার গ্যারান্টি প্রদান করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লার মালিকানা এ দেশের জনগণের হলেও উপনিবেশবাদী বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর (শেভরণ, ইউনোকল, কনকো ফিলিপস, এশিয়া এনার্জি, গ্যাসপ্রম, নাইকো প্রভৃতি) কাছে বিভিন্ন সরকার মালিকানার সত্ত্ব বিক্রি করে এবং পরবর্তীতে উচ্চ আর্ন্তজাতিক মূল্যে সেগুলো জনগণের কাছে বিক্রি করে। এভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের কাছে চলে যায় এবং জনগণকে দারিদ্রের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ রাখা হয়।
মোদ্দাকথা, উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এবং তাদের ঘৃণিত জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজকে গরীব হয়ে আছে।
অমিত সম্ভাবনার এক দেশ-বাংলাদেশ। একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য সব যোগ্যতাই বাংলাদেশের রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই সমতল ও উর্বর। দীর্ঘদিন যাবত ক্রমহ্রাসমান উর্বর কৃষিজমি ক্রমবর্ধমান জনগনের খাদ্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করে আসছে । এখানকার প্রায় সব লোক এক ভাষাতেই কথা বলার কারণে তথ্য আদান প্রদান এবং ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা খুবই সহজ । বাংলাদেশের গ্যাস, কয়লা, ইউরেনিয়ামের মজুদ জনগণের জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের রোদ, নদী, বিশাল সৈকতের বাতাস থেকেও শক্তি উৎপাদন সম্ভব। আমাদের রয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত-যাও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। আমাদের সামুদ্রিক জল সীমানাও খনিজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ। তিন দিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ের সারি ও দক্ষিণ দিকে থাকা অসভীর সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশকে সামরিকভাবে ‘ডিফেন্ডারস হেভেন’ এ পরিণত করেছে। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও চীনের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের জনগনের বড় একটি অংশ তরুণ-যাদেরকে সহজেই জনসম্পদের পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনগণ পরিশ্রমী, মেধাবী ও সৃজনশীল। খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন, ণির্মাণ শিল্প, বস্ত্রশিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। এতসব আর্শীবাদ থাকা সত্ত্বেও দূরদর্শী আদর্শিক নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশকে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শাসন, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা উপনিবেশবাদী শক্তি দ্বারা আরোপিত। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস ইসলাম থেকে এসেছে কিন্তু জীবন পরিচালনার সব ব্যবস্থা ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন কিছু থেকে এসেছে। সেকারণে বিশ্বাস ও ব্যবস্থার বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশ এগুতে পারছে না। বাংলাদেশকে যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি পরাশক্তিতে পরিণত করতে চাই তাহলে ইসলামি মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থা লাগবে। আর এরকম ব্যবস্থাই হল খিলাফত ব্যবস্থা। একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
✦আরও পড়ুন
✦ প্রবন্ধ ✦শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ
প্রবন্ধ
শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ
ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…
✦ প্রবন্ধ ✦ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম
প্রবন্ধ
ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম
১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…
✦ প্রবন্ধ ✦মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা
প্রবন্ধ
মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা
হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…