বস্তুগত উন্নয়ন কি একমাত্র উন্নয়ন?
৬ মিনিটে পড়ুন৮ জুন ২০২২

Development বা উন্নয়ন বলতে আমরা কি বুঝি? Material Development আর Real Development এর মধ্যে পার্থক্য কি?
মেটারিয়েল ডেভলপমেন্ট নিয়ে আমাদের সমাজে যে ধরনের কথা প্রচলিত আছে বা বর্তমান বিশ্বে নাগরিকদের জীবন যাত্রা উন্নয়নের জন্য যে মাপকাঠি আমরা দেখতে পাই; যে মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে/ স্ট্যান্ডার ধরে আমরা বলে থাকি একটি রাষ্ট্র উন্নত। এসবের মধ্যে রয়েছে জিডিপি, পার ক্যাপিটা ইনকাম, জিএনপি, অ্যানুয়াল গ্রোথ রেট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে নতুন একটি মাইলফলক যোগ হয়েছে সেটি হচ্ছে মেগা প্রজেক্ট বা মেটারিয়েল ডেভলপমেন্ট এর আলোচনা। যা উন্নত বিশ্বেও আমরা দেখতে পাই। মেগা প্রজেক্ট গুলো দুই ভাগে ভাগ করা হয়; এক ধরনের মেগা প্রজেক্ট হলো যোগাযোগ অবকাঠামো; এবং আরেক ধরনের মেগা প্রজেক্ট হলো এনার্জি বা পাওয়ার সেক্টর।
উন্নয়ন নিয়ে মন্ত্রী বুদ্ধিজীবীদের কিছু বক্তব্য শেয়ার করলাম:
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পহেলা বৈশাখে জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেন, ইনফাস্ট্রাকচার এবং ডেভেলপমেন্ট এর দিক থেকে ২০২২-২৩ হবে বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলস্টোন ইয়ার! তিনি তার বক্তব্যে মূলত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প বা সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প ইত্যাদির কথা বুঝিয়েছেন।
কিছুদিন আগে আমাদের তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, গরু মোটা চাল খায়; কুঁড়েঘর কবিতায়! অর্থাৎ তিনি বলেন এখন নাকি রিকশাওয়ালাও মোটা চাল খায় না, মোটা চাল এখন গরুকে খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশে এখন আর কুঁড়ে ঘর নেই, কুঁড়েঘর শুধু কবিতায় আছে। তার ভাষ্যে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ নাকি সরূ/চিকন চাল খায়!
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, রাত পোহালেই আয় বাড়ছে, আমরা অজান্তেই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি!
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা তিন গুণ বেড়েছে!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরেকটি প্রোগ্রামে বলেছেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ নাকি এখন সিঙ্গাপুরের চেয়েও শক্তিশালী।
তথ্যমন্ত্রী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা প্রদানকালে বলেন, আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে লস অ্যাঞ্জেলেস মনে হয়। কুড়িল ফ্লাইওভার দেখলে মনে হয় এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য। তিনি আরো বলেন, হাতিরঝিলে গেলে মনে হয়, প্যারিস শহরের কোনো অংশে এসেছি।
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, উন্নয়নের ধারায় বাংলাদেশ বিশেষ মিরাকল সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব আমাদের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। তারা এত অল্প সময়ে বাংলাদেশের অগ্রগতির রহস্য জানতে চায়। তাছাড়া, গ্রামের মানুষ এখন আর খালি পাইনি খালি পায়ে নেই; দেশের ১৭ কোটি মানুষ মোবাইল ইউজ করে। গ্রামে কেউ যাকাত ফিতরা দিতে গেলে গেলে ধাওয়া খায়!
এসব কথা প্রায়ই তাদের মুখে শুনতে পাওয়া যায়। তারা প্রায়ই বলে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে অর্থাৎ লেস ডেভলপমেন্ট কান্ট্রি থেকে গ্রেজুয়েট করেছে বা উন্নত রাষ্ট্রে পা রেখেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এলডিসি কি? ডেভলপমেন্ট কি? এটা কোথা থেকে এলো? এর সংজ্ঞা কারা নির্ধারিত করল? একটি দেশের উন্নয়নের ক্রাইটিরিয়া কি? জাতিসংঘের ইউ এন,সি,ডি,পি 2019 সালে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে রিকগনাইজ করে। কিসের ভিত্তিতে? তারা বলে যখন একটি দেশের 'গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম' ১২২২ ডলারের অতিক্রম করে তখন সে দেশটি ডেভলপমেন্ট কানট্রিতে পা রাখে! ২০১৯ সালে যখন বাংলাদেশকে তারা রেকগনাইজ করে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তখন বাংলাদেশের গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম ছিল ১৮৮৭ ইউএস ডলার। বর্তমানে সরকার গর্ব করে বলে এখন আমাদের গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম ২৮২৪ ডলারে পৌঁছেছে! এই হচ্ছে তাদের উন্নয়নের প্যারামিটার!!! আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ক্ষুধা, বেকারত্ব, দারিদ্রতা, দুর্নীতি, বঞ্চনা ইত্যাদি উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিবেচ্য বিষয় নয়!
শাসক শ্রেণি প্রায়ই বলে থাকে যে দেশে জিডিপি বা মাথা পিছু আয় বেড়েছে! দ্য ডেইলি স্টারের ফেসবুক পেজে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় (সাময়িক) ৯ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার হচ্ছে, এমন সংবাদের নিচে একজন পাঠক মন্তব্য করেছেন, 'যে আয় মানুষ দেখতে পায় না, অর্থাৎ যে আয় মানুষের মাথার পেছনে থাকে তাকে মাথাপিছু আয় বলে।' বাস্তবতা হচ্ছে পশ্চিমাদের World Bank IMF জাতিসংঘের দেওয়া এসব কাল্পনিক টাইটেল সারাবিশ্বে উন্নয়ের যে মানদণ্ড সেট করেছে তা মূলত ভন্ডামি ছাড়া আর কিছুইনা। তাদেরকে মাপকাঠি হলো জিডিপি (অর্থনীতির সাইজ) যেমন আমেরিকা অর্থনীতির সাইজ 17 ট্রিলিয়ন ডলার; বৃটেনের 2.8 ট্রিলিয়ন ডলার; বাংলাদেশের 463 বিলিয়ন ডলার…
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের 'পার ক্যাপিটা ইনকাম' এর সমীকরণে কোন দেশ গরিব আর কোন দেশ ধনী তা নির্ধারণ করে। তারা বলে পার ক্যাপিটা ইনকাম যাদের বছরে ১০৩৫ ডলার বা ৯৫৩৫৪ টাকার নিচে তারা গরিব দেশ; বাংলাদেশ ১০৩৫ থেকে ৪০৪৩ পৌঁছেছে তাই বাংলাদেশ এখন আর গরিব দেশ নয়! কভিডের পূর্বে জাতিসংঘ বলেছিল সারাবিশ্বে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৮০ কোটি। কিসের ভিত্তিতে? দারিদ্র্য মানুষ মাপার প্যারামিটার হলো; যদি কারো ইনকাম প্রতিদিন ২৫ ডলার অর্থাৎ বাংলা টাকায় ১১০ টাকার নিচে হয় তবে সে দারিদ্র্য সীমার নিচে রয়েছে; মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদি ১১১ টাকা হয় তবে সে আর দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবেন না!
যে দেশের প্রায় ৩২ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার তলানিতে বসবাস করছে; যে দেশে ১০ হাজার লোক প্রতিবছর আত্মহত্যা করে; যেদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৬৬%! যে দেশে চাকরি হারিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াররা ডাকাতি/ছিনতাই এর পথ বেছে নেয়; টিসিবির ট্রাকের পিছনে জুলতে থাকা মধ্যবয়সি নারীদেরকে আমরা দেখতে পাই; আমরা দেখেছি সাঁতার শিখতে, খিচুড়ি রান্না শিখতে পরিবারের সব সদস্যসহ মন্ত্রী, আমলাদের সরকারি সফর; যে দেশের মানুষ দুই বেলা খাবারের বিনিময় পড়াতে চায়; যে দেশের মানুষ সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সন্তানকে বিক্রি করে দেয়। যখন দুবেলা ভাতের জন্য রাস্তার পাশে স্বল্প ও মধ্যবয়সী মেয়েদের দেহ বিক্রির ঘটনা আমরা দেখতে পাই তখন লজ্জায় এসব উন্নয়নের গর্ব চূর্ণ বিচুর্ণ হয়ে যায়। ২০১৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী যে দেশে ১,৪০,০০০ মেয়ে দেহ ব্যবসা করে পেট চালায়; সে দেশ কে কি করে আমরা উন্নত বলতে পারি??? সে দেশ কি করে পদ্মা সেতু নিয়ে বড় বড় কথা বলে???
আপনারা হয়তো জানেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৭ লক্ষ মামলা পেন্ডিং রয়েছে; অথচ যারা বছরের পর বছর বিনা বিচারে জালিমের কারাগারে বন্দি আছে। ৫ মার্চ ২০২২ ডেইলি স্টার একটা প্রতিবেদন করেন যেখানে বলা হয় world most polluted city হচ্ছে ঢাকা। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ (ইউএনএইচআরসি) এর রিপোর্ট অনুযায়ী চলতি বছর ৪০২ জন গুম হয়েছে। যদিও আমাদের প্রধানমন্ত্রী জবাবে বলেন, আমেরিকা, ইংল্যান্ডেও গুম হয়! মনে হচ্ছে আমেরিকা, ইংল্যান্ডেও যেহেতু গুম হয় তো আমাদের দেশে ও হতে পারে, তেমন বড় বিষয় না!!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অর্থনীতিবীদ আবুল বারাকাত বলেন, বিগত ৪৬ বছরে (১৯৭২-২০১৯) দেশ থেকে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। যদিও আমাদের দেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী একবার বলেছিলেন ৩ হাজার কোটি বা ৪ হাজার কোটি টাকা নাকি কোন ব্যাপার না! যারা উন্নয়নের চশমায় বাংলাদেশ কে দেখছেন লাল নীল হলুদ বেগুনি; তাদের চোখে নিশ্চয়ই পরেনা শত শত ধর্ষিত বোনের আর্তনাদ; ক্ষুধার তাড়নায় সন্তানকে বিক্রি করা বাবার বুক ফাটা চিতকার!
পুঁজিবাদী সমাজে নারীর সম্মান, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক প্রশান্তির অনেক অভাব যদিও তারা বস্তুগত অনেক উন্নয়ন করছে। সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে (রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা) আকিদা হিসেবে নেবার কারণে তারা শুধু বস্তুগত উন্নয়ন করার চেষ্টা করছে কিন্তু নারীর সম্মান, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ কোনো প্রকার গুরুত্ব পাচ্ছে না। আয় বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য আজকের পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অন্যদিকে ইসলাম একিদিকে যেমন নারীর সম্মান, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয় পাশাপাশি বস্তুগত উন্নয়ন কে এগিয়ে নিয়ে যায়। ইসলাম মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ সবক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রশান্তি আনার চেষ্টা করে। ইসলাম প্রতিটি মানুষকে নিয়ে চিন্তা করে এবং দেশের একজন মানুষের সমস্যা হলে ইসলাম তা সমাধান করার চেষ্টা করে।
মেটারিয়েল ডেভলপমেন্ট নিয়ে আমাদের সমাজে যে ধরনের কথা প্রচলিত আছে বা বর্তমান বিশ্বে নাগরিকদের জীবন যাত্রা উন্নয়নের জন্য যে মাপকাঠি আমরা দেখতে পাই; যে মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে/ স্ট্যান্ডার ধরে আমরা বলে থাকি একটি রাষ্ট্র উন্নত। এসবের মধ্যে রয়েছে জিডিপি, পার ক্যাপিটা ইনকাম, জিএনপি, অ্যানুয়াল গ্রোথ রেট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে নতুন একটি মাইলফলক যোগ হয়েছে সেটি হচ্ছে মেগা প্রজেক্ট বা মেটারিয়েল ডেভলপমেন্ট এর আলোচনা। যা উন্নত বিশ্বেও আমরা দেখতে পাই। মেগা প্রজেক্ট গুলো দুই ভাগে ভাগ করা হয়; এক ধরনের মেগা প্রজেক্ট হলো যোগাযোগ অবকাঠামো; এবং আরেক ধরনের মেগা প্রজেক্ট হলো এনার্জি বা পাওয়ার সেক্টর।
উন্নয়ন নিয়ে মন্ত্রী বুদ্ধিজীবীদের কিছু বক্তব্য শেয়ার করলাম:
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পহেলা বৈশাখে জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেন, ইনফাস্ট্রাকচার এবং ডেভেলপমেন্ট এর দিক থেকে ২০২২-২৩ হবে বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলস্টোন ইয়ার! তিনি তার বক্তব্যে মূলত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প বা সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প ইত্যাদির কথা বুঝিয়েছেন।
কিছুদিন আগে আমাদের তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, গরু মোটা চাল খায়; কুঁড়েঘর কবিতায়! অর্থাৎ তিনি বলেন এখন নাকি রিকশাওয়ালাও মোটা চাল খায় না, মোটা চাল এখন গরুকে খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশে এখন আর কুঁড়ে ঘর নেই, কুঁড়েঘর শুধু কবিতায় আছে। তার ভাষ্যে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ নাকি সরূ/চিকন চাল খায়!
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, রাত পোহালেই আয় বাড়ছে, আমরা অজান্তেই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি!
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা তিন গুণ বেড়েছে!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরেকটি প্রোগ্রামে বলেছেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ নাকি এখন সিঙ্গাপুরের চেয়েও শক্তিশালী।
তথ্যমন্ত্রী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা প্রদানকালে বলেন, আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে লস অ্যাঞ্জেলেস মনে হয়। কুড়িল ফ্লাইওভার দেখলে মনে হয় এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য। তিনি আরো বলেন, হাতিরঝিলে গেলে মনে হয়, প্যারিস শহরের কোনো অংশে এসেছি।
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, উন্নয়নের ধারায় বাংলাদেশ বিশেষ মিরাকল সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব আমাদের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। তারা এত অল্প সময়ে বাংলাদেশের অগ্রগতির রহস্য জানতে চায়। তাছাড়া, গ্রামের মানুষ এখন আর খালি পাইনি খালি পায়ে নেই; দেশের ১৭ কোটি মানুষ মোবাইল ইউজ করে। গ্রামে কেউ যাকাত ফিতরা দিতে গেলে গেলে ধাওয়া খায়!
এসব কথা প্রায়ই তাদের মুখে শুনতে পাওয়া যায়। তারা প্রায়ই বলে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে অর্থাৎ লেস ডেভলপমেন্ট কান্ট্রি থেকে গ্রেজুয়েট করেছে বা উন্নত রাষ্ট্রে পা রেখেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এলডিসি কি? ডেভলপমেন্ট কি? এটা কোথা থেকে এলো? এর সংজ্ঞা কারা নির্ধারিত করল? একটি দেশের উন্নয়নের ক্রাইটিরিয়া কি? জাতিসংঘের ইউ এন,সি,ডি,পি 2019 সালে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে রিকগনাইজ করে। কিসের ভিত্তিতে? তারা বলে যখন একটি দেশের 'গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম' ১২২২ ডলারের অতিক্রম করে তখন সে দেশটি ডেভলপমেন্ট কানট্রিতে পা রাখে! ২০১৯ সালে যখন বাংলাদেশকে তারা রেকগনাইজ করে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তখন বাংলাদেশের গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম ছিল ১৮৮৭ ইউএস ডলার। বর্তমানে সরকার গর্ব করে বলে এখন আমাদের গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম ২৮২৪ ডলারে পৌঁছেছে! এই হচ্ছে তাদের উন্নয়নের প্যারামিটার!!! আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ক্ষুধা, বেকারত্ব, দারিদ্রতা, দুর্নীতি, বঞ্চনা ইত্যাদি উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিবেচ্য বিষয় নয়!
শাসক শ্রেণি প্রায়ই বলে থাকে যে দেশে জিডিপি বা মাথা পিছু আয় বেড়েছে! দ্য ডেইলি স্টারের ফেসবুক পেজে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় (সাময়িক) ৯ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার হচ্ছে, এমন সংবাদের নিচে একজন পাঠক মন্তব্য করেছেন, 'যে আয় মানুষ দেখতে পায় না, অর্থাৎ যে আয় মানুষের মাথার পেছনে থাকে তাকে মাথাপিছু আয় বলে।' বাস্তবতা হচ্ছে পশ্চিমাদের World Bank IMF জাতিসংঘের দেওয়া এসব কাল্পনিক টাইটেল সারাবিশ্বে উন্নয়ের যে মানদণ্ড সেট করেছে তা মূলত ভন্ডামি ছাড়া আর কিছুইনা। তাদেরকে মাপকাঠি হলো জিডিপি (অর্থনীতির সাইজ) যেমন আমেরিকা অর্থনীতির সাইজ 17 ট্রিলিয়ন ডলার; বৃটেনের 2.8 ট্রিলিয়ন ডলার; বাংলাদেশের 463 বিলিয়ন ডলার…
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের 'পার ক্যাপিটা ইনকাম' এর সমীকরণে কোন দেশ গরিব আর কোন দেশ ধনী তা নির্ধারণ করে। তারা বলে পার ক্যাপিটা ইনকাম যাদের বছরে ১০৩৫ ডলার বা ৯৫৩৫৪ টাকার নিচে তারা গরিব দেশ; বাংলাদেশ ১০৩৫ থেকে ৪০৪৩ পৌঁছেছে তাই বাংলাদেশ এখন আর গরিব দেশ নয়! কভিডের পূর্বে জাতিসংঘ বলেছিল সারাবিশ্বে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৮০ কোটি। কিসের ভিত্তিতে? দারিদ্র্য মানুষ মাপার প্যারামিটার হলো; যদি কারো ইনকাম প্রতিদিন ২৫ ডলার অর্থাৎ বাংলা টাকায় ১১০ টাকার নিচে হয় তবে সে দারিদ্র্য সীমার নিচে রয়েছে; মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদি ১১১ টাকা হয় তবে সে আর দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবেন না!
যে দেশের প্রায় ৩২ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার তলানিতে বসবাস করছে; যে দেশে ১০ হাজার লোক প্রতিবছর আত্মহত্যা করে; যেদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৬৬%! যে দেশে চাকরি হারিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াররা ডাকাতি/ছিনতাই এর পথ বেছে নেয়; টিসিবির ট্রাকের পিছনে জুলতে থাকা মধ্যবয়সি নারীদেরকে আমরা দেখতে পাই; আমরা দেখেছি সাঁতার শিখতে, খিচুড়ি রান্না শিখতে পরিবারের সব সদস্যসহ মন্ত্রী, আমলাদের সরকারি সফর; যে দেশের মানুষ দুই বেলা খাবারের বিনিময় পড়াতে চায়; যে দেশের মানুষ সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সন্তানকে বিক্রি করে দেয়। যখন দুবেলা ভাতের জন্য রাস্তার পাশে স্বল্প ও মধ্যবয়সী মেয়েদের দেহ বিক্রির ঘটনা আমরা দেখতে পাই তখন লজ্জায় এসব উন্নয়নের গর্ব চূর্ণ বিচুর্ণ হয়ে যায়। ২০১৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী যে দেশে ১,৪০,০০০ মেয়ে দেহ ব্যবসা করে পেট চালায়; সে দেশ কে কি করে আমরা উন্নত বলতে পারি??? সে দেশ কি করে পদ্মা সেতু নিয়ে বড় বড় কথা বলে???
আপনারা হয়তো জানেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৭ লক্ষ মামলা পেন্ডিং রয়েছে; অথচ যারা বছরের পর বছর বিনা বিচারে জালিমের কারাগারে বন্দি আছে। ৫ মার্চ ২০২২ ডেইলি স্টার একটা প্রতিবেদন করেন যেখানে বলা হয় world most polluted city হচ্ছে ঢাকা। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ (ইউএনএইচআরসি) এর রিপোর্ট অনুযায়ী চলতি বছর ৪০২ জন গুম হয়েছে। যদিও আমাদের প্রধানমন্ত্রী জবাবে বলেন, আমেরিকা, ইংল্যান্ডেও গুম হয়! মনে হচ্ছে আমেরিকা, ইংল্যান্ডেও যেহেতু গুম হয় তো আমাদের দেশে ও হতে পারে, তেমন বড় বিষয় না!!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অর্থনীতিবীদ আবুল বারাকাত বলেন, বিগত ৪৬ বছরে (১৯৭২-২০১৯) দেশ থেকে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। যদিও আমাদের দেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী একবার বলেছিলেন ৩ হাজার কোটি বা ৪ হাজার কোটি টাকা নাকি কোন ব্যাপার না! যারা উন্নয়নের চশমায় বাংলাদেশ কে দেখছেন লাল নীল হলুদ বেগুনি; তাদের চোখে নিশ্চয়ই পরেনা শত শত ধর্ষিত বোনের আর্তনাদ; ক্ষুধার তাড়নায় সন্তানকে বিক্রি করা বাবার বুক ফাটা চিতকার!
পুঁজিবাদী সমাজে নারীর সম্মান, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক প্রশান্তির অনেক অভাব যদিও তারা বস্তুগত অনেক উন্নয়ন করছে। সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে (রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা) আকিদা হিসেবে নেবার কারণে তারা শুধু বস্তুগত উন্নয়ন করার চেষ্টা করছে কিন্তু নারীর সম্মান, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ কোনো প্রকার গুরুত্ব পাচ্ছে না। আয় বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য আজকের পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অন্যদিকে ইসলাম একিদিকে যেমন নারীর সম্মান, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয় পাশাপাশি বস্তুগত উন্নয়ন কে এগিয়ে নিয়ে যায়। ইসলাম মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ সবক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রশান্তি আনার চেষ্টা করে। ইসলাম প্রতিটি মানুষকে নিয়ে চিন্তা করে এবং দেশের একজন মানুষের সমস্যা হলে ইসলাম তা সমাধান করার চেষ্টা করে।
✦আরও পড়ুন
✦ প্রবন্ধ ✦শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ
প্রবন্ধ
শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ
ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…
✦ প্রবন্ধ ✦ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম
প্রবন্ধ
ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম
১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…
✦ প্রবন্ধ ✦মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা
প্রবন্ধ
মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা
হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…