মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
হাদীসের গল্প

সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী বান্দার সাথে আল্লাহর কথোপকথন

৭ মিনিটে পড়ুন১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী বান্দার সাথে আল্লাহর কথোপকথন
মুমিন তার পাপের কারণে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে। কিন্তু তার ঈমানের কারণে এক সময় সে জান্নাতে যাবে। জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার মধ্যে যে কথোপকথন হবে, সে সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিতঃ

কয়েকজন সাহাবা রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কিয়ামাত দিবসে আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো?

রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের মাঝে কষ্ট হয়? সাহাবাগণ বললেন, না। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের কষ্টবোধ হয়? তাঁরা বললেন, না। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তদ্রূপ তোমরা তাঁকেও দেখবে।

কিয়ামত দিবসে আল্লাহ সকল মানুষকে জমায়েত করে বলবেন, পৃথিবীতে তোমাদের যে যার ইবাদাত করেছিলে আজ তাকেই অনুসরণ কর। তখন যারা সূর্যের উপাসনা করতো, তারা সূর্যের সাথে থাকবে। যারা চন্দ্রের উপাসনা করতো, তারা চন্দ্রের সাথে থাকবে। আর যারা আল্লাহদ্রোহীদের (তাগুতের) উপাসনা করতো, তারা আল্লাহদ্রোহীদের সাথে জমায়েত হয়ে যাবে। কেবল এ উম্মাত অবশিষ্ট থাকবে। তন্মধ্যে মুনাফিকরাও থাকবে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট এমন আকৃতিতে উপস্থিত হবেন যা তারা চিনে না। তারপর (আল্লাহ তা’আলা) বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক (সুতরাং তোমরা আমার পিছনে চল)। তারা বলবে, না’ঊযুবিল্লাহ। আমরা তোমার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমাদের প্রতিপালক না আসা পর্যন্ত আমরা এ স্থানেই থেকে যাব। আর তিনি যখন আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারবো।

এরপর আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট তাদের পরিচিত আকৃতিতে আসবেন, বলবেনঃ আমি তোমাদের প্রভু। তারা বলবে, হ্যাঁ, আপনি আমাদের প্রভু। এ বলে তারা তাঁকে অনুসরণ করবে।

এমন সময়ে জাহান্নামের উপর দিয়ে পুলছিরাত (সাঁকো) স্থাপন করা হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আর আমি ও আমার উম্মাতই হব প্রথম এ পথ অতিক্রমকারী। সেদিন রসূলগণ ব্যতীত অন্য কেউ মুখ খোলারও সাহস করবে না। আর রসূলগণও কেবল এ দু’আ করবেন, সাল্লিম সাল্লিম, হে আল্লাহ! নিরাপত্তা দাও, হে আল্লাহ! নিরাপত্তা দাও।

আর জাহান্নামে থাকবে সা’দান বৃক্ষের কাঁটার মত অনেক কাঁটাযুক্ত লৌহদণ্ড। তোমরা সা’দান বৃক্ষটি দেখেছ কি? সহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তা সা’দান বৃক্ষের কাঁটার মতই, তবে সেটা যে কত বিরাট তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। পাপ কাজের জন্য কাঁটার আংটাগুলো মানুষকে তার আমল অনুপাতে ছোবল দিতে থাকবে। সুতরাং কিছু লোক নিজ আমলের কারণে ধ্বংস হবে এবং কিছু লোক টুকরা টুকরা হয়ে যাবে, পরে আবার নাজাত পাবে।

অবশেষে যখন আল্লাহ বিচার শেষ করবেন, স্বীয় রহমতে কিছু সংখ্যক জাহান্নামীদের (জাহান্নাম হতে) মুক্তি দেয়ার ইচ্ছা করবেন। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের আদেশ করবেন যে, যারা কালিমায় বিশ্বাসী ও শির্ক করেনি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসো।

অতঃপর ফেরেশতাগণ ঐ সমস্ত লোকদের কপালে সিজদার চিহ্ন দেখে চিনতে পারবেন এবং জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। কারণ, অগ্নি মানুষের দেহের সবকিছু জ্বালিয়ে ফেললেও সাজদার স্থান অক্ষত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা সিজদা চিহ্নিত স্থানসমূহ আগুনের জন্য জ্বালানো হারাম (নিষিদ্ধ) করে দিয়েছেন। ফলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি মানুষের সিজদার স্থান ব্যতীত জাহান্নামের আগুন গোটা দেহটি জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিবে। মোটকথা, ফেরেশতাগণ এদেরকে জাহান্নাম থেকে এমন অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় বের করে আনবে যে, তারা একেবারে কয়লা হয়ে যাবে।

তাদের উপর ‘মাউল-হায়াত’ (হায়াত দান করা পানি / সঞ্জীবনী পানি) ঢেলে দেয়া হবে। তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে যেমনভাবে শস্য অঙ্কুর পানিসিক্ত উর্বর জমিতে সতেজ হয়ে উঠে। তারপর আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের বিচার সমাপ্ত করবেন।

শেষে এক ব্যক্তি থেকে যাবে। তার মুখমণ্ডল হবে জাহান্নামের দিকে। এই হবে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী। সে বলবে, হে আমার প্রভু! (অনুগ্রহ করে) আমার মুখটি জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দিন। কারণ জাহান্নামের দুর্গন্ধ আমাকে অসহনীয় কষ্ট দিচ্ছে; এর লেলিহান অগ্নিশিখা আমাকে দগ্ধ করে দিচ্ছে। আল্লাহ যতদিন চান ততদিন পর্যন্ত সে তাঁর নিকট দু’আ করতে থাকবে।

তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি যা চাচ্ছ তা দিলে আর অন্য কিছু চাইবে কি? তখন সে বলবে, আপনার সম্মানের কসম করে বলছি, আমি আর কিছুই চাইব না। আর সে আল্লাহর ইচ্ছাতেই এ প্রতিশ্রুতি প্রদান করবে। তখন আল্লাহ তার মুখকে জাহান্নামের দিক হ’তে ঘুরিয়ে দিবেন। সে জান্নাতের দিকে মুখ করবে এবং তার চাকচিক্য ও শ্যামল দৃশ্য দেখতে পাবে, তখন আল্লাহ যতক্ষণ চুপ রাখতে চাইবেন ততক্ষণ চুপ থাকবে।

পরে আবার বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেবল জান্নাতের দরজা পর্যন্ত আমাকে পৌঁছে দিন। আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি না অঙ্গীকার দিয়েছিলে যে, আমি তোমাকে যা দিয়েছি তা ছাড়া আর কিছু চাইবে না। হে আদম সন্তান! তুমি হতভাগা ও তুমি সাংঘাতিক ওয়া’দা ভঙ্গকারী।

তখন সে বলবে, হে আমার রব! এই বলে আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকবে। আল্লাহ বলবেন, তুমি যা চাও তা যদি দিয়ে দেই তবে আর কিছু চাইবে না তো? সে বলবে, আপনার ইজ্জতের কসম! আর কিছু চাইব না। সে আল্লাহর ইচ্ছাতেই এ প্রতিশ্রুতি প্রদান করবে। তারপর তাকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া হবে। এবার যখন সে জান্নাতের দরজায় দাঁড়াবে, তখন জান্নাত তার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সে জান্নাতের সমৃদ্ধি ও সুখ দেখতে থাকবে। সেখানে আল্লাহ যতক্ষণ চান সে ততক্ষণ চুপ করে থাকবে।

পরে বলবে, হে আমার রব! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, তুমি না সকল ধরণের ওয়া’দা ও অঙ্গীকার করে বলেছিলে, আমি যা দান করেছি এর চাইতে বেশি আর কিছু চাইবে না? হে হতভাগা আদম সন্তান! তুমি তো ভীষণ ওয়াদা ভঙ্গকারী। সে বলবে, হে আমার রব! আমি যেন আপনার সৃষ্টির সবচেয়ে দুর্ভাগা না হই। সে বার বার দু’আ করতে থাকবে। পরিশেষে তার অবস্থা দেখে আল্লাহ তা’আলা হেসে ফেলবেন। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর।

(জান্নাতে প্রবেশের পর) আল্লাহ তাকে বলবেন, (যা চাওয়ার) চাও। তখন সে তার সকল আকাংখা (কামনা) চেয়ে শেষ করবে। এরপর আল্লাহ নিজেই স্মরন করিয়ে দিয়ে বলবেন, অমুক অমুকটা চাও। এভাবে তার সেসব আকাংখাও (কামনাও) শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ বলবেন, তোমাকে এ সব এবং এর সমপরিমাণ আরো দেয়া হলো। আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে- আল্লাহ বলবেন, যাও তোমাকে এ সমস্ত কিছু তো দিলাম, এর সঙ্গে আরও দশগুণ পরিমাণ দিলাম।

(সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, হাদিস নাম্বার – ৩৪০)

[বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ) সম্পূর্ণ হাদীছটি আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে আবূ হুরায়রা (রাঃ) ‘আল্লাহর পায়ের নলা প্রকাশ করবেন’ এ কথাটি উল্লেখ করেননি।

‘আতা ইবনু ইয়াযীদ বলেন, আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) এ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত এ হাদীসের কোন কথাই রদ করেননি। তবে আবূ হুরায়রা (রাঃ) যখন এ কথা উল্লেখ করলেন, “আল্লাহ তা’আলা ঐ ব্যক্তিকে বলবেন, তোমাকে এ সব এবং এর সমপরিমাণ আরো দেয়া হলো” তখন আবূ সা’ঈদ (রাঃ) বললেনঃ হে আবূ হুরায়রা! বরং তা সহ আরো দশগুণ দেয়া হবে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বললেন, আমি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে “এর সম-পরিমাণ” এ শব্দ স্মরণ রেখেছি। আবূ সা’ঈদ (রাঃ) বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে “আরো দশগুণ” এ শব্দ সংরক্ষিত রেখেছি।
রাবী বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) পরিশেষে বলেন, এ ব্যক্তি হবে জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারী। (ই.ফা. ৩৪৮; ই.সে. ৩৫৯)]

শিক্ষাঃ
১. আল্লাহর প্রতি যথার্থ ঈমান আনয়নকারী ব্যক্তি তার পাপের কারণে জাহান্নামে গেলেও কোন এক সময় আল্লাহ স্বীয় রহমতে মুমিন ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

২. ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন জীবন ব্যবস্থাকে জীবন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা যাবেনা চাই সে হোক গণতন্ত্র (পুঁজিবাদ) অথবা সমাজতন্ত্র। আল্লাহ বলেন, “নিঃসন্দেহে (মানুষের) জীবনের বিধান হিসেবে আল্লাহর তায়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র (গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থা (সূরা আলে ইমরান - ১৯)।"

৩. রাষ্ট্র আল্লাহ প্রদত্ত কোন হারাম বিষয়কে হালাল বা রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা বৈধ বলে ঘোষনা করলেই উক্ত বিষয় হালাল বা বৈধ বলে মান্য করা যাবেনা। যেমন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বীমা ব্যবস্থা, লাইসেন্স প্রাপ্ত মদের বার থেকে মদ খাওয়া, পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের নামে অমুসলিমদের উৎসব উৎযাপন করা, কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে কেউ কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্যতা ধারণ করলো, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত (সূনান আবু দাউদ - ৪/৪৪) ইত্যাদি।

৪. রাষ্ট্র আল্লাহ প্রদত্ত কোন হালাল বিষয়কে হারাম বা রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা অবৈধ বলে ঘোষনা করলেই উক্ত বিষয় হারাম বা অবৈধ বলে মান্য করা যাবেনা।

৫. "লা ইলাহা ইল্লালাহ" এর শর্তানুযায়ী জীবনের সর্বক্ষেত্রে সকল সিদ্ধান্তে আল্লাহ তায়ালার আদেশকে প্রাধান্য দিতে হবে।

আমাদের উচিত আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠভাবে ঈমান আনয়ন করা এবং যথাসাধ্য আমলে ছালেহ করা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
সততা ও আমানতের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত {স্বর্ণ ভর্তি একটি কলসির (Jar) কোন দাবীদার খুঁজে পাওয়া গেলো না}
হাদীসের গল্প

সততা ও আমানতের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত {স্বর্ণ ভর্তি একটি কলসির (Jar) কোন দাবীদার খুঁজে পাওয়া গেলো না}

সততা ও আমানতের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত {স্বর্ণ ভর্তি একটি কলসির (Jar) কোন দাবীদার খুঁজে পাওয়া গেলো না} লোভ মানব চরিত্রের অত্যন্ত নিন্দনীয় অভ্যাস। এটি…

তাহলে সে নামায শেষ করার পর সদ্যজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়
হাদীসের গল্প

তাহলে সে নামায শেষ করার পর সদ্যজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়

হযরত আমর ইবনে আবাসা (রাঃ) বলেন, জাহেলী যুগে আমি যখন মানুষকে মূর্তিপূজা করতে দেখতাম আমার কাছে মনে হত, নিশ্চয়ই এরা পথভ্রষ্ট। এদের এ সকল কাজ সম্পূর্ণ…

হযরত হাতেব ইবনে আবী বালতায়া (রাঃ) ও সারা নান্মী গায়িকার ঘটনা
হাদীসের গল্প

হযরত হাতেব ইবনে আবী বালতায়া (রাঃ) ও সারা নান্মী গায়িকার ঘটনা

বদর যুদ্ধের পর মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কার সারা নান্মী একজন গায়িকা প্রথমে মদীনায় আগমন করে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা…