মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
শিক্ষামূলক গল্প

বারসিসার কাহিনী – যেভাবে শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয়

১২ মিনিটে পড়ুন ১ বার দেখা হয়েছে১৬ মার্চ ২০২৩
বারসিসার কাহিনী – যেভাবে শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয়
এটি জুরায়জের ঘটনার বিপরীত। জুরায়জ ছিলেন পুতঃপবিত্র আর বারসীসা ছিল পথ-ভ্রষ্ট। আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ

كَمَثَلِ ٱلشَّيْطَٰنِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَٰنِ ٱكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّى بَرِىٓءٌ مِّنكَ إِنِّىٓ أَخَافُ ٱللَّهَ رَبَّ ٱلْعَٰلَمِينَ - فَكَانَ عَٰقِبَتَهُمَآ أَنَّهُمَا فِى ٱلنَّارِ خَٰلِدَيْنِ فِيهَا وَذَٰلِكَ جَزَٰٓؤُا۟ ٱلظَّٰلِمِينَ-

“এরা শয়তানের মত, সে মানুষকে বলে, "কুফরী কর", অতঃপর যখন সে কুফরী করে তখন সে বলে, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। ফলে উভয়ের পরিণাম হবে জাহান্নাম। সেথায় তারা স্থায়ী হবে। আর এটাই জালিমদের কর্মফল”। [সূরা আল-হাশর ৫৯ : ১৬-১৭]

এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে ইবন জারীর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) সূত্রে বলেন, একজন মহিলা বকরী চরাত। তার ছিল চার ভাই। রাতের বেলা সে ধর্মযাজকের উপাসনালয়ে এসে আশ্রয় নিত।

একদিন যাজক এসে তার সাথে কুকর্ম করে। তাতে সে অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়ে। শয়তান এসে প্ররোচণা দিয়ে বলে, মহিলাকে খুন করে মাটি চাপা দিয়ে দাও। লোকে তো তোমাকে বিশ্বাস করে। তারা তোমার কথা শুনবে। শয়তানের প্ররোচণায় সে মহিলাটিকে খুন করে এবং মাটি চাপা দিয়ে দেয়। এবার শয়তান স্বপ্নে মহিলার ভাইদের নিকট উপস্থিত হয়। তাদেরকে বলে যে, উপাসনালয়ের যাজক তোমাদের বোনের সাথে কুকর্ম করেছে এবং সে অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়ায় তাকে খুন করে অমুক স্থানে মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছে। সকাল হলে ভাইদের একজন বললো, আল্লাহর কসম! গত রাতে আমি এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখি, সেটি তোমাদেরকে বলব কি বলব না তা স্থির করতে পারছি না।

অন্যরা বলল, তুমি বরং ঐ স্বপ্নের কথা আমাদেরকে বল। সে তা বর্ণনা করলো। অন্যজন বললো, আল্লাহর কসম, আমিও স্বপ্নে তাই দেখেছি। তৃতীয়জন বললো, আমিও তাই দেখেছি। তখন তারা বলাবলি করে যে, নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন রহস্য আছে। তারা সবাই তাদের শাসনকর্তাকে যাজকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তারপর সবাই যাজকের নিকট যায় এবং তাকে উপাসনালয় থেকে নামিয়ে আনে। এ সময়ে শয়তান যাজকের নিকট উপস্থিত হয়ে বলে, আমিই তোমাকে এ বিপদে ফেলেছি। আমি ছাড়া কেউ তোমাকে এখান থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। সুতরাং তুমি আমাকে একটি সিজদা কর; আমি তোমাকে যে বিপদে ফেলেছি তা থেকে উদ্ধার করব। সে মতে সে তাকে সিজদা করল। তারপর শাস্তি বিধানের জন্যে যখন শাসনকর্তার নিকট তাকে নিয়ে গেল তখন শয়তান সেখান থেকে কেটে পড়ে আর তাকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ইবন আব্বাস (রাঃ) সূত্রেও অনুরুপ বর্ণিত হয়েছে।

আমিরুল মুমিনীন আলী ইবন আবী তালিব (রাঃ) থেকে অন্য এক সনদে এ ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ইবন জারীর আবদুল্লাহ ইবন নাহীহকে উদ্ধৃত করে বলেন, আমি আলী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলছিলেন, এক ধর্মযাজক দীর্ঘ ষাট বছর ধরে ইবাদাত করেছিল। শয়তান তাকে জব্দ করতে ফন্দি আঁটে। অত:পর সে এক মহিলার ওপর আছর করে। সে মহিলার কয়েকটি ভাই ছিল। ভাইদেরকে সে বলল, ওকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাজকের কাছে নিয়ে যাও। ভাইয়েরা মহিলাটিকে যাজকের নিকট নিয়ে যায়। তার চিকিৎসা করল। মহিলাটি কয়েকদিন তার ওখানে ছিল। একদিনের কথা। মহিলার প্রতি আসক্ত হয়ে সে তার সাথে কুকর্মে লিপ্ত হয়। সে তাতে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। অবশেষে যাজকটি তাকে হত্যা করে। তার ভাইয়েরা বোনের খোঁজে যাজকের নিকট আসে। এ দিকে শয়তানও তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলে, এক সময় তুমি আমাকে ব্যর্থ করে দিয়েছিলে। এখন আমিই তোমাকে দিয়ে এসব কান্ড ঘটিয়েছি। অতএব এখন তুমি আমার আনুগত্য কর। আমি তোমাকে উদ্ধার করব। তুমি আমাকে একটি সিজদা কর। যাজকটি তাকে সিজদা করল। তখন শয়তান বলল, এখন তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ

كَمَثَلِ ٱلشَّيْطَٰنِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَٰنِ ٱكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّى بَرِىٓءٌ مِّنكَ إِنِّىٓ أَخَافُ ٱللَّهَ رَبَّ ٱلْعَٰلَمِينَ -

"এরা শয়তানের মত, সে মানুষকে বলে, "কুফরী কর"। অতঃপর যখন সে কুফরী করে, তখন সে বলে, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি"। [সূরা আল-হাশর ৫৯ : ১৬]

রেফারেন্সঃ

আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
(ইসলামের ইতিহাসঃ আদি-অন্ত)
বঙ্গানুবাদ দ্বিতীয় খণ্ড (পৃষ্ঠা নাম্বারঃ ২৬৮-২৬৯)
লেখকঃ হাফিজ আল্লামা ইমাম্মুদিন ইবন কাসীর আদ-দামেশকী (রহঃ)

আরেকটি বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে পাওয়া যায়ঃ

বনী ইসরাইলের সময় এক ছোট্ট গ্রামে বারসিসা নামে অত্যন্ত ধার্মিক এক ব্যক্তি ছিল। সে ছিল বনী ইসরাইলের একজন সুখ্যাত উপাসক, ধর্মযাজক ও আবিদ বান্দা। সে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করত এবং বিশ্বাস করত যে, ঈসা আলাহিসসালাম আল্লাহর একজন রাসূল। তার নিজের একটি উপাসনালয় ছিল এবং সেখানে সে নিজেকে একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর উপাসনায় নিয়োজিত রাখত।

সেই গ্রামে তিন ভাই ও এক বোন থাকতো । সেই ভাইদের জিহাদের জন্য ডাকা হল । কিন্তু তারা বোনকে একা রেখে যেতে চাইল না। কার কাছে রাখবে চিন্তা করতে লাগলো। গ্রামবাসি বারসিসার কথা বলল। কারণ গ্রামের সবাই বারসিসাকে উত্তম চরিত্রবান হিসাবে জানতো । তারা বারসিসার কাছে গেল। যখন তার কাছে তাদের বোনকে রাখতে চাইলো, সে রাজি হল না এবং বলল ‘আমি অভিশপ্ত শয়তানের কাছ থেকে পানাহ চাই।’

কারণ সে ভয় করছিল যে, সে গুনাহে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় শয়তান বারসিসার মনে কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) দিতে আসল। চালাক শয়তান জানতো যে বারসিসার মন খুবই নরম। সে কানে কানে বারসিসাকে বলল – “তারা যদি ভাল কাউকে তাদের বোনের জন্য খুঁজে না পায় এবং খারাপ কারো কাছে মেয়েটিকে রেখে যায় তখন কি হবে ! এই পরিণতি কি তোমার ভুলের জন্য নয়?”

বারসিসা বুঝতে পারেনি যে এটা শয়তানের কুমন্ত্রণা। মানুষের প্রতি দরদের কারণে মেয়েটিকে সে সাহায্য করতে রাজি হল।

সে মেয়েটিকে গির্জার বিপরীতে একটি ঘরে থাকতে দিল। গির্জার সামনে মেয়েটির জন্য খাবার রেখে আসত। মেয়েটি নিজে এসে খাবার নিয়ে যেত। বারসিসার সাথে তার দেখা হত না।

শয়তান বারসিসার কাছে আবার আসল এবং বলল, “তুমি কেন মেয়েটির খাবার তার ঘরের সামনে রেখে আসো না? এর ফলে মেয়েটাকে ঘর থেকে কেউ এতটা পথ একা একা হেঁটে বের হতে বা ফিরে যেতে দেখবে না!”

বারসিসা রাজি হল এবং মেয়েটির ঘরের সামনে খাবার রেখে আসতে শুরু করল। শয়তান এতেও খুশি হল না। সে আবার আসলো এবং কানে কানে বলল – ‘কেন তুমি তার ঘরের ভিতরে খাবার দিয়ে আসো না? ফলে মানুষ তাকে ঘর থেকে একা একা বের হতে আর ঢুকতে দেখত না!’ এবার বারসিসা তার ঘরের মধ্যে খাবার দিয়ে আসতে শুরু করল। শয়তান আবার আসলো এবং বলল – ‘মেয়েটার সাথে তোমার কথা বলা উচিত, এভাবে একা থাকলে তো সে পাগল হয়ে যাবে’। বারসিসা মেয়েটির কথা চিন্তা করে তার সাথে রুমের আড়ালে কথা বলতে শুরু করল।

শয়তানের কুমন্ত্রণায় এক সময় তারা একই রুমে কথা বলতে লাগল।

এভাবে শয়তান তার কাজের কঠিন অংশ বাস্তবায়ন করল। এই পর্যায়ে বারসিসা এবং মেয়েটা একে অপরের প্রতি দুর্বল হল এবং এক সময় ব্যভিচারে লিপ্ত হল। মেয়েটি গর্ভবতী হল, একটি বাচ্চা জন্ম দিল। বাচ্চা জন্মের সময় শয়তান বারসিসার কাছে আবার আসল এবং বলল, “এটা তুমি কি করলে? তোমার পাপের প্রমাণ সরিয়ে ফেল, না হলে মেয়েটির ভাইরা ফিরে আসলে তোমাকে খুন করবে!”

বারসিসা বাচ্চাটিকে খুন করল এবং ঐ ঘরের মেঝেতে পুঁতে ফেলল।

শয়তান এবার বলল , “তুমি এক নারীর সন্তান হত্যা করেছ এবং আশা করছ যে, সে এটা কাউকে বলবে না?”

তখন বারসিসা মেয়েটিকেও খুন করল এবং তাকেও ঐ ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখল। মেয়েটির ভাইরা ফিরে আসলে তাদেরকে একটা মিথ্যা কবর দেখিয়ে বলল, “তোমাদের বোন অসুখে মারা গিয়েছে এবং ঐ কবরে দাফন করা হয়েছে”। তারা বারসিসার কথা বিশ্বাস করল।

সেই রাতে শয়তান তিন ভাইকে একই স্বপ্ন দেখাল যে, “বারসিসা তোমাদের বোনকে হত্যা করেছে, প্রমান হিসেবে তোমাদের বোন যে ঘরে থাকত তার মেঝে খুঁড়ে দেখতে পারো”। ঘুম ভাঙ্গলে তারা একে অপরকে স্বপ্নের কথা বলল এবং বুঝতে পারল তারা তিনজন একই স্বপ্ন দেখেছে।

যাচাই করার জন্য তারা বারসিসার এলাকায় যেয়ে প্রথমে বারসিসার দেখানো কবর খুঁড়ল, দেখলো কিছু নেই, এর পর যে ঘরে তাদের বোন থাকত তারা ঐ ঘরের মেঝে খুঁড়ে তাদের বোনের এবং বাচ্চার লাশ পেল। তারা বারসিসাকে ধরল এবং বলতে বাধ্য করলো আসলে কি হয়েছিল।

তারপর তারা তাকে রাজার কাছে নিয়ে গেলে রাজা তাকে শিরচ্ছেদ করতে আদেশ দিল। যখন বারসিসাকে শিরচ্ছেদ করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন শয়তান তার কাছে আবার আসল। এবার ওয়াসওয়াসা না, মানুষের রূপ নিয়ে সে আসল। এসে বলল, “শুনো বারসিসা, আমি হলাম শয়তান, তোমার এই অবস্থা তোমার নিজের চিন্তায় হয়নি, আমিই করেছি আর একমাত্র আমিই তোমাকে বাঁচাতে পারি যদি তুমি আমার কথা মেনে চল।” বারসিসা বলল, “আমাকে কি করতে হবে?”

শয়তান বলল, "আমাকে সেজদা কর। আমি তোমাকে রক্ষা করবো।" বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে বারসিসা শয়তানকে সিজদা করল এবং কাফের হয়ে গেল। সিজদা করার সাথে সাথে শয়তান তাকে বলল–‘আমি এখন তোমার থেকে মুক্ত। আমি আল্লাহকে ভয় করি যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক’। এই বলে শয়তান সেখান থেকে পালালো এবং বারসিসার শিরচ্ছেদ করা হল। কেয়ামতের দিন বারসিসাকে যখন জীবিত করা হবে তখন সে শয়তানকে সিজদা করতে করতে উঠে দাঁড়াবে।

দেখুন শয়তান কিভাবে বারসিসাকে ফাঁদে ফেলেছিল। সে এসেছিল বন্ধুর বেশে, ভালো ভালো কথা বলতে আর আপাত:দৃষ্টিতে ভালো কাজে উৎসাহ দিতে, কিন্তু আসলে সে ছিলো সবচেয়ে বড় শত্রু।

আল্লাহ বলেন,

তাদের দৃষ্টান্ত শয়তান, যে মানুষকে বলে কুফরি করো। অতঃপর যখন সে কুফরি করে , তখন শয়তান বলে: আমি তোমার থেকে মুক্ত। আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। [সুরা হাশর ৫৯:১৬]

ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে বারসিসার জীবনের শেষ কাজটা ছিল শয়তানকে সিজদাহ করা। সে ছিল সেই উপাসক যে ছিল সরল পথের উপর, কিন্তু যেহেতু সে সরল পথ থেকে বাঁক নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যদিও খুব ছোট্ট একটা বাঁক, প্রথম দিকে যেটাকে একেবারেই তুচ্ছ মনে হচ্ছিল, কিন্তু দেখুন তার শেষ পরিণতি। তার এই ছোট্র ছোট্র বাঁকগুলো তাকে নিয়ে গেল ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমায়।

আমরা যারা নিজের ইচ্ছাকে অনুসরণ করি তাদের শিক্ষার জন্য বারসিসার কাহিনীটি একটি রত্নবিশেষ। আমরা যেন কোনো কাজেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার আদেশের উপর নিজেদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দেই। ছোট ছোট হারাম গুলোকে গুরুত্বসহকারে পরিহার করি এবং ছোট ছোট নেক কাজগুলোকেও ছেড়ে না দেই। আমরা যেন আমাদের জ্ঞান, আমাদের ইবাদত ইত্যাদি নিয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে যাই। আমরা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি তথা জান্নাত আমাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকি ও ছোট-বড় সব ধরনের হারামকে পরিহার করি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে আমরা যেন ছোট-বড় সব ধরনের নেক কাজেই প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হই। সর্বোপরি আমরা যেন অহঙ্কারী হয়ে না উঠি এবং আল্লাহর ভয়ে আমাদের অন্তর যেন থাকে সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত।

আল্লাহ বলেন,

“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে” (সূরা ফাতির ৩৫ : ২৮)।

রেফারেন্সঃ

The Hereafter Series
Lecturer: Imam Anwar Al Awlaki
ইমাম আওলাকি (রহঃ) তার “Hereafter” সিরিজে মৃত্যু ফিতনারকথা বলতে গিয়ে এই কাহিনী বর্ণনা করেন।

ঘটনা থেকে শিক্ষাঃ

১। খেয়াল করে দেখুন শয়তান বারসিসার সাথে কোন নীতি গ্রহণ করেছিল? যদি শয়তান বারসিসার কাছে এসে সরাসরি বলত, 'আমাকে সিজদাহ করো' বারসিসা কি কখনো তা করত? না, করত না। কিন্তু শয়তান তার পরিকল্পনা মাফিক ধীরে ধীরে একটার পর একটা ছোট ছোট ধাপে বারসিসাকে দিয়ে ভুল করিয়ে অবশেষে তাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যে, জীবন রক্ষার তাগিদে সে অবশেষে শিরক করে ফেলে।

শয়তান সব সময়ই আপনাকে ভালো ভালো কারণ দেখিয়ে ধোঁকায় ফেলবে এবং শয়তান আমাদের যে কারো চাইতেই বেশী ধৈর্য্যশীল। তাই সে বার বার ফিরে আসবে। কাজেই আমরা সবসময়ই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবো শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

শয়তানের কাজই হল এটা যে, সে সারাজীবন আপনার আমার পেছনে লেগে থাকবে এবং তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করা। ঈমান থেকে বিচ্যুত করে মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত করা। সুবাহানাল্লাহ! বারসিসার করুণ পরিণতি থেকে আমরা সেটা উপলব্ধি করতে পারি। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুণ, আমীন।

২। খালি চোখে বারসিসার কাহিনী থেকে যে শিক্ষাটা আমাদের প্রথমে মনে আসে সেটা হল “নারী ফিতনা”। নারী ফিতনার প্রকটতা বুঝতে হলে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে কেন রাসূল (সাঃ) বলে গেছেন, “আমি আমার উম্মতের জন্য নারীর চেয়ে অধিক বড় কোন ফিতনা রেখে যাচ্ছি না”। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, "যখন দুইজন নারী পুরুষ একাকী অবস্থান করে তাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে শয়তান অবস্থান করে"। তাই আমাদের উচিত নন-মাহরাম নারীদের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা কখোনোই অতিক্রম না করা।

কখনোই ভাববেন না যে আপনার অনেক জ্ঞান আছে, বিচার-বুদ্ধি আছে, শয়তান কিছুতেই আপনাকে ধোঁকায় ফেলতে পারবে না। বরং, প্রকৃত জ্ঞানীরা শয়তানের ফাঁদে পড়ার ভয় সবচাইতে বেশী করে। এই কারণেই আপনি দেখবেন আলেমদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি) সবচাইতে বেশী।

৩। বারসিসার এই কাহিনী থেকে আরেকটা জিনিস লক্ষণীয় আর সেটা হল “Good Intention”। আমি তো ভালোর জন্যই কাজটা করছি এই সান্ত্বনা দিয়ে শয়তান আমাদের ফাঁদে ফেলে। একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখব শয়তান বারবার বারসিসাকে মেয়েটির ভালোর জন্য ওয়াসওয়াসা দিয়েছে। তুমি এমন না করলে মেয়েটির এই হবে, তুমি তেমন না করলে মেয়েটির সেই হবে এই ওয়াসওয়াসা। বারসিসা প্রতিবার সেই ফাঁদে পা দিয়েছে আর তার ফল সে পেয়েছে অবশেষে। এই বিষয়টা খুব সূক্ষ্ণভাবে আমাদের লক্ষ্য করা উচিত।

৪) আল্লাহ যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন, তা থেকে আমরা বিরত থাকবো। নিজে থেকে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করব না যে–এটা করলে কি হয়? এ আর এমন কি? আল্লাহ নিষেধ করলে কি হবে দেখতে তো মনে হয় এটা একটা ভালো কাজ। এটা তো ছোট্ট একটা পাপ। না, আল্লাহর যে কোন অবাধ্যতাই পাপের পথে নিয়ে যায়, আপাতঃদৃষ্টিতে পাপটা যত ছোটই হোক না কেন, ছোট পাপই বড় পাপের দিকে টানে, বড় পাপ টানে কুফরীর দিকে।

৫) সর্বশেষ একটা Lesson আমরা বারসিসার কাহিনী থেকে নিতে পারি সেটা হল বৈরাগ্য বা একাকীত্বের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হওয়া। একটু চিন্তা করুন মেয়েটি যদি বারসিসার স্ত্রী হত, কিংবা বারসিসার যদি পরিবার থাকত তাহলে হয়ত শয়তান এত সুযোগ পেত না তাকে পথভ্রষ্ট করার। একটি কথা আমার খুব ভালো লাগে- "আপনি একা থাকলে যা করেন সেটাই আপনার চরিত্র"। একাকীত্ব শয়তানকে খুব বেশী সুযোগ করে দেয় তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার। যে কারনে দ্বীনের পথে থাকতে চাওয়া ভাই বোনদের সব সময় একটা Motivation এর মধ্যে থাকা উচিত। বারসিসার ক্ষেত্রে শয়তান এই সুযোগটা নিয়েছিল। তাকে ওয়াসওয়াসা দিয়েছিল যা বারসিসা এড়িয়ে চলতে পারেনি। একাকিত্বের সময়ের শয়তানী ওয়াসওয়াসা মানুষের তাকওয়ার লেভেলকেও নিচে নামিয়ে দেয় খুব সহজে। আল্লাহ ক্ষমা করুন আমাদের। আমাদের উপর রহম করুন।

বারসিসার যে কাহিনীটা বর্ণনা করলাম এটা হয়ত অনেকেই জানেন। কিন্তু হয়ত এভাবে ভেবে দেখেননি। এখান থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাটুকু আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশগুলোকে Purify করার কাজে লাগতে পারে ইনশাআল্লাহ। আমরা আশরাফুল মাখলুকাত। আমরা আমাদের ভুলের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ যেন আমাদের পাপগুলো মুছে দেন। আমাদের বিগতদিনের ভুলগুলো যেন হয় আজকের দিনের শুদ্ধতার অনুপ্রেরণা। ইসলামের শিক্ষা আর উপলব্ধি যেন আমাদের জান্নাতের পথের পথিক হতে সাহায্য করে। শয়তান যেন দুর্ভাগা বারসিসার মত আমাদেরকে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামের কঠিন আগুনে নিয়ে না যায়। সর্বাবস্থায় আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই। আল্লাহ আমাদের প্রতি রহম করুন। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমীন।

সম্পাদনাঃ মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম