মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
মনীষীদের জীবনী

ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.) এর কারা-জীবনের ঘটনা

৩ মিনিটে পড়ুন২২ আগস্ট ২০২১
ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.) এর কারা-জীবনের ঘটনা
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন (রহ.) ছিলেন তাবেঈনদের একজন। বসবাস করতেন বসরায়। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যার সমাধান দেবার ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন।

একবার একজন মহিলার কাছ থেকে ইবনে সিরিন ৪০ হাজার মুদ্রা ঋণ নিয়ে যায়তুন তেলের ব্যবসা শুরু করলেন। সেই যায়তুনের একটি ড্রাম থেকে একটি মরা ইদুর বের হলো। মানুষজন বলল, হযরত! এজন্য আপনি একটি ড্রামের তেল ফেলে দিলেই তো ঝামেলা চুকে যায়।

ইবনে সিরিন বললেন, আমি এতে আস্বস্ত হতে পারব না। কারণ, আমার ভয় হচ্ছে, সবগুলো ড্রামের তেলেই সেই মরা ইদুরের আছর পড়তে পারে। সন্দেহ থেকে বাঁচার জন্য এবং মানুষকে হারাম থেকে বাঁচানোর জন্য এবং সর্বোপরি আল্লাহর ভয়ে তিনি সবগুলো ড্রামের তেলই ফেলে দিলেন। আল্লাহর সামনে সন্দেহজনক মন নিয়ে সাক্ষাৎ করাকে পছন্দ করলেন না।

ওদিকে সেই ঋণদাতা মহিলা ক্রমাগত টাকার জন্য ইবনে সিরিনকে তাগাদা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সেই মহিলা বিচারকের কাছে নালিশ করল। ফলে আব্দুল্লাহ ইবনে সিরিনকে কারাগারে যেতে হলো।

কারাগারের দায়িত্বশীল ইবনে সিরিনকে বলল, হযরত! আপনি কারারুদ্ধ থাকা আমার জন্য অত্যন্ত লজ্জাস্কর ও বেদনাদায়ক। এজন্য আপনাকে আমি এতোটুকু ছাড় দিতে চাই যে, আপনি দিনের বেলা তো জেলে থাকবেন, কিন্তু রাত হলে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিবেন।

ইবনে সিরিন বললেন, এটা অনেক বড় খেয়ানত হয়ে যাবে। কারণ, প্রশাসন আমাকে রাত ও দিন উভয় সময়ের জন্যই এই সাজা দিয়েছে।

সে সময় রাসূলের প্রিয় সাহাবি আনাস (রা.) এর ইন্তিকাল হলো। সে সময়ের খলিফা জানাযায় হাজির হলেন। কিন্তু জানাযা তৈয়ার ছিল না। কারণ, হযরত আনাস রা. মৃত্যুর পূর্বে ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন, তার গোসল ও জানাযার কাজ যেন ইবনে সিরিন আঞ্জাম দেন।

একথা শুনে খলিফা তৎক্ষণাত ইবনে সিরিনকে কারাগার থেকে বের করে আনার হুকুম দিলেন। তিনি আনাস (রা.) এর ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন এবং কাজ শেষ করে আবার কারাগারে ফিরে আসেন। ইবনে সিরিন বললেন, খলিফা আমাকে কারামুক্ত করার ক্ষমতা রাখেন না।

সেই মহিলাই আমাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে পারে, যার অভিযোগরে ভিত্তিতে আমাকে কারাগারে দেয়া হযেছে। একমাত্র সে মাফ করলে আমার শাস্তি মওকুফ হবে।

অতঃপর সেই মহিলার অনুমোদন নিয়ে ইবনে সিরিনকে মুক্ত করে দেয়া হয়।

সত্য বিষয় ও সত্য কথা নির্দ্বিধায় বলে বেড়াতেন। আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করতেন না। মানুষ কী বলবে তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। হিশাম রহ. বলেন, শাসকের সামনে ইবনে সীরীন রহ. এর মতো এমন কঠোর অন্য কাউকে আমি দেখিনি।

একবার ইরাকের উমাইয়্যা শাসক উমর ইবনে হুবাইরা হযরত ইবনে সীরীন রহ.কে ডেকে পাঠালেন। তিনি নিজের ভাতিজাকে সঙ্গে নিয়ে তার কাছে গেলেন। দরবারে প্রবেশের পর গভর্নর তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেন। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, আবূ বকর (ইবনে সীরীন), আপনি এলাকার লোকজনকে কোন অবস্থায় রেখে এসেছেন?

ইবনে সীরীন বললেন, তাদের মাঝে জুলুমের বিস্তার খুব বেশি। তারা গণহারে জুলুমের শিকার। তাদের নিয়ে আপনার কোন গ্রাহ্যতা নেই। উদাসীনতা আপনার মাঝে ছেয়ে গেছে। ভাতিজা কাঁধের ইশারায় থামতে বললেন। তিনি উত্তরে বললেন, তুমি তো জিজ্ঞাসিত হচ্ছো না। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে। এটা তো সাক্ষ্য প্রদানের নামান্তর। আর যে ব্যক্তি সাক্ষ্যদান গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৮৩)

এক পর্যায়ে গভর্নরের মজলিস ভেঙে যায়। ইবনে হুবাইরা একই সমাদরে হযরত ইবনে সীরীনকে বিদায় জানালেন। তিন হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ভরে একটি ব্যাগ দিলেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি।

হিজরী ১১০ সালে এই মহামনীষী দুনিয়া ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমান। বসরা নগরীর মাটিতে তিনি সমাহিত হন।

(গ্রন্থসূত্র: তারিখে বাগদাদ )

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
গাজি হাসান পাশা, যিনি আমেরিকাকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য করেছিলেন
মনীষীদের জীবনী

গাজি হাসান পাশা, যিনি আমেরিকাকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য করেছিলেন

গাজি হাসান পাশা। উসমানী খিলাফতের সর্বশেষ সিংহ। যিনি আমেরিকাকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য করেছিলেন। হ্যা, আপনি ঠিকই শুনেছেন, আমেরিকাও একসময় উসমানী খিলাফতকে…

ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক
মনীষীদের জীবনী

ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক

একবার মুসলিমদের জীবন ব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থায় খলিফার নিকট এক নাস্তিক এসে বললেন যে আপনার সাম্রাজ্যে এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে ডাকুন আমি তাকে তর্ক…

ইমাম ইবন কাইয়িম আল জাউজিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) (১২৯২–১৩৫০)
মনীষীদের জীবনী

ইমাম ইবন কাইয়িম আল জাউজিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) (১২৯২–১৩৫০)

মুহাম্মদ ইবন আবু বকর বা ইবনে কাইয়িম ("অধ্যক্ষের সন্তান") বা ইবন কাইয়িম আল জাউজিয়া ("জাউজিয়া বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের সন্তান") বলে অধিক পরিচিত। তিনি…