এক অসাধারণ বালকের কাহিনী (আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যিনি হাসিমুখে বরণ করে নিলেন মৃত্যুকে)
৮ মিনিটে পড়ুন১৩ জুন ২০২০

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা যে সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তার প্রত্যেকটি ঘটনাতেই আমাদের জন্য অনেক শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। কিন্তু আমাদের অনেকেই সেই ঘটনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যাতে শিক্ষনীয় বস্তুগুলো সুস্পষ্ট হয়ে উঠে না। বক্তাগণ এ সমস্ত ঘটনা বলে শ্রোতাদেরকে কখনও হাসান আবার কখনও কাঁদান ঠিকই, কিন্তু যেই উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ ঘটনাগুলো উল্লেখ করেছেন, সেই সুমহান উদ্দেশ্যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্টই থেকে যায়। কুরআনে বর্ণিত সূরা বুরুজ এর ঘটনাও কুরআনের শিক্ষনীয় ঘটনাসমূহের অন্যতম একটি ঘটনা। আসুন আমরা তাফসীরে ইবনে কাছীর ও কাসাসুল কুরআনের আলোকে এই শিক্ষনীয় ঘটনা এবং তার শিক্ষনীয় বিষয়গুলো জেনে নেই।
ঘটনার বিবরণঃ
হযরত সুহায়েব (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমাদের পূর্বেকার লোকদের মধ্যে একজন বাদশাহ ছিল। তার দরবারে ছিল একজন জাদুকর। সে যখন বার্ধক্যে উপনীত হলো, তখন বাদশাহকে বললোঃ আমি একদম বুড়ো হয়ে গেছি। সুতরাং একটি বালককে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আমি তাকে জাদু শিখিয়ে দেব।’ সে মতে বাদশাহ একটি কিশোরকে জাদু শেখানোর জন্যে তার কাছে পাঠালেন। তার চলাচলের পথে ছিল এক খ্রিষ্টান দরবেশ। বালকটি দরবেশের কাছে বসে তার কথাবার্তা শুনে চমৎকৃত হলো। এভাবে জাদুকরের কাছে যাতায়াতের পথে দরবেশের কাছে বসতে লাগল। একদিন জাদুকরের কাছে গেলে সে তাকে খুব মারধর করল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সে দরবেশের কাছে এ ব্যাপারে নালিশ করল। দরবেশ তাকে উপদেশ দিল, তোমার মনে যখন জাদুকরের জিজ্ঞাসাবাদের ভয় জাগবে তখন তাকে বলবেঃ আমার পরিবার আমাকে আটকে রেখেছিল।আর যখন তোমার মাঝে স্বীয় পরিবারবর্গের ভয় জাগবে, তখন তাদেরকে বলবে, জাদুকর আমায় আটকে রেখেছিল।
এই পরিস্থিতিতে একদিন এক বিরাট জন্তু এসে লোকদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দিল। বালকটি তখন মনে মনে ভাবলঃ আজ আমায় জানতে হবে যে, দরবেশ শ্রেষ্ঠ, না জাদুকর শ্রেষ্ঠ? অতঃপর সে একটি পাথর খন্ড হাতে নিয়ে প্রার্থনা করলঃ হে আল্লাহ! তোমার কাছে যদি জাদুকরের চেয়ে দরবেশের কাজ বেশি পছন্দনীয় হয়, তাহলে লোকদের পথ চলাচলের সুবিধার্থে এই জন্তুটাকে মেরে ফেল। এরপর সে উক্ত পাথর খন্ডটি ছুঁড়ে মারল এবং তাতে জন্তুটি মারা গেল। এতে চলাচলের পথটি উন্মক্ত হয়ে গেল এবং লোকেরাও নিজ নিজ লক্ষ্যপানে চলে গেল। এরপর সে দরবেশের কাছে এসে এ খবরটি তাকে জানাল। দরবেশ’ তাকে বললঃ ‘হে প্রিয় বৎস! আজ তুমি আমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছ। আমার মতে, আজ তুমি একটি বিশেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছ; তুমি খুব শীগগীরই একটি কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত হবে। কাজেই তুমি যখন কোনো বিপদে ফেঁসে যাবে, তখন আমার সম্পর্কে কাউকে কোন সন্ধান দেবে না।’
বালকটি মানুষের সব জটিল রোগের চিকিৎসা করত; বিশেষত অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে সে সুস্থ করে তুলত। তৎকালীন বাদশাহর দরবারের একজন সদস্য অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে এ খবর শুনে অনেক উপঢৌকন নিয়ে এসে বালকটিকে বললোঃ ‘তুমি আমায় সুস্থ্য করে তুলবে, এ প্রত্যাশায়ই আমি তোমার জন্যে এত উপঢৌকন নিয়ে এসেছি।’ জবাবে বালকটি বললঃ ‘আমি তো কাউকে সুস্থতা দান করি না, আল্লাহই প্রকৃতপক্ষে সুস্থতা দান করেন। তুমি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো, তাহলে তোমার সুস্থতার জন্যে আমি আল্লাহর কাছে দো‘আ করব।’ লোকটি তখন আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহও তাকে সুস্থতা দান করলেন। তারপর সে বাদশাহর দরবারে যথারীতি আসন গ্রহণ করল। বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করলঃ কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল? সে জবাব দিলঃ আমার প্রভু (রব্)। বাদশাহ আবার তাকে প্রশ্ন করলঃ কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল? সে জবাব দিলঃ আমার প্রভু। এবার বাদশাহ প্রশ্ন করলঃ আমি ছাড়াও কি তোমার কোন প্রভু আছে? সে বলল, ‘আল্লাহই আমার ও তোমার প্রভু।’ এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বাদশাহ তাকে শাস্তি দিতে লাগল। শাস্তি সহ্য করতে না পেরে সে বালকটির নাম বলে দিল। সে মতে বালকটিকে ডেকে আনা হলো। বাদশাহ তাকে স্নেহের সুরে বললেনঃ হে প্রিয় বালক! তোমার সম্পর্কে আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, তুমি নাকি জাদুবিদ্যার সাহায্যে অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় দান করো এবং আরো নানা রকমের রোগীকে সুস্থ করে তোল। জবাবে বালকটি বললঃ মহামান্য বাদশাহ! আমি কাউকে সুস্থতা দান করি না। সুস্থতা তো আল্লাহই দান করেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বাদশা তাকে শাস্তি দিতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সে খ্রিষ্টান দরবেশের নাম বলে দিল। সে মতে দরবেশকে ডেকে আনা হলো এবং তাকে তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে বলা হলো। কিন্তু সে তাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। তখন বাদশাহ জণৈক কর্মচারীকে একটি করাত আনতে বলল। করাত নিয়ে এলে সেটিকে দরবেশের মাথার ঠিক মাঝ বরাবর স্থাপন করে তাকে চিরে ফেলা হলো। ফলে তার দেহটি দুখণ্ড হয়ে পড়ে গেল। এরপর বাদশাহর কথিত কর্মচারীকে আনা হলো। তাকেও তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে বলা হলো। কিন্তু সেও তা অস্বীকার করায় তার মাথা মাঝ বরাবর করাত দিয়ে চিরে ফেলা হলো। এরপর বালকটিকে নিয়ে আসা হলো এবং তাকেও তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে বলা হলো। কিন্তু সে দৃড়ভাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। তখন বাদশাহ তাকে কতিপয় সঙ্গীর হাতে তুলে দিয়ে বললোঃ তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাও। যখন তোমরা পাহাড়ের উঁচু শিখরে গিয়ে উঠবে, তখন সে যদি তার ধর্ম ত্যাগ করে, তবে সে ঠিক। নচেত সেখান থেকে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে।
সেমতে লোকেরা ছেলেটিকে নিয়ে পাহাড়ে উঠল। ছেলেটি বললঃ ‘ হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে পছন্দ করো এদের কবল থেকে আমায় মুক্তি দান করো।’ এসময় পাহাড়টি হঠাৎ কেঁপে উঠল এবং তারা সবাই নিচে পড়ে গেল। আর ছেলেটি বাদশাহর কাছে ফিরে এলো। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ ‘তোমার সঙ্গীদের কি হয়েছে?’ ছেলেটি বললঃ ‘আল্লাহ তাদের কবল থেকে আমায় রক্ষা করেছেন।’ তখন বাদশাহ তাকে অন্য কতিপয় সঙ্গীর হাতে ন্যস্ত করে বললঃ একে তোমরা একটি ছোট্র নৌকায় তুলে গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাও। অতঃপর সে যদি তার ধর্ম (দ্বীন) ত্যাগ না করে, তবে তাকে তোমরা সেখানে (সমুদ্রে) ফেলে দাও। এই নির্দেশমুতাবেক লোকেরা তাকে নিয়ে সমুদ্রপথে চলল। ছেলেটি প্রার্থনা করলঃ হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে পছন্দ করো, এদের কবল থেকে আমায় মুক্তি দাও। এরপর নৌকাটি তাদের নিয়ে ডুবে গেল এবং তারা সবাই মৃত্যুবরণ করল। ছেলেটি বাদশাহর কাছে ফিরে এল। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলঃ তোমার সঙ্গীদের ভাগ্যে কি ঘটেছে? সে জবাব দিলঃ আল্লাহই আমাকে তাদের কবল থেকে রক্ষা করেছেন। অতঃপর সে বাদশাকে লক্ষ্য করে বললঃ তুমি আমার নির্দেশ মুতাবেক কাজ করো তবেই আমায় হত্যা করতে পারবে। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলঃ সেটা কি ধরনের কাজ? সে বললঃ একটি মাঠে লোকদেরকে জড়ো করো। তারপর আমায় শূলের ওপর বসাও এবং আমার তীরদানি থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মাঝ বরাবর রেখে বলোঃ ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম’ (অর্থাৎ বালকটির প্রভু আল্লাহর নামে তীর ছুঁড়ছি)- এই বলে তীর ছুঁড়ো। এভাবে তীর ছুঁড়লেই তুমি আমায় হত্যা করতে পারবে।
বাদশাহ তখন একটি মাঠে লোকদেরকে জড়ো করে ছেলেটিকে শূলের ওপর বসিয়ে তার তীরদানি থেকে একটি তীর ধনুকের মাঝখানে স্থাপন করে ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম’ বলে তার প্রতি ছুঁড়ে মারল। তীরটি বালকটির কানের পাশ দিয়ে মাথা ভেদ করল এবং তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু ঘটল। এতে লোকেরা বলতে লাগলঃ ‘আমরা বালকটির প্রভু আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম।’ এ সংবাদ বাদশার নিকট পৌঁছালে তাকে বলা হলো, ‘যে আশংকা তুমি পোষণ করেছিলে, তা-ই তো হয়ে গেল; অর্থাৎ সব লোকেরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে।’ বাদশাহ তখন রাস্তার পার্শ্বে বিরাট আকারে গর্ত করার নির্দেশ দিল। অতঃপর গর্ত খনন করে তাতে আগুন জ্বালানো হলো। বাদশাহ ঘোষনা করলো, কোন ব্যক্তি তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে না চাইলে তাকে তোমরা গর্তে নিক্ষেপ করো। এ ঘোষণা অনুসারে যারা স্বীয় দ্বীন থেকে ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাল, তাদেরকে আগুনে ছুঁড়ে মারা হলো। শেষ পর্যন্ত একজন মহিলাতার সন্তানসহ এল। সে আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতঃস্তত করলে তার সন্তান বললঃ ‘আম্মা! আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। (অর্থাৎ আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতঃস্তত করবেন না); কারণ আপনি তো সত্যের ওপর রয়েছেন।’
পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস হয়েছিল গর্তওয়ালারা- ইন্ধনপূর্ণ যে গর্তে ছিল অগ্নি, যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা বিশ্বাস করত পরাক্রমশালী ও প্রশংসার্হ আল্লাহে’ {বুরূজ ৪-৮}।
[(মুসলিম হাদিস নং - ৩০০৫ ‘যুহদ ও রিক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭), (ছুহাইব বিন সিনান আর-রূমী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আহমাদ হাদিস নং - ২৩৯৭৬), (রিয়াদুস সালেহীন হাদিস নং - ৩০)]
এই ঘটনা থেকে কতিপয় শিক্ষাঃ
১) তাওহীদকে মেনে নেওয়া মানুষের ফিতরাতি তথা সৃষ্টিগত স্বভাব। অর্থাৎ কোন মানুষকে যদি তার স্বভাবজাত ধর্মের উপর ছেড়ে দেয়া হয় এবং বাইরের কোন গোমরাহ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে বিভ্রান্ত না করে, তাহলে সে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিবে, তারই এবাদত করবে এবং তাঁর এবাদতে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। যেমনটি হয়েছেলি ঘটনায় বর্ণিত যুবকদের ক্ষেত্রে।
২) পৃথিবীতে তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় যুবকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) মূর্তি পূজা, অলী-আওলীয়াদের পূজা এবং শির্কের পক্ষে কোন দলীল নেই।
৪) সাহসের সাথে তাওহীদের বাণী প্রকাশ্যে প্রচার করা জরুরী।
৫) বিপদাপদে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং তাঁর দয়া কামনা করা জরুরী।
৬) প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সত্যের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব অপরিসীম।
৭) তাওহীদ ও শির্কের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা অর্জন করা জরুরী। অন্যথায় তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব নয়।
৮) রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানের সম্পর্ক অধিক মজবুত হওয়া আবশ্যক।
৯) হেদায়াত আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর বান্দার প্রতি বিরাট একটি নেয়ামত। বান্দার উচিত সর্ব অবস্থায় আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করা।
১০) আল্লাহ কখনও দ্বীনের দাঈদের ঈমানী শক্তি পরীক্ষা করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদেরকে শক্তিশালী করে দেন। তখন দাঈদের উচিত ধৈর্য ধারণ করা।
১১) প্রয়োজনে সত্য গোপন করা জায়েয আছে। কিন্তু তা সকল সময়ের জন্য নয়।
১২) হক্বের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
১৩) মুমিন দুনিয়াবী জীবনে পদে পদে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তার ঈমানের মযবূতী পরখ করেন।
১৪) আল্লাহ্র পথের নির্ভীক সৈনিকেরা বাতিলের সামনে কখনো মাথা নত করে না।
১৫) রোগমুক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ; কোন পীর-ফকীর বা সাধু-সন্ন্যাসী নয়।
১৬) মুমিন বান্দা সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করবে ও কায়মনোবাক্যে তাঁর নিকট দো‘আ করবে।
১৭) প্রত্যেকটি আদম সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে।
ঘটনার বিবরণঃ
হযরত সুহায়েব (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমাদের পূর্বেকার লোকদের মধ্যে একজন বাদশাহ ছিল। তার দরবারে ছিল একজন জাদুকর। সে যখন বার্ধক্যে উপনীত হলো, তখন বাদশাহকে বললোঃ আমি একদম বুড়ো হয়ে গেছি। সুতরাং একটি বালককে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আমি তাকে জাদু শিখিয়ে দেব।’ সে মতে বাদশাহ একটি কিশোরকে জাদু শেখানোর জন্যে তার কাছে পাঠালেন। তার চলাচলের পথে ছিল এক খ্রিষ্টান দরবেশ। বালকটি দরবেশের কাছে বসে তার কথাবার্তা শুনে চমৎকৃত হলো। এভাবে জাদুকরের কাছে যাতায়াতের পথে দরবেশের কাছে বসতে লাগল। একদিন জাদুকরের কাছে গেলে সে তাকে খুব মারধর করল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সে দরবেশের কাছে এ ব্যাপারে নালিশ করল। দরবেশ তাকে উপদেশ দিল, তোমার মনে যখন জাদুকরের জিজ্ঞাসাবাদের ভয় জাগবে তখন তাকে বলবেঃ আমার পরিবার আমাকে আটকে রেখেছিল।আর যখন তোমার মাঝে স্বীয় পরিবারবর্গের ভয় জাগবে, তখন তাদেরকে বলবে, জাদুকর আমায় আটকে রেখেছিল।
এই পরিস্থিতিতে একদিন এক বিরাট জন্তু এসে লোকদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দিল। বালকটি তখন মনে মনে ভাবলঃ আজ আমায় জানতে হবে যে, দরবেশ শ্রেষ্ঠ, না জাদুকর শ্রেষ্ঠ? অতঃপর সে একটি পাথর খন্ড হাতে নিয়ে প্রার্থনা করলঃ হে আল্লাহ! তোমার কাছে যদি জাদুকরের চেয়ে দরবেশের কাজ বেশি পছন্দনীয় হয়, তাহলে লোকদের পথ চলাচলের সুবিধার্থে এই জন্তুটাকে মেরে ফেল। এরপর সে উক্ত পাথর খন্ডটি ছুঁড়ে মারল এবং তাতে জন্তুটি মারা গেল। এতে চলাচলের পথটি উন্মক্ত হয়ে গেল এবং লোকেরাও নিজ নিজ লক্ষ্যপানে চলে গেল। এরপর সে দরবেশের কাছে এসে এ খবরটি তাকে জানাল। দরবেশ’ তাকে বললঃ ‘হে প্রিয় বৎস! আজ তুমি আমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছ। আমার মতে, আজ তুমি একটি বিশেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছ; তুমি খুব শীগগীরই একটি কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত হবে। কাজেই তুমি যখন কোনো বিপদে ফেঁসে যাবে, তখন আমার সম্পর্কে কাউকে কোন সন্ধান দেবে না।’
বালকটি মানুষের সব জটিল রোগের চিকিৎসা করত; বিশেষত অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে সে সুস্থ করে তুলত। তৎকালীন বাদশাহর দরবারের একজন সদস্য অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে এ খবর শুনে অনেক উপঢৌকন নিয়ে এসে বালকটিকে বললোঃ ‘তুমি আমায় সুস্থ্য করে তুলবে, এ প্রত্যাশায়ই আমি তোমার জন্যে এত উপঢৌকন নিয়ে এসেছি।’ জবাবে বালকটি বললঃ ‘আমি তো কাউকে সুস্থতা দান করি না, আল্লাহই প্রকৃতপক্ষে সুস্থতা দান করেন। তুমি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো, তাহলে তোমার সুস্থতার জন্যে আমি আল্লাহর কাছে দো‘আ করব।’ লোকটি তখন আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহও তাকে সুস্থতা দান করলেন। তারপর সে বাদশাহর দরবারে যথারীতি আসন গ্রহণ করল। বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করলঃ কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল? সে জবাব দিলঃ আমার প্রভু (রব্)। বাদশাহ আবার তাকে প্রশ্ন করলঃ কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল? সে জবাব দিলঃ আমার প্রভু। এবার বাদশাহ প্রশ্ন করলঃ আমি ছাড়াও কি তোমার কোন প্রভু আছে? সে বলল, ‘আল্লাহই আমার ও তোমার প্রভু।’ এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বাদশাহ তাকে শাস্তি দিতে লাগল। শাস্তি সহ্য করতে না পেরে সে বালকটির নাম বলে দিল। সে মতে বালকটিকে ডেকে আনা হলো। বাদশাহ তাকে স্নেহের সুরে বললেনঃ হে প্রিয় বালক! তোমার সম্পর্কে আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, তুমি নাকি জাদুবিদ্যার সাহায্যে অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় দান করো এবং আরো নানা রকমের রোগীকে সুস্থ করে তোল। জবাবে বালকটি বললঃ মহামান্য বাদশাহ! আমি কাউকে সুস্থতা দান করি না। সুস্থতা তো আল্লাহই দান করেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বাদশা তাকে শাস্তি দিতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সে খ্রিষ্টান দরবেশের নাম বলে দিল। সে মতে দরবেশকে ডেকে আনা হলো এবং তাকে তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে বলা হলো। কিন্তু সে তাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। তখন বাদশাহ জণৈক কর্মচারীকে একটি করাত আনতে বলল। করাত নিয়ে এলে সেটিকে দরবেশের মাথার ঠিক মাঝ বরাবর স্থাপন করে তাকে চিরে ফেলা হলো। ফলে তার দেহটি দুখণ্ড হয়ে পড়ে গেল। এরপর বাদশাহর কথিত কর্মচারীকে আনা হলো। তাকেও তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে বলা হলো। কিন্তু সেও তা অস্বীকার করায় তার মাথা মাঝ বরাবর করাত দিয়ে চিরে ফেলা হলো। এরপর বালকটিকে নিয়ে আসা হলো এবং তাকেও তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে বলা হলো। কিন্তু সে দৃড়ভাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। তখন বাদশাহ তাকে কতিপয় সঙ্গীর হাতে তুলে দিয়ে বললোঃ তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাও। যখন তোমরা পাহাড়ের উঁচু শিখরে গিয়ে উঠবে, তখন সে যদি তার ধর্ম ত্যাগ করে, তবে সে ঠিক। নচেত সেখান থেকে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে।
সেমতে লোকেরা ছেলেটিকে নিয়ে পাহাড়ে উঠল। ছেলেটি বললঃ ‘ হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে পছন্দ করো এদের কবল থেকে আমায় মুক্তি দান করো।’ এসময় পাহাড়টি হঠাৎ কেঁপে উঠল এবং তারা সবাই নিচে পড়ে গেল। আর ছেলেটি বাদশাহর কাছে ফিরে এলো। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ ‘তোমার সঙ্গীদের কি হয়েছে?’ ছেলেটি বললঃ ‘আল্লাহ তাদের কবল থেকে আমায় রক্ষা করেছেন।’ তখন বাদশাহ তাকে অন্য কতিপয় সঙ্গীর হাতে ন্যস্ত করে বললঃ একে তোমরা একটি ছোট্র নৌকায় তুলে গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাও। অতঃপর সে যদি তার ধর্ম (দ্বীন) ত্যাগ না করে, তবে তাকে তোমরা সেখানে (সমুদ্রে) ফেলে দাও। এই নির্দেশমুতাবেক লোকেরা তাকে নিয়ে সমুদ্রপথে চলল। ছেলেটি প্রার্থনা করলঃ হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে পছন্দ করো, এদের কবল থেকে আমায় মুক্তি দাও। এরপর নৌকাটি তাদের নিয়ে ডুবে গেল এবং তারা সবাই মৃত্যুবরণ করল। ছেলেটি বাদশাহর কাছে ফিরে এল। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলঃ তোমার সঙ্গীদের ভাগ্যে কি ঘটেছে? সে জবাব দিলঃ আল্লাহই আমাকে তাদের কবল থেকে রক্ষা করেছেন। অতঃপর সে বাদশাকে লক্ষ্য করে বললঃ তুমি আমার নির্দেশ মুতাবেক কাজ করো তবেই আমায় হত্যা করতে পারবে। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলঃ সেটা কি ধরনের কাজ? সে বললঃ একটি মাঠে লোকদেরকে জড়ো করো। তারপর আমায় শূলের ওপর বসাও এবং আমার তীরদানি থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মাঝ বরাবর রেখে বলোঃ ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম’ (অর্থাৎ বালকটির প্রভু আল্লাহর নামে তীর ছুঁড়ছি)- এই বলে তীর ছুঁড়ো। এভাবে তীর ছুঁড়লেই তুমি আমায় হত্যা করতে পারবে।
বাদশাহ তখন একটি মাঠে লোকদেরকে জড়ো করে ছেলেটিকে শূলের ওপর বসিয়ে তার তীরদানি থেকে একটি তীর ধনুকের মাঝখানে স্থাপন করে ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম’ বলে তার প্রতি ছুঁড়ে মারল। তীরটি বালকটির কানের পাশ দিয়ে মাথা ভেদ করল এবং তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু ঘটল। এতে লোকেরা বলতে লাগলঃ ‘আমরা বালকটির প্রভু আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম।’ এ সংবাদ বাদশার নিকট পৌঁছালে তাকে বলা হলো, ‘যে আশংকা তুমি পোষণ করেছিলে, তা-ই তো হয়ে গেল; অর্থাৎ সব লোকেরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে।’ বাদশাহ তখন রাস্তার পার্শ্বে বিরাট আকারে গর্ত করার নির্দেশ দিল। অতঃপর গর্ত খনন করে তাতে আগুন জ্বালানো হলো। বাদশাহ ঘোষনা করলো, কোন ব্যক্তি তার ধর্ম (দ্বীন) থেকে ফিরে আসতে না চাইলে তাকে তোমরা গর্তে নিক্ষেপ করো। এ ঘোষণা অনুসারে যারা স্বীয় দ্বীন থেকে ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাল, তাদেরকে আগুনে ছুঁড়ে মারা হলো। শেষ পর্যন্ত একজন মহিলাতার সন্তানসহ এল। সে আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতঃস্তত করলে তার সন্তান বললঃ ‘আম্মা! আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। (অর্থাৎ আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতঃস্তত করবেন না); কারণ আপনি তো সত্যের ওপর রয়েছেন।’
পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস হয়েছিল গর্তওয়ালারা- ইন্ধনপূর্ণ যে গর্তে ছিল অগ্নি, যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা বিশ্বাস করত পরাক্রমশালী ও প্রশংসার্হ আল্লাহে’ {বুরূজ ৪-৮}।
[(মুসলিম হাদিস নং - ৩০০৫ ‘যুহদ ও রিক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭), (ছুহাইব বিন সিনান আর-রূমী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আহমাদ হাদিস নং - ২৩৯৭৬), (রিয়াদুস সালেহীন হাদিস নং - ৩০)]
এই ঘটনা থেকে কতিপয় শিক্ষাঃ
১) তাওহীদকে মেনে নেওয়া মানুষের ফিতরাতি তথা সৃষ্টিগত স্বভাব। অর্থাৎ কোন মানুষকে যদি তার স্বভাবজাত ধর্মের উপর ছেড়ে দেয়া হয় এবং বাইরের কোন গোমরাহ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে বিভ্রান্ত না করে, তাহলে সে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিবে, তারই এবাদত করবে এবং তাঁর এবাদতে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। যেমনটি হয়েছেলি ঘটনায় বর্ণিত যুবকদের ক্ষেত্রে।
২) পৃথিবীতে তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় যুবকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) মূর্তি পূজা, অলী-আওলীয়াদের পূজা এবং শির্কের পক্ষে কোন দলীল নেই।
৪) সাহসের সাথে তাওহীদের বাণী প্রকাশ্যে প্রচার করা জরুরী।
৫) বিপদাপদে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং তাঁর দয়া কামনা করা জরুরী।
৬) প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সত্যের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব অপরিসীম।
৭) তাওহীদ ও শির্কের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা অর্জন করা জরুরী। অন্যথায় তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব নয়।
৮) রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানের সম্পর্ক অধিক মজবুত হওয়া আবশ্যক।
৯) হেদায়াত আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর বান্দার প্রতি বিরাট একটি নেয়ামত। বান্দার উচিত সর্ব অবস্থায় আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করা।
১০) আল্লাহ কখনও দ্বীনের দাঈদের ঈমানী শক্তি পরীক্ষা করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদেরকে শক্তিশালী করে দেন। তখন দাঈদের উচিত ধৈর্য ধারণ করা।
১১) প্রয়োজনে সত্য গোপন করা জায়েয আছে। কিন্তু তা সকল সময়ের জন্য নয়।
১২) হক্বের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
১৩) মুমিন দুনিয়াবী জীবনে পদে পদে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তার ঈমানের মযবূতী পরখ করেন।
১৪) আল্লাহ্র পথের নির্ভীক সৈনিকেরা বাতিলের সামনে কখনো মাথা নত করে না।
১৫) রোগমুক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ; কোন পীর-ফকীর বা সাধু-সন্ন্যাসী নয়।
১৬) মুমিন বান্দা সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করবে ও কায়মনোবাক্যে তাঁর নিকট দো‘আ করবে।
১৭) প্রত্যেকটি আদম সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে।
✦আরও পড়ুন

হাদীসের গল্প
সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী বান্দার সাথে আল্লাহর কথোপকথন
মুমিন তার পাপের কারণে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে। কিন্তু তার ঈমানের কারণে এক সময় সে জান্নাতে যাবে। জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার…

হাদীসের গল্প
সততা ও আমানতের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত {স্বর্ণ ভর্তি একটি কলসির (Jar) কোন দাবীদার খুঁজে পাওয়া গেলো না}
সততা ও আমানতের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত {স্বর্ণ ভর্তি একটি কলসির (Jar) কোন দাবীদার খুঁজে পাওয়া গেলো না} লোভ মানব চরিত্রের অত্যন্ত নিন্দনীয় অভ্যাস। এটি…

হাদীসের গল্প
তাহলে সে নামায শেষ করার পর সদ্যজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়
হযরত আমর ইবনে আবাসা (রাঃ) বলেন, জাহেলী যুগে আমি যখন মানুষকে মূর্তিপূজা করতে দেখতাম আমার কাছে মনে হত, নিশ্চয়ই এরা পথভ্রষ্ট। এদের এ সকল কাজ সম্পূর্ণ…