বিবাহ বিচ্ছেদ এবং তথাকথিত নারী স্বাধীনতা
৬ মিনিটে পড়ুন৮ আগস্ট ২০২২
বিবাহ মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংসার জীবনে ধৈর্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়া অত্যধিক; সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন, ফুটফুটে সন্তান, সুন্দর সংসার, এক সময়ের মধুর সম্পর্কের স্মৃতি কোনো কিছুই বিবাহ বিচ্ছেদকে ঠেকাতে পারছে না। শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশন যে পরিমাণ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে তা সামাজিক বন্ধনের বিচ্ছিন্নতাকে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। গত ২২ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকায় প্রতিদিনে তালাক হচ্ছে ৩৯ জনের। যে হারে বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে তার অধিকাংশই হচ্ছে শিক্ষিত মেয়ের পরিবারে। এমনকি চাকুরীজীবী স্বামী-স্ত্রীদের ক্ষেত্রে তালাকের ঘটনা বেশী ঘটছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্য বলছে, তালাকের আবেদন বেশী হচ্ছে স্ত্রীর পক্ষ থেকে। উত্তর ও দক্ষিণে তালাকের আবেদনের প্রায় ৭০ শতাংশই স্ত্রীর পক্ষ থেকে আসছে।
চবির দুই শিক্ষকের গবেষণার ফলাফল:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের প্রায় দুবছর ধরে চালানো এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক আইন বিষয়ক জার্নাল, ‘বাংলাদেশ জার্নাল অফ ল’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় চট্টগ্রামের ১৭৮ জন তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের তথ্য, পারিবারিক আদালতের নথি ও কাবিননামা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৫৬ শতাংশই তালাক দেন স্ত্রী। যাতে দেনমোহরের অংক ছিলো গড়ে ১২ লাখ টাকা। স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক দেয়ার হার ৪৪ শতাংশ। এক্ষেত্রে দেনমোহর সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা। যদিও শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিবাহ বিচ্ছেদ বা অস্বাভাবিক কাবিনের হার কম।
পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চশিক্ষিত, বিত্তশালী এবং শহরাঞ্চলে বসবাস করা নারীরাই বেশি বেছে নেয় বিবাহ বিচ্ছেদকে।
পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের দেশে তালাকে প্রভাব ফেলছে। পশ্চিমা সংস্কৃতি নারীর ব্রেইনে পুশআপ করেছে,আমি তো কোন অংশে কম না। তবে কেনো কম্পোমাইজে যাবো - ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাবো। বাহিরে থেকে ইউরোপীয়ান লাইফ যতোই চাকচিক্য দেখেন কিন্তু বাস্তবে তার ছিটেফোঁটা নেই। না আছে তাদের family bonding, relation bonding, child bonding. বেশিরভাগই তাদের লাইফ উৎসর্গ করেছে মদ,নারী আর ক্লাবিং এ। নারীরা গ্রহণ করছে, নারী স্বাধীনতার কথা বলে সবক্ষেত্রে পুরুষদের সমপর্যায়ে থাকার নীতি। Gender Discrimination বা নারী পুরুষের শারীরিক এবং মানসিক বৈষম্যকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা এবং এই বৈষম্য থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য; যুদ্ধে নামার মতো প্রোপাগান্ডায় সয়লাভ সমগ্র পৃথিবী। এ দ্বারা নারীকে বোঝানো হয়, তোমার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং পুরুষকে বোঝানো হয়, নারীদের রেস্পেক্ট করা হচ্ছে। সত্যিই কি তাই?
পাশ্চাত্যের নারীবাদীরা নারীর মস্তিষ্ক থেকে আল্লাহর অস্তিত্বই মুছে দিতে চায়। তারা পুরুষদের মাঝেই নিজেদের মূল্য খুঁজে নেয়, পুরুষই হচ্ছে উপযুক্ত মানদণ্ড। সে বিশ্বাস করে, একটি মেয়ে শিশু ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মতো মানুষ হতে পারবে না যতক্ষণ না সে পুরুষদের মতো সব করতে পারছে। সে ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীন নয়, যতক্ষণ সে পুরুষদের মতো সব পাচ্ছে কিংবা তার চেয়েও বেশী পাচ্ছে। কারণ এটাই মানদণ্ড। পুরুষরা যদি জিন্স প্যান্ট পড়তে পারে, তাকেও পড়তে হবে। পুরুষরা যদি আর্মিতে যেতে পারে, তাকেও আর্মিতে যেতে হবে। সে এগুলো চায় কারণ, মানদণ্ড! স্ট্যান্ডার্ড। সে এটা বুঝতে পারে না, আল্লাহ্ তা'আলা নারী-পুরুষ উভয়কেই স্বতন্ত্রভাবে সম্মানিত করেছেন। স্বতন্ত্রতার মাঝেই তাদের সম্মান রেখেছেন; একে অন্যের কার্বন কপি হবার মাঝে নয়।
একজন নারী যখন পুরুষকে তার স্ট্যান্ডার্ড বানায়, তখন থেকেই অন্তরে একটি সন্দেহ জেঁকে বসে- 'আমাকে ঠকানো হচ্ছে।' সে সবকিছুতে সন্দেহ করতে থাকে। এমনকি নিজের অস্তিত্ব নিয়েও কখনো কখনো হীনমন্যতায় ভোগে। যে স্বতন্ত্রগুণ নিয়ে সে জন্মেছে, এগুলো তার নিকট অপমানজনক বিবেচিত হয়। আচরণে স্পর্শকাতরতা অপমানজনক, পড়াশোনা শেষে ফুল টাইম মা হওয়া লজ্জাজনক, ভাল রেজাল্ট করে ঘরে বসে থাকা অধঃপতন, বিয়ের পর কেবল ঘরে স্ত্রীর ভূমিকা রাখা বন্দিত্ব! এভাবে একজন নারী যখন মনে করে পুরুষদের যা আছে, তারা যা করতে পারে, তাদেরকে যা দেয়া হয়েছে—এগুলোই সর্বোত্তম, তখন তার অন্তরে এই নতুন লক্ষ্য গেড়ে বসে; সমপর্যায়ে থাকার লক্ষ্য। সে দাবী করে, যদি এগুলো একজন পুরুষ পেতে পারে, তাহলে আমারও এটা চাই। যদি পুরুষরা ওড়না ছাড়া চলতে পারে, তাহলে আমাকেও দিতে হবে। পুরুষরা ডিভোর্স দিতে পারে, তাহলে আমাকেও এ অধিকার দিতে হবে। যদি পুরুষরা ঘরের বাহিরে কাজ করতে পারে, তাহলে আমিও করতে চাই। যদি পুরুষরা আকাশে প্লেন চালাতে পারে, তাহলে আমিও চালাতে চাই। যদি পুরুষরা পাবলিক স্পিকার হতে পারে, তাহলে আমাকেও হতে হবে। যদি পুরুষরা অন্য দেশে ডিগ্রির জন্য যেতে পারে, তাহলে আমাকেও যেতে হবে। যদি পুরুষরা প্রেসিডেন্ট হতে পারে, তাহলে আমাকেও হতে হবে..ইত্যাদি। তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে; কারণ, পুরুষই স্ট্যান্ডার্ড! সে এসব করে ভাবে, সে স্বাধীন! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সে বন্দী।
এগুলো নষ্ট সমাজ ব্যবস্থার ফল। ছোট বেলা থেকেই মেয়ে শিশুদের মনে এই বীজ বুনে দেয়া হয়। পরিবেশ পরিস্থিতি তাকে এরকম করেই ভাবতে শেখায়। সে ভুলে যায়, কোথায় তার সম্মান-মর্যাদার খনী। জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা নির্ণয়ে কী হবে তার মানদণ্ড—এ নিয়ে সে থাকে দ্বিধায়। সত্যি বলতে, মেয়েরা এগুলো ভাবারও সুযোগ পায় না। ভাবার বয়সে পৌঁছানোর আগেই তাকে এসবে অভ্যস্ত করে ফেলা হয়।
এই রোগ এতটা মহামারি আকার ধারণ করেছে যে, দ্বীনে ফিরে আসার পরেও হিজাব পড়ে ভার্সিটির ছেলেদের সাথে চিল করা, তাদের সাথে আড্ডা দেয়া, ছেলে বন্ধু রাখা বা বয় ফ্রেন্ড থাকা, পুরুষদের সাথে জব করা, হিজাব পড়ে ফ্যাশন শো করা এবং এসবকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা—ইত্যাদি আমরা দেখতে পাচ্ছি দ্বীনি সমাজে, এসবের উৎপত্তি ঐ রোগ থেকেই। এটা তাদেরকে ধীরে ধীরে মডার্নিজমের দিকে নিয়ে যায়। তাদেরকে ভাবায়, ইসলাম নারীদের পূর্ণ অধিকার দেয় না, কাঠ মোল্লারা তাদেরকে এক ঘরে করে রাখে। মুফতিদের কাছে প্রশ্ন আসে- "ইসলামে নারীর অধিকার নিয়ে আমি কনফিউজড।"
তাহলে সমাধান কোথায়? সাহাবিরা যখন নতুন কোনো শহরে প্রবেশ করতেন, সর্বপ্রথম একটি দাওয়াহ নিয়ে যেতেন, ‘আমরা এসেছি তোমাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে নিতে।’ [আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ইবনু কাসীর]
একজন নারীর শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষ হবার মাঝে নয়। তার দেহের মূল্য কাগজের টাকা নির্ধারণ করতে পারে না। আল্লাহ্ একজন নারীকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর রঙ্গে রঙ্গিন হবার জন্য। এই পুঁজিবাদী, ভোগবাদী জীবন ব্যবস্থা স্বাধীনতার কথা বলে নারীকে সর্বদা ঠকাবে। পদে পদে তাকে ধোঁকা দেবে। ন্যায়বিচার তার কাছে পাবে না। সে সরলতার সুযোগ নিয়ে নারীকে বন্দী করবে। মুক্ত আকাশের কথা বলে তার বানানো অন্ধকার প্রাচীরেই ঘিরে ফেলবে। তাকে তার প্রোডাক্ট বানাবে। নারীর মস্তিষ্ককে তার কবজায় বন্দী করবে।
অপরদিকে যখন আমরা আল্লাহর বিধানকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করব, সর্বত্র তাঁর রসূলের এবং সাহাবাদের নীতি প্রয়োগ করব, তখন সমাজ থেকে যুলুম বিলুপ্ত হবে, নারী-পুরুষ সকলের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্ব ভিত্তি লিঙ্গ নয়, বরং তাকওয়া।
তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। অবশ্যই তিনি সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।" [সূরা হুজুরাত, ১৩]
তাকওয়া হচ্ছে নারী ও পুরুষদের মধ্যে সফলতার মানদণ্ড। মহান আল্লাহর আনুগত্য ও তার বিধিবিধান পালনের মাধ্যমে যে কোনো নারী আল্লাহর নিকটবর্তী হয় পাশাপাশি তাকওয়াবান পুরুষের মতো সমমর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে; পুরুষের সাথে সহাবস্থান করতে পারে। ফাতেমা (রা.) ছিলেন নারী জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিতকরণের এক বিপ্লবী পথপ্রদর্শক। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার সঙ্গে গরিব-দুঃখীকে দান-খয়রাত করাও ছিল তার বড় বৈশিষ্ট্য। নববি যুগের নারীরা ইসলাম, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও জ্ঞান অর্জনে উজ্জ্বল ঈর্ষণীয় ভূমিকা রেখেছেন। যার ধারাবাহিকতা সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় ১৩শ’ বছরের খিলাফত ব্যবস্থা তথা ইসলামি শাসনামলে হাজার হাজার মুসলিম নারী আইনবিদ, বিজ্ঞানী, বিচারক, গবেষক, জ্ঞানসাধক সর্বোপরি আদর্শ মা ও স্ত্রী হিসেবে ইসলাম, সমাজ ও জ্ঞান বিকাশে অনবদ্য অবদানের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
আল্লাহ্ নারীর জন্য খুলে রেখেছেন স্বাধীনতা দুয়ার, এনে দিয়েছেন নারীর হাতের নাগালে জান্নাত। কতই না সহজ উপায় রেখেছেন তিনি!
চবির দুই শিক্ষকের গবেষণার ফলাফল:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের প্রায় দুবছর ধরে চালানো এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক আইন বিষয়ক জার্নাল, ‘বাংলাদেশ জার্নাল অফ ল’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় চট্টগ্রামের ১৭৮ জন তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের তথ্য, পারিবারিক আদালতের নথি ও কাবিননামা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৫৬ শতাংশই তালাক দেন স্ত্রী। যাতে দেনমোহরের অংক ছিলো গড়ে ১২ লাখ টাকা। স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক দেয়ার হার ৪৪ শতাংশ। এক্ষেত্রে দেনমোহর সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা। যদিও শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিবাহ বিচ্ছেদ বা অস্বাভাবিক কাবিনের হার কম।
পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চশিক্ষিত, বিত্তশালী এবং শহরাঞ্চলে বসবাস করা নারীরাই বেশি বেছে নেয় বিবাহ বিচ্ছেদকে।
পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের দেশে তালাকে প্রভাব ফেলছে। পশ্চিমা সংস্কৃতি নারীর ব্রেইনে পুশআপ করেছে,আমি তো কোন অংশে কম না। তবে কেনো কম্পোমাইজে যাবো - ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাবো। বাহিরে থেকে ইউরোপীয়ান লাইফ যতোই চাকচিক্য দেখেন কিন্তু বাস্তবে তার ছিটেফোঁটা নেই। না আছে তাদের family bonding, relation bonding, child bonding. বেশিরভাগই তাদের লাইফ উৎসর্গ করেছে মদ,নারী আর ক্লাবিং এ। নারীরা গ্রহণ করছে, নারী স্বাধীনতার কথা বলে সবক্ষেত্রে পুরুষদের সমপর্যায়ে থাকার নীতি। Gender Discrimination বা নারী পুরুষের শারীরিক এবং মানসিক বৈষম্যকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা এবং এই বৈষম্য থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য; যুদ্ধে নামার মতো প্রোপাগান্ডায় সয়লাভ সমগ্র পৃথিবী। এ দ্বারা নারীকে বোঝানো হয়, তোমার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং পুরুষকে বোঝানো হয়, নারীদের রেস্পেক্ট করা হচ্ছে। সত্যিই কি তাই?
পাশ্চাত্যের নারীবাদীরা নারীর মস্তিষ্ক থেকে আল্লাহর অস্তিত্বই মুছে দিতে চায়। তারা পুরুষদের মাঝেই নিজেদের মূল্য খুঁজে নেয়, পুরুষই হচ্ছে উপযুক্ত মানদণ্ড। সে বিশ্বাস করে, একটি মেয়ে শিশু ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মতো মানুষ হতে পারবে না যতক্ষণ না সে পুরুষদের মতো সব করতে পারছে। সে ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীন নয়, যতক্ষণ সে পুরুষদের মতো সব পাচ্ছে কিংবা তার চেয়েও বেশী পাচ্ছে। কারণ এটাই মানদণ্ড। পুরুষরা যদি জিন্স প্যান্ট পড়তে পারে, তাকেও পড়তে হবে। পুরুষরা যদি আর্মিতে যেতে পারে, তাকেও আর্মিতে যেতে হবে। সে এগুলো চায় কারণ, মানদণ্ড! স্ট্যান্ডার্ড। সে এটা বুঝতে পারে না, আল্লাহ্ তা'আলা নারী-পুরুষ উভয়কেই স্বতন্ত্রভাবে সম্মানিত করেছেন। স্বতন্ত্রতার মাঝেই তাদের সম্মান রেখেছেন; একে অন্যের কার্বন কপি হবার মাঝে নয়।
একজন নারী যখন পুরুষকে তার স্ট্যান্ডার্ড বানায়, তখন থেকেই অন্তরে একটি সন্দেহ জেঁকে বসে- 'আমাকে ঠকানো হচ্ছে।' সে সবকিছুতে সন্দেহ করতে থাকে। এমনকি নিজের অস্তিত্ব নিয়েও কখনো কখনো হীনমন্যতায় ভোগে। যে স্বতন্ত্রগুণ নিয়ে সে জন্মেছে, এগুলো তার নিকট অপমানজনক বিবেচিত হয়। আচরণে স্পর্শকাতরতা অপমানজনক, পড়াশোনা শেষে ফুল টাইম মা হওয়া লজ্জাজনক, ভাল রেজাল্ট করে ঘরে বসে থাকা অধঃপতন, বিয়ের পর কেবল ঘরে স্ত্রীর ভূমিকা রাখা বন্দিত্ব! এভাবে একজন নারী যখন মনে করে পুরুষদের যা আছে, তারা যা করতে পারে, তাদেরকে যা দেয়া হয়েছে—এগুলোই সর্বোত্তম, তখন তার অন্তরে এই নতুন লক্ষ্য গেড়ে বসে; সমপর্যায়ে থাকার লক্ষ্য। সে দাবী করে, যদি এগুলো একজন পুরুষ পেতে পারে, তাহলে আমারও এটা চাই। যদি পুরুষরা ওড়না ছাড়া চলতে পারে, তাহলে আমাকেও দিতে হবে। পুরুষরা ডিভোর্স দিতে পারে, তাহলে আমাকেও এ অধিকার দিতে হবে। যদি পুরুষরা ঘরের বাহিরে কাজ করতে পারে, তাহলে আমিও করতে চাই। যদি পুরুষরা আকাশে প্লেন চালাতে পারে, তাহলে আমিও চালাতে চাই। যদি পুরুষরা পাবলিক স্পিকার হতে পারে, তাহলে আমাকেও হতে হবে। যদি পুরুষরা অন্য দেশে ডিগ্রির জন্য যেতে পারে, তাহলে আমাকেও যেতে হবে। যদি পুরুষরা প্রেসিডেন্ট হতে পারে, তাহলে আমাকেও হতে হবে..ইত্যাদি। তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে; কারণ, পুরুষই স্ট্যান্ডার্ড! সে এসব করে ভাবে, সে স্বাধীন! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সে বন্দী।
এগুলো নষ্ট সমাজ ব্যবস্থার ফল। ছোট বেলা থেকেই মেয়ে শিশুদের মনে এই বীজ বুনে দেয়া হয়। পরিবেশ পরিস্থিতি তাকে এরকম করেই ভাবতে শেখায়। সে ভুলে যায়, কোথায় তার সম্মান-মর্যাদার খনী। জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা নির্ণয়ে কী হবে তার মানদণ্ড—এ নিয়ে সে থাকে দ্বিধায়। সত্যি বলতে, মেয়েরা এগুলো ভাবারও সুযোগ পায় না। ভাবার বয়সে পৌঁছানোর আগেই তাকে এসবে অভ্যস্ত করে ফেলা হয়।
এই রোগ এতটা মহামারি আকার ধারণ করেছে যে, দ্বীনে ফিরে আসার পরেও হিজাব পড়ে ভার্সিটির ছেলেদের সাথে চিল করা, তাদের সাথে আড্ডা দেয়া, ছেলে বন্ধু রাখা বা বয় ফ্রেন্ড থাকা, পুরুষদের সাথে জব করা, হিজাব পড়ে ফ্যাশন শো করা এবং এসবকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা—ইত্যাদি আমরা দেখতে পাচ্ছি দ্বীনি সমাজে, এসবের উৎপত্তি ঐ রোগ থেকেই। এটা তাদেরকে ধীরে ধীরে মডার্নিজমের দিকে নিয়ে যায়। তাদেরকে ভাবায়, ইসলাম নারীদের পূর্ণ অধিকার দেয় না, কাঠ মোল্লারা তাদেরকে এক ঘরে করে রাখে। মুফতিদের কাছে প্রশ্ন আসে- "ইসলামে নারীর অধিকার নিয়ে আমি কনফিউজড।"
তাহলে সমাধান কোথায়? সাহাবিরা যখন নতুন কোনো শহরে প্রবেশ করতেন, সর্বপ্রথম একটি দাওয়াহ নিয়ে যেতেন, ‘আমরা এসেছি তোমাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে নিতে।’ [আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ইবনু কাসীর]
একজন নারীর শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষ হবার মাঝে নয়। তার দেহের মূল্য কাগজের টাকা নির্ধারণ করতে পারে না। আল্লাহ্ একজন নারীকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর রঙ্গে রঙ্গিন হবার জন্য। এই পুঁজিবাদী, ভোগবাদী জীবন ব্যবস্থা স্বাধীনতার কথা বলে নারীকে সর্বদা ঠকাবে। পদে পদে তাকে ধোঁকা দেবে। ন্যায়বিচার তার কাছে পাবে না। সে সরলতার সুযোগ নিয়ে নারীকে বন্দী করবে। মুক্ত আকাশের কথা বলে তার বানানো অন্ধকার প্রাচীরেই ঘিরে ফেলবে। তাকে তার প্রোডাক্ট বানাবে। নারীর মস্তিষ্ককে তার কবজায় বন্দী করবে।
অপরদিকে যখন আমরা আল্লাহর বিধানকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করব, সর্বত্র তাঁর রসূলের এবং সাহাবাদের নীতি প্রয়োগ করব, তখন সমাজ থেকে যুলুম বিলুপ্ত হবে, নারী-পুরুষ সকলের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্ব ভিত্তি লিঙ্গ নয়, বরং তাকওয়া।
তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। অবশ্যই তিনি সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।" [সূরা হুজুরাত, ১৩]
তাকওয়া হচ্ছে নারী ও পুরুষদের মধ্যে সফলতার মানদণ্ড। মহান আল্লাহর আনুগত্য ও তার বিধিবিধান পালনের মাধ্যমে যে কোনো নারী আল্লাহর নিকটবর্তী হয় পাশাপাশি তাকওয়াবান পুরুষের মতো সমমর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে; পুরুষের সাথে সহাবস্থান করতে পারে। ফাতেমা (রা.) ছিলেন নারী জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিতকরণের এক বিপ্লবী পথপ্রদর্শক। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার সঙ্গে গরিব-দুঃখীকে দান-খয়রাত করাও ছিল তার বড় বৈশিষ্ট্য। নববি যুগের নারীরা ইসলাম, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও জ্ঞান অর্জনে উজ্জ্বল ঈর্ষণীয় ভূমিকা রেখেছেন। যার ধারাবাহিকতা সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় ১৩শ’ বছরের খিলাফত ব্যবস্থা তথা ইসলামি শাসনামলে হাজার হাজার মুসলিম নারী আইনবিদ, বিজ্ঞানী, বিচারক, গবেষক, জ্ঞানসাধক সর্বোপরি আদর্শ মা ও স্ত্রী হিসেবে ইসলাম, সমাজ ও জ্ঞান বিকাশে অনবদ্য অবদানের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
আল্লাহ্ নারীর জন্য খুলে রেখেছেন স্বাধীনতা দুয়ার, এনে দিয়েছেন নারীর হাতের নাগালে জান্নাত। কতই না সহজ উপায় রেখেছেন তিনি!
✦আরও পড়ুন

নারী অঙ্গন
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার আনুগত্যের মাধ্যমে বিবাহিত জীবনে প্রশান্তি আসে
দাম্পত্য সুখ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্য দ্বারা সুরক্ষিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে…
✦ নারী অঙ্গন ✦ইরানে হিজাব বিতর্ক থেকে উদ্ভুত সরকার বিরোধী বিক্ষোভ ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ফসল
নারী অঙ্গন
ইরানে হিজাব বিতর্ক থেকে উদ্ভুত সরকার বিরোধী বিক্ষোভ ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ফসল
হিজাব আইন লঙ্ঘনের অপরাধে পুলিশের হাতে আটক ২২ বছর বয়সী তরূণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কতিপয় পশ্চিমা সেকুলার মিডিয়া এবং…
✦ নারী অঙ্গন ✦নরসিংদী রেলস্টেশনে তরুণীর অশালীন পোশাক পরিধান এবং শরীয়াগত কারণে এটা অপছন্দ করা
নারী অঙ্গন
নরসিংদী রেলস্টেশনে তরুণীর অশালীন পোশাক পরিধান এবং শরীয়াগত কারণে এটা অপছন্দ করা
নরসিংদী রেলস্টেশনে এক তরুণীকে হেনেস্তার ঘটনার কথা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আপনারা গত কয়েকদিন প্রত্যক্ষ করেছেন। আজ একজন মুসলিম নারী তার পোশাকের কারণে…