হযরত ইউসুফ (আঃ) · অধ্যায় ৫৮/৬০
(৪৮.৮) আয়াত সংখ্যা ৪২
আয়াত সংখ্যা ৪২:
(اذْكُرْنِيْ عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِيْنَ)
‘যে কারাবন্দী সম্পর্কে ইউসুফের ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, তাকে সে বলে দিল যে, তুমি তোমার মনিবের কাছে আমার কথা আলোচনা করো। কিন্তু শয়তান তাকে তা ভুলিয়ে দেয় ফলে তাঁকে কয়েক বছর কারাগারে থাকতে হয়’।
মালেক ইবনে দীনার, হাসান বাছরী, কা‘ব আল-আহবার, ওহাব বিন মুনাবিবহ ও অন্যান্য বিদ্বানগণের নামে এখানে বিষ্ময়কর সব তাফসীর বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আইয়ূব রোগভোগ করেন সাত বছর, ইউসুফ কারাভোগ করেন সাত বছর, বুখতানছর আকৃতি পরিবর্তনের শাস্তি ভোগ করেন সাত বছর’ (কুরতুবী)। আমরা বুঝতে পারি না আল্লাহর নবীগণের সাথে ফিলিস্তীনে ইহুদী নির্যাতনকারী নিষ্ঠুর রাজা বুখতানছরের তুলনা করার মধ্যে কি সামঞ্জস্য রয়েছে?
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, ইউসুফ যখন কারাবন্দী সাক্ষীকে উক্ত কথা বলেন, তখন তাকে বলা হয়, হে ইউসুফ! তুমি আমাকে ছেড়ে অন্যকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করলে? অতএব শাস্তি স্বরূপ আমি তোমার কারাভোগের মেয়াদ বাড়িয়ে দিলাম। তখন ইউসুফ কেঁদে উঠে বললেন, হে আমার পালনকর্তা! বিপদ সমূহের বোঝা আমার অন্তরকে ভুলিয়ে দিয়েছে। সেজন্য আমি একটি কথা বলে ফেলেছি। আর কখনো এরূপ বলব না’।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, জিবরীল কারাগারে প্রবেশ করলেন এবং ইউসুফকে বললেন, বিশ্বপালক তোমাকে সালাম দিয়েছেন এবং তোমাকে বলেছেন যে, ইউসুফ! তোমার কি লজ্জা হয়নি যে, তুমি আমাকে ছেড়ে মানুষের কাছে সুফারিশ করলে? অতএব আমার সম্মান ও উচ্চ মর্যাদার কসম! অবশ্যই আমি তোমাকে কয়েক বছর জেলে রাখব। ইউসুফ বললেন, এর পরেও কি তিনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন? জিব্রীল বললেন, হ্যাঁ আছেন। তখন ইউসুফ বললেন, তাহ’লে আমি কিছুরই পরোয়া করি না’।
অন্য একজন মুফাসসির বলেছেন, পাঁচ বছর জেল খাটার পরে এই ঘটনা ঘটে। ফলে শাস্তি স্বরূপ তাঁকে আরো সাত বছর জেল খাটতে হয়। এরপর তাঁর মুক্তির অনুমতি হয় এবং বাদশাহ স্বপ্ন দেখেন ও সেই অসীলায় তাঁর মুক্তি হয়’। এভাবে কেউ বলেছেন ১২ বছর, কেউ বলেছেন ১৪ বছর জেল খেটেছেন (ইবনু কাছীর)। তবে অধিকাংশের মতে ৭ বছর। আর কুরআনে রয়েছে কেবল بضع سنين যার অর্থ হ’ল কয়েক বছর, যা ৩ থেকে ৯ অথবা ১০ বছরের মধ্যে (কুরতুবী)।
মূলতঃ ইহুদী লেখকরা ইউসুফ (আঃ)-এর কারাভোগকে তাঁর অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রমাণ করার জন্য এরূপ গল্প বানিয়েছে। অথচ এটা আদৌ কোন অপরাধ নয়। কেননা ছহীহ হাদীছে এসেছে, ‘আল্লাহ মানুষের সাহায্যে অতক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ মানুষ মানুষের সাহায্যে থাকে’।[44] অতএব একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কাছে সাহায্য চাইবে এবং পরস্পরকে সাহায্য করবে, এটাই স্বাভাবিক এবং এতে অশেষ নেকী রয়েছে। কিন্তু অপরাধ হ’ল সেটাই যখন জীবিত ব্যক্তি কোন মৃত ব্যক্তি বা কোন বস্ত্তর কাছে সাহায্য চায়, অথচ তার কোন ক্ষমতা নেই। মুসলিম তাফসীরকারগণও এক্ষেত্রে ধোঁকায় পড়েছেন। এমনকি উক্ত মর্মে ইবনু আব্বাস (রাঃ) হ’তে রাসূলের নামে একটি হাদীছও বর্ণিত হয়েছে যে,
رحم الله يوسف لولم يقل الكلمة التي قالها ما لبث في السجن طول ما لبث، حيث يبتغي الفرج من عند غير الله-
‘ইউসুফের উপর আল্লাহ রহম করুন! যদি তিনি ঐ কথা না বলতেন যা তিনি কারা সাথীকে বলেছিলেন, তাহ’লে এত দীর্ঘ সময় তাঁকে কারাগারে থাকতে হতো না। কেননা তিনি কারামুক্তির জন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সাহায্য কামনা করেছিলেন’।[45] অথচ হাদীছটি মুনকার ও যঈফ এবং অত্যন্ত দুর্বল। যা থেকে কোন দলীল গ্রহণ করা যায় না (হাশিয়া কুরতুবী; ইবনু কাছীর)। এর বিপরীত ছহীহ হাদীছে আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
لولَبِثْتَ فى السِّجْنِ ما لَبِثَ يوسفُ لأَجَبْتُ الداعِيَ
‘ইউসুফ যতদিন জেল খেটেছেন, অতদিন যদি আমি জেল খাটতাম, তাহ’লে আমি বাদশাহর দূতের ডাকে সাড়া দিতাম’।[46] অন্য বর্ণনায় এসেছে,
لو كنت أنا لأسرعتُ الإجابةَ وما ابتغيتُ العذرَ
‘যদি আমি হ’তাম, তাহ’লে দ্রুত সাড়া দিতাম এবং কোনরূপ ওযর করতাম না’।[47]
বস্ত্ততঃ এটি ছিল নবী হিসাবে ইউসুফ (আঃ)-এর পরীক্ষা। আর নবীগণই দুনিয়াতে বেশী পরীক্ষিত হন, যা বহু ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।[48]
লেখকঃ প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
-------------------------------------------------------------------
[44] মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪ ‘ইল্ম’ অধ্যায়।
[45] কুরতুবী হা/৩৬৭০-৭১; ইবনু জারীর, ইবনু কাছীর, ত্বাবারাণী, ইবনু হিববান প্রভৃতি।
[46] বুখারী হা/৩৩৭২, ৩৩৮৭, ৪৬৯৪, ৬৯৯২; মুসলিম, নাসাঈ, আহমাদ; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৭০৫ ‘কিয়ামতের অবস্থা’ অধ্যায় ‘সৃষ্টির সূচনা ও নবীগণের আলোচনা’ অনুচ্ছেদ।
[47] আহমাদ হা/৯২৯৮ রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ), হাদীছ হাসান।
[48] সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩২৬৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৯৯৪-৯৬।
(اذْكُرْنِيْ عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِيْنَ)
‘যে কারাবন্দী সম্পর্কে ইউসুফের ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, তাকে সে বলে দিল যে, তুমি তোমার মনিবের কাছে আমার কথা আলোচনা করো। কিন্তু শয়তান তাকে তা ভুলিয়ে দেয় ফলে তাঁকে কয়েক বছর কারাগারে থাকতে হয়’।
মালেক ইবনে দীনার, হাসান বাছরী, কা‘ব আল-আহবার, ওহাব বিন মুনাবিবহ ও অন্যান্য বিদ্বানগণের নামে এখানে বিষ্ময়কর সব তাফসীর বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আইয়ূব রোগভোগ করেন সাত বছর, ইউসুফ কারাভোগ করেন সাত বছর, বুখতানছর আকৃতি পরিবর্তনের শাস্তি ভোগ করেন সাত বছর’ (কুরতুবী)। আমরা বুঝতে পারি না আল্লাহর নবীগণের সাথে ফিলিস্তীনে ইহুদী নির্যাতনকারী নিষ্ঠুর রাজা বুখতানছরের তুলনা করার মধ্যে কি সামঞ্জস্য রয়েছে?
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, ইউসুফ যখন কারাবন্দী সাক্ষীকে উক্ত কথা বলেন, তখন তাকে বলা হয়, হে ইউসুফ! তুমি আমাকে ছেড়ে অন্যকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করলে? অতএব শাস্তি স্বরূপ আমি তোমার কারাভোগের মেয়াদ বাড়িয়ে দিলাম। তখন ইউসুফ কেঁদে উঠে বললেন, হে আমার পালনকর্তা! বিপদ সমূহের বোঝা আমার অন্তরকে ভুলিয়ে দিয়েছে। সেজন্য আমি একটি কথা বলে ফেলেছি। আর কখনো এরূপ বলব না’।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, জিবরীল কারাগারে প্রবেশ করলেন এবং ইউসুফকে বললেন, বিশ্বপালক তোমাকে সালাম দিয়েছেন এবং তোমাকে বলেছেন যে, ইউসুফ! তোমার কি লজ্জা হয়নি যে, তুমি আমাকে ছেড়ে মানুষের কাছে সুফারিশ করলে? অতএব আমার সম্মান ও উচ্চ মর্যাদার কসম! অবশ্যই আমি তোমাকে কয়েক বছর জেলে রাখব। ইউসুফ বললেন, এর পরেও কি তিনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন? জিব্রীল বললেন, হ্যাঁ আছেন। তখন ইউসুফ বললেন, তাহ’লে আমি কিছুরই পরোয়া করি না’।
অন্য একজন মুফাসসির বলেছেন, পাঁচ বছর জেল খাটার পরে এই ঘটনা ঘটে। ফলে শাস্তি স্বরূপ তাঁকে আরো সাত বছর জেল খাটতে হয়। এরপর তাঁর মুক্তির অনুমতি হয় এবং বাদশাহ স্বপ্ন দেখেন ও সেই অসীলায় তাঁর মুক্তি হয়’। এভাবে কেউ বলেছেন ১২ বছর, কেউ বলেছেন ১৪ বছর জেল খেটেছেন (ইবনু কাছীর)। তবে অধিকাংশের মতে ৭ বছর। আর কুরআনে রয়েছে কেবল بضع سنين যার অর্থ হ’ল কয়েক বছর, যা ৩ থেকে ৯ অথবা ১০ বছরের মধ্যে (কুরতুবী)।
মূলতঃ ইহুদী লেখকরা ইউসুফ (আঃ)-এর কারাভোগকে তাঁর অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রমাণ করার জন্য এরূপ গল্প বানিয়েছে। অথচ এটা আদৌ কোন অপরাধ নয়। কেননা ছহীহ হাদীছে এসেছে, ‘আল্লাহ মানুষের সাহায্যে অতক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ মানুষ মানুষের সাহায্যে থাকে’।[44] অতএব একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কাছে সাহায্য চাইবে এবং পরস্পরকে সাহায্য করবে, এটাই স্বাভাবিক এবং এতে অশেষ নেকী রয়েছে। কিন্তু অপরাধ হ’ল সেটাই যখন জীবিত ব্যক্তি কোন মৃত ব্যক্তি বা কোন বস্ত্তর কাছে সাহায্য চায়, অথচ তার কোন ক্ষমতা নেই। মুসলিম তাফসীরকারগণও এক্ষেত্রে ধোঁকায় পড়েছেন। এমনকি উক্ত মর্মে ইবনু আব্বাস (রাঃ) হ’তে রাসূলের নামে একটি হাদীছও বর্ণিত হয়েছে যে,
رحم الله يوسف لولم يقل الكلمة التي قالها ما لبث في السجن طول ما لبث، حيث يبتغي الفرج من عند غير الله-
‘ইউসুফের উপর আল্লাহ রহম করুন! যদি তিনি ঐ কথা না বলতেন যা তিনি কারা সাথীকে বলেছিলেন, তাহ’লে এত দীর্ঘ সময় তাঁকে কারাগারে থাকতে হতো না। কেননা তিনি কারামুক্তির জন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সাহায্য কামনা করেছিলেন’।[45] অথচ হাদীছটি মুনকার ও যঈফ এবং অত্যন্ত দুর্বল। যা থেকে কোন দলীল গ্রহণ করা যায় না (হাশিয়া কুরতুবী; ইবনু কাছীর)। এর বিপরীত ছহীহ হাদীছে আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
لولَبِثْتَ فى السِّجْنِ ما لَبِثَ يوسفُ لأَجَبْتُ الداعِيَ
‘ইউসুফ যতদিন জেল খেটেছেন, অতদিন যদি আমি জেল খাটতাম, তাহ’লে আমি বাদশাহর দূতের ডাকে সাড়া দিতাম’।[46] অন্য বর্ণনায় এসেছে,
لو كنت أنا لأسرعتُ الإجابةَ وما ابتغيتُ العذرَ
‘যদি আমি হ’তাম, তাহ’লে দ্রুত সাড়া দিতাম এবং কোনরূপ ওযর করতাম না’।[47]
বস্ত্ততঃ এটি ছিল নবী হিসাবে ইউসুফ (আঃ)-এর পরীক্ষা। আর নবীগণই দুনিয়াতে বেশী পরীক্ষিত হন, যা বহু ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।[48]
লেখকঃ প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
-------------------------------------------------------------------
[44] মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪ ‘ইল্ম’ অধ্যায়।
[45] কুরতুবী হা/৩৬৭০-৭১; ইবনু জারীর, ইবনু কাছীর, ত্বাবারাণী, ইবনু হিববান প্রভৃতি।
[46] বুখারী হা/৩৩৭২, ৩৩৮৭, ৪৬৯৪, ৬৯৯২; মুসলিম, নাসাঈ, আহমাদ; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৭০৫ ‘কিয়ামতের অবস্থা’ অধ্যায় ‘সৃষ্টির সূচনা ও নবীগণের আলোচনা’ অনুচ্ছেদ।
[47] আহমাদ হা/৯২৯৮ রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ), হাদীছ হাসান।
[48] সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩২৬৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৯৯৪-৯৬।