মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

হযরত ইউসুফ (আঃ) · অধ্যায় ৫৯/৬০

(৪৮.৯) আয়াত সংখ্যা ৫২

আয়াত সংখ্যা ৫২:
(ذَلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ)

‘এটা এজন্য যাতে গৃহস্বামী জানতে পারেন যে, আমি তার অগোচরে তার সাথে কোন বিশ্বাসঘাতকতা করিনি’।

এখানে ‘আমি’ কে? গৃহকত্রী না ইউসুফ? বড় বড় মুফাসসিরগণ লিখেছেন, ইউসুফ। এজন্য ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর নামে একটি হাদীছ বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, বাদশাহ নগরীর মহিলাদের জমা করে তাদের কাছে ইউসুফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সবাই বলে যে, আমরা তার ব্যাপারে মন্দ কিছু জানি না। তখন আযীয-পত্নী বলেন, এখন সত্য প্রকাশিত হ’ল। আমিই তাকে প্ররোচিত করেছিলাম এবং সে ছিল সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। তখন ইউসুফ বলল, এটা এজন্য যাতে গৃহকর্তা জানতে পারেন যে, আমি তার অসাক্ষাতে তার সাথে কোন বিশ্বাসঘাতকতা করিনি’। তখন জিবরীল ইউসুফকে গুঁতা মেরে বলেন, যখন ঐ নারীর প্রতি তুমি কুচিন্তা করেছিলে তখনও কি নয়? অর্থাৎ তখন কি তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করো নি? জবাবে ইউসুফ বলেন, আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয়ই মানুষের অন্তর মন্দ প্রবণ’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, জিবরীল ইউসুফকে বলেন, যখন তুমি পায়জামা খুলেছিলে, তখনও কি বিশ্বাসঘাতকতা করোনি? ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলি যে স্রেফ বাজে কথা, তা যেকোন পাঠকই বুঝতে পারেন। অথচ এগুলি এমন এমন তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, যা সব সময় আমরা মাথায় রাখি।[49]

বস্ত্ততঃ ৫০, ৫১, ৫২ ও ৫৩ চারটি আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্ক বিচার করলে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, ৫২ ও ৫৩ আয়াতের বক্তব্য হ’ল আযীযে মিছরের স্ত্রীর। কেননা ঐ সময় ইউসুফ ছিলেন জেলখানায়। তিনি কিভাবে মহিলাদের ঐ মজলিসে হাযির থাকলেন এবং উক্ত মন্তব্য করলেন? নগরীর মহিলাদের ও আযীয-পত্নীর স্পষ্ট স্বীকৃতির মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের পরেই তো ইউসুফের মুক্তির পথ খুলে গেল এবং বাদশাহ বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে আমার একান্ত সহচর করে নেব (ইউসুফ ৫৪)। কুরআনের প্রকাশ্য অর্থকে পাস কাটিয়ে দূরতম অর্থ গ্রহণের পিছনে নবী বিদ্বেষী ইহুদী লেখকদের অপপ্রচারের ফাঁদে পা দেওয়া ছাড়া এগুলি আর কীইবা হ’তে পারে?

প্রাচীনতম মুফাসসির হিসাবে ইবনু জারীর ত্বাবারী (মৃঃ ৩১০ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত তাফসীরে এমন অনেক দুর্বল বর্ণনা জমা করেছেন, যা নবীগণের মর্যাদার খেলাফ। রাসূল (ছাঃ), ছাহাবী, তাবেঈ ও অন্যান্য বিদ্বানগণের নামে সেখানে অসংখ্য যঈফ ও ভিত্তিহীন বর্ণনা জমা করা হয়েছে।

যেমন ২৪ আয়াতাংশ (وَلَقَدْ هَمَّتْ به وَهَمَّ بِهَا) -এর তাফসীরে ইবনু আব্বাসের ৮টি সহ ছয়জন বিদ্বানের মোট ১৪টি উক্তি উদ্ধৃত করার পর তিনি বলেছেন,

ذا قول جميع أهل العلم بتأويل القرآن الذين عنهم يؤخذ تأويله

‘এগুলি হ’ল কুরআন ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ সেই সকল বিদ্বানের ব্যাখ্যা সমূহ, যাঁদের থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়ে থাকে’।[50] অথচ এসব বিদ্বানগণের নামে উদ্ধৃত বক্তব্যগুলি বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত বলে পরবর্তী বিদ্বানগণ স্বীকার করেননি।

এভাবে প্রধানতঃ ইবনু জারীরের তাফসীরের উপরে ভিত্তি করেই পরবর্তী বহু খ্যাতনামা মুফাসসির ঐসব ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনা অথবা এ সবের মর্ম সমূহ স্ব স্ব তাফসীরে স্থান দিয়েছেন। যেমন ওয়াহেদী, বাগাভী, কুরতুবী, ইবনু কাছীর, জালালায়েন, বায়যাভী, কাশশাফ, আলূসী, আবুস সঊদ, শাওকানী প্রমুখ বিদ্বানগণ। যদিও তাঁদের অনেকেই এসবের সমর্থক ছিলেন না। তবুও তাঁদের তাফসীরে এসব বর্ণনা স্থান পাওয়ায় লোকেরা তাঁদের নামে সেগুলি অন্যদের নিকট বর্ণনা করে এবং জনগণ বিভ্রান্ত হয়। অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই যে, নবীগণের শত্রু হিব্রুভাষী ইহুদী যিন্দীক্বদের কপট লেখনীগুলো আরবী ভাষী মুসলিম বিদ্বানগণের মাধ্যমে বিশ্বের সর্বত্র প্রচারিত হয়েছে। বিদ্বানগণের সরলতা এভাবেই অনেক সময় অন্যদের পথভ্রষ্টতার কারণ হয়।

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,

وأما ما ينقل أنه حل سراويله وجلس مجلس الرجل من المرأة وأنه رأى صورة يعقوب عاضاً على يده وأمثال ذلك فكله مما لم يخبر الله به ولا رسوله و مالم يكن كذلك فهو مأخوذ عن اليهود الذين هم أعظم الناس كذبًا على الأنبياء وقدحاً فيهم، وكل من نقله من المسلمين فعنهم نقله، لم ينقل من ذلك أحد عن نبينا صلى الله عليه وسلم حرفاً واحداً-

‘অতঃপর যেসব কথা বর্ণিত হয়েছে যে, ইউসুফ তার পাজামা খুলে ফেলেছিলেন ও উক্ত নারীর উপর উদ্যত হয়েছিলেন এবং এ সময় তিনি তার পিতাকে দাঁতে নিজ আঙ্গুল কামড়ে ধরা অবস্থায় দেখেছিলেন- এধরনের কাহিনী সমূহের সবটাই ঐসমস্ত কথার অন্তর্ভুক্ত, যে বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কোন খবর দেননি। আর তা আদৌ ঐরূপ নয়। বরং এগুলি ইহুদীদের কাছ থেকে গৃহীত, যারা নবীগণের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও অপবাদ দেওয়ার ব্যাপারে মানবজাতির মধ্যে সেরা। মুসলমানদের মধ্যে যারা এসব বিষয়ে বলে, তারা তাদের থেকে নকল করে বলে। অথচ তাদের কেউ এ বিষয়ে আমাদের নবী (ছাঃ) থেকে একটি হরফও বর্ণনা করেনি’।[51] তিনি আরও বলেন,

وقد اتفق الناس على أنه لم تقع منه الفاحشة ولكن بعض الناس يذكر أنه وقع منه بعض مقدماتها-

‘বিদ্বানগণ এ বিষয়ে একমত যে, ইউসুফ থেকে কোন ফাহেশা কাজ হয়নি। তবে কিছু লোক বর্ণনা করে যে, তাঁর থেকে উক্ত কাজের প্রারম্ভিক কিছু নমুনা পাওয়া গিয়েছিল। যেমন তারা এ বিষয়ে কিছু বর্ণনা করে থাকে। যার কোনটাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে নয়। বরং কিছু ইহুদী থেকে তারা এগুলি বর্ণনা করে থাকে মাত্র’।[52]

উল্লেখ্য যে, সূরা ইউসুফ-এর ৪২ আয়াতটিকে লুফে নিয়ে একদল কাহিনীকার কল্পনার ঘোড়া দৌড়িয়ে এমনকি মহাকাব্য পর্যন্ত রচনা করেছেন। এ ব্যাপারে ফারসী ভাষায় কবি ফেরদৌসীর (মৃঃ ৪১৬ হিঃ/১০২৫ খৃঃ) ‘মাছনাবী ইউসুফ-যোলেখা’ (مثنوى يوسف زليخا) কাব্য প্রসিদ্ধ। যদিও এটি তাঁর সময়কার অজ্ঞাত কোন কবির লেখনী বলে অনেকে ধারণা করেন। তারপর তা তুর্কী ভাষায় অনুদিত হয়। অতঃপর ফারসী ও তুর্কী ভাষা হ’তে তা এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত ও রূপান্তরিত হয়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। দিল্লীর সুলতান গিয়াছুদ্দীন আযম শাহের সময় (১৩৮৯-১৪১০ খৃঃ) পনের শতকের প্রথম মুসলিম কবি শাহ মুহাম্মাদ ছগীর সম্ভবতঃ সর্বপ্রথম বাংলায় ‘ইউসুফ-জুলেখা’ কাব্য রচনা করেন। বর্তমানে নামধারী কিছু মুফাসসিরে কুরআন গ্রামে ও শহরে তাফসীর মাহফিলের নামে কয়েকদিন ব্যাপী ইউসুফ-যুলায়খার রসালো কাহিনী শুনিয়ে থাকেন। অথচ ‘যুলায়খা’ নামটিরও কোন সঠিক ভিত্তি নেই। কুরআনে কেবল امرأة العزيز বা ‘আযীয-পত্নী’ বলা হয়েছে। নবী বিদ্বেষী ইহুদী গল্পকারদের খপ্পরে পড়ে মুসলমান গল্পকারগণ আজকাল রীতিমত মুফাসসিরে কুরআন বনে গেছেন।

অতএব জান্নাত পিয়াসী পাঠক, গবেষক, লেখক, আলেম, মুফতী ও বক্তাগণকে অবশ্যই সাবধান হ’তে হবে এবং মন্দটা বাদ দিয়ে ভালটা বাছাই করে নিতে হবে। নইলে ক্বিয়ামতের মাঠে জওয়াবদিহিতার সম্মুখীন হ’তে হবে। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন- আমীন!

[আলোচনা দ্রষ্টব্যঃ ইবনু তায়মিয়াহ, মজমূ‘ ফাতাওয়া ‘তাফসীর’ অধ্যায়; মুহাম্মাদ আল-আমীন শানক্বীত্বী, তাফসীর আযওয়াউল বায়ান (বৈরুত: ‘আলামুল কুতুব, তাবি); ডঃ মুহাম্মাদ আবু শাহবাহ, আল-ইস্রাঈলিয়াত (কায়রোঃ মাকতাবাতুস সুন্নাহ ৪র্থ সংস্করণ ১৪০৮); ডঃ তাহের মাহমূদ, আসবাবুল খাত্বা ফিত তাফসীর (দাম্মাম, সঊদী আরব, দার ইবনুল জাওযী ১ম সংস্করণ ১৪২৫ হিঃ) প্রভৃতি]

লেখকঃ প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
-------------------------------------------------------------------
[49] যেমন ১-সঊদী সরকার প্রকাশিত ও মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত করাচীর মুফতী মুহাম্মাদ শফী কৃত তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআনে বক্তব্যটি ইউসুফের বলে লেখা হয়েছে (পৃঃ ৬৬৯)। ২-ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বঙ্গানুবাদে ১৩১ নং টীকাতে বলা হয়েছে যে, অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে ৫২ ও ৫৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত কথাগুলি হযরত য়ূসুফের উক্তি (ঐ, পৃঃ ৩৬৭)। ৩- তাফসীর ইবনে কাছীরের অনুবাদে ডঃ মুজীবুর রহমান ব্রাকেটে লিখেছেন, ‘ইউসুফ বললেন’ (ঐ, দারুস সালাম, রিয়াদ পৃঃ ৪৫৫)। ৪- মাওলানা মুহাম্মাদ জুনাগড়ী অনূদিত ঐ উর্দূ তাফসীরে একই অনুবাদ করা হয়েছে, যা সঊদী সরকার কর্তৃক পাকিস্তানের ছালাহুদ্দীন ইউসুফের তাফসীর সহ প্রকাশিত হয়েছে (ঐ, পৃঃ ৬৫৬)। ৫- সঊদী সরকার প্রকাশিত ইংরেজী অনুবাদেও (পৃঃ ৩১০) একই কথা লেখা হয়েছে। ৬- অথচ আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী তাঁর ইংরেজী তাফসীরে সঠিক অর্থ করেছেন (ঐ, পৃঃ ৫৭০)। ৭- অন্যদিকে মাওলানা মওদূদী কেবল এটি ইউসুফের উক্তি বলে সমর্থনই করেননি, উল্টা এর বিরোধিতা করার কারণে ইবনু তায়মিয়াহ, ইবনু কাছীর প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত বিদ্বানগণকে কটাক্ষ করে তাফসীর লিখেছেন (ঐ, বঙ্গানুবাদ ৬/১০৪ পৃঃ)। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।
[50] দ্রঃ তাফসীর ত্বাবারী (বৈরুতঃ ১৪০৭/১৯৮৭) ১২/১০৮-১১০ পৃঃ।
[51] দাক্বায়েকুত তাফসীর ৩/২৭৩ পৃঃ।
[52] মাজমূ‘ ফাতাওয়া ‘তাফসীর’ অধ্যায় (কায়রোঃ ১৪০৪ হিঃ) ১৫/১৪৮-৪৯ পৃঃ।