মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

এক ফোঁটা জল · অধ্যায় ৫/৯

পার্ট - ০৫

ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছে দু’বোন। সকালে উঠে সায়রা দেখে এখনও রুহির চোখের কোণে পানি চিক চিক করছে, ঘুমের মধ্যেও কাঁদছে সে! রুহির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয় সায়রা, কেন যে এমন করছে মেয়েটা! দাদার ভয়েই কিনা কে জানে। ওর হাতের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে রুহি। রাতের ঘটনা মনে পড়তেই ওর চেহারাটা আবার দুমরে মুচড়ে আসে। দ্রুত নিজেকে সামলায় সে। উঠে বসে সায়রার দুহাত ধরে বলে, ‘লক্ষ্মী বোন আমার, গতরাতের ঘটনাটা কাউকে বলবি না, কাউকে না, চাচীকেও না, ওয়াদা কর!’

ওর চোখে গভীরভাবে তাকিয়ে সায়রা বলে, ‘আচ্ছা। কিন্তু আমাকে বলবি তুই এমন করছিস কেন?’

রুহির দুগাল বেয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হয়, ‘আমার বাবা-মায়ের কথা আমার তেমন বিশেষ কিছুই মনে পড়েনা। শুধু আবছা আবছা মনে পড়ে আমার মাথা নীচে, পা ওপরে, ভীষণ ব্যাথা সারা গায়ে, মায়ের মুখটা আমার কাছাকাছি, চোখ দু’টো স্থির নিশ্চল, আমার দিকে চেয়ে রয়েছে, পুরো মুখে রক্ত, বাবা গোঙ্গাচ্ছে, হাত বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে আমার দিকে, কিন্তু বাবাও ঝুলে আছে আমার মত, কিছুতেই নাগাল পাচ্ছেনা আমার। সেই পাঁচ বছর বয়সে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে এতিম হয়ে আমি ঘুরতে লাগলাম একবার নানীর বাসায়, একবার খালার বাসায়, একবার মামার বাসায়। ওদের মায়া ছিল, কিন্তু সামর্থ্য ছিলোনা আমাকে প্রতিপালনের, নিজেরাই যেখানে জীবনযুদ্ধে পিছু হটে যাচ্ছে বার বার সেখানে আমার জন্য ওরা কি করতে পারত? একদিন এক মায়াবতী এলেন। তখন আমার বয়স সাত, তাই কিছু কিছু মনে পড়ে। উনি আমার নানী, খালা, মামীদের সাথে অনেক কথা বললেন, বার বার তাঁদের আশ্বস্ত করলেন, তারপর আমাকে নিয়ে এলেন এই বাড়ীতে। বাড়ীতে এসে পৌঁছনোর সাথে সাথে দাদার সে কি হুঙ্কার! মায়াবতী কোন জবাব দিলেন না, পুরো সময়টা আমাকে জড়িয়ে রাখলেন তাঁর বুকের ভেতর। এভাবেই তিনি আমাকে আগলে রেখে চলেছেন এতগুলো বছর ধরে। তাহলে আমি কিভাবে তাঁর বুকে ছুরি বসাতে পারি? তাঁর একটাই ছেলে। তাঁর অধিকার রয়েছে নিজের একমাত্র ছেলেকে নিজের পছন্দমত মেয়ে দেখে বিয়ে করানোর। এই অধিকারে আমি কিছুতেই হাত দিতে পারিনা, তাতে যার বুক ফাটে ফাটুক। তোকে আবার অনুরোধ করছি, তুই কোনভাবেই গতরাতের কথা কাউকে বলবিনা, চাচীকে তো অবশ্যই না। কি, এটুকু করতে পারবিনা আমার জন্য?’

সায়রার চোখে তখন প্লাবন, বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে সে কান্নায়, শুধু রুহিকে জড়িয়ে ধরে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো, বলতে পারলনা কিছুই।