মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

এক ফোঁটা জল · অধ্যায় ৬/৯

পার্ট - ০৬

‘বাবা, আজ থেকে বারো বছর আগে আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি কোন সাহসে মেয়েটাকে আপনার বাসায় নিয়ে এলাম। আমি কোন জবাব দেইনি। আজ বলব। আজ আমাকে বলতেই হবে। শুনবেন?’

শ্বশুরমশায় নড়েচড়ে বসেন, ‘বল।’

‘আচ্ছা বলুন তো, ফারুককে আমি কত দিনই বা দেখেছি। আমার বিয়ের বছর দুই পরেই তো সে লেখাপড়া করতে শহরে চলে গেল। গিয়ে মুনিরাকে বিয়ে করল’।

‘খবরদার!’, ধমকে ওঠেন বৃদ্ধ, ‘ঐ মেয়ের নাম আমার সামনে নেবেনা!’

পিছিয়ে যায় বড় বৌ, কিন্তু বড় ছেলে এগিয়ে আসে, ‘কেন বাবা? সে গরীবের মেয়ে বলে? সে কি একদম ফেলনা টাইপের মেয়ে ছিল? না, সে ছিল মেধাবী এবং লেখাপড়া জানা, শুধু পয়সা ছিলোনা ওদের। সে তো আমার ভাইয়ের সাথে প্রেম করেনি বাবা। ফারুক নিজেই ওর বাবার কাছে প্রস্তাব দিয়ে ওকে বিয়ে করেছে। আপনাকে জানায়নি কেন? হয়ত আপনি যদি বুঝদার হতেন সে নির্ভয়ে আপনাকে জানাতে পারত। কেন জানায়নি সেটা তো আপনি নিজেই পদে পদে প্রমান করেছেন’।

বৃদ্ধ মুখ নীচু করে রাখেন।

‘বাবা, আপনি বলুন, আপনি বিয়ের খবর শুনে কি করলেন? আপনি বললেন কেউ ওদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখবেনা। আপনি আর কোনদিন ওদের মুখ দেখবেন না। ব্যাস, দেখলেন না। ওরা অর্থকষ্টে জর্জরিত ছিলো, আপনি জেনেও সাহায্য করেননি। ওদের সন্তান হোল, কিন্তু আপনার মন গললনা, আপনি নিজেও গেলেন না, আমাদেরও কাউকে যেতে দিলেন না। ওদের গাড়ী অ্যাক্সিডেন্ট হোল, মুনিরা ঘটনাস্থলে মারা গেল, ফারুক গুরুতর আহত হোল, হয়ত ভাল চিকিৎসা পেলে ওকে বাঁচানো যেত, কিন্তু আপনি আপনার জেদের ওপর অটল রইলেন। আমি লুকিয়ে কিছু টাকা পাঠালাম, আপনি জানতে পেরে আমার টাকা পয়সা বন্ধ করে দিলেন। যেটুকু পাঠিয়েছিলাম সেটা ওকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট ছিলোনা। আমার ভাইটা মরে গেল। আপনার টাকা পথের কুকুরে খায়, অথচ আমার ভাইটা টাকার অভাবে মারা গেল’, গলা ধরে আসে তাঁর, তবু বলতে থাকেন, ‘ওদের মেয়েটার প্রতি পর্যন্ত আপনার কোন মায়াদয়া হোলনা। মেয়েটা একেকবার একেকজনের বাসায় ঘুরতে লাগল। বাবা, ওদের পয়সা ছিলোনা, কিন্তু ওদের আত্মা ছিল। ওদের সন্তানকে ওরা কষ্ট হলেও ফেলে দেয়নি’।

বাবা খোঁচাটা ধরতে পারলেন, কিন্তু কথা সত্য, সুতরাং তিনি কোন উত্তর দিলেন না।

স্বামীর রুদ্ধকন্ঠ দেখে সাহস করে বড়বৌ আবার এগিয়ে এলেন, ‘বাবা, আমি ওদের মেয়েটাকে নিয়ে এলাম দুবছর পর। মুনিরাকে আমি কোনদিন দেখিনি, ফারুকের সাথেও আমার সেভাবে ভাব হয়নি কোনদিন। তাহলে আমি ওকে কেন নিয়ে এসেছিলাম আপনি জানেন?’

বৃদ্ধ কৌতুহলী হয়ে মুখ তুলে তাকালেন, ‘কেন?’

‘আপনার জন্য!’

শ্বশুরমশায় হা হয়ে গেলেন, ‘মানে?’

‘বাবা, ওর শরীরে আপনার রক্ত। আপনার সন্তানের শেষ স্মৃতিচিহ্ন সে। আপনি যতই অস্বীকার করুন, আপনার ওপর আমার সাদ বা সায়রার যেমন অধিকার আছে, রুহিরও অধিকার আছে। আপনি সকাল বিকাল মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন, বসে বসে তিলাওয়াত করেন, ‘ফাজালিকাল্লাজি ইয়াদু’উল ইয়াতীম’। তারপর ঘরে ফিরে আপনি একজন অসহায় এতিমকে বঞ্চিত করেন, তার প্রতি সামান্য সহানুভূতিও দেখান না। আপনি কি মনে করেন এর জন্য আপনাকে জবাবদিহি করতে হবেনা? আমি আপনাকে রক্ষা করার জন্য ওকে নিয়ে এসেছি। এখানে আমার কোন স্বার্থ নেই’।

বৃদ্ধের চোখের দু’কোণে অশ্রু জমে। পেছন ফিরে নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে তিনি শুধু টাকা আর অহংকার ছাড়া কিছুই খুঁজে পাননা। তাঁর ছেলেরা পারতপক্ষে তাঁর সাথে কথা বলতে চায়না, বৌরা লুকিয়ে লুকিয়ে থাকে, নাতিনাতনীরা থাকে দূরে দূরে। ছেলে এবং বৌয়ের দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন এর জন্য তিনিই দায়ী।

সত্য মনে মনে স্বীকার করে নিলেও, স্বভাব কি সহজে বদলানো যায়? তিনি চেহারায় ঈষৎ বিরক্তির ভাব এনে বড় বৌয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে বল, তুমি এখন কি মনে করে আজ এত বছর পর এই প্রসঙ্গ তুললে?’

বড় বৌ বললেন, ‘বাবা, রুহি আপনার নিজের রক্ত, অথচ এতিম বলে আপনি ওর প্রতি একটুও মায়া করেননি। আজ বারো বছরেও আপনি কোনদিন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেননি, সায়রা ওকে ভালবাসে বলে আপনি সায়রার ওপরেও বিরক্ত। কদিন পর মেয়েটার বিয়ে হবে। নিজের বাড়ীতেই যদি ওর কোন আদর না থাকে, শ্বশুরবাড়ীতে ওকে কতটুকু কদর করবে? আপনিই যদি ওর সাথে এমন ব্যাবহার করেন, তাহলে ওর শ্বশুরবাড়ীর লোকজন ওর সাথে কেমন ব্যাবহার করবে? …’

দাদার ঘরে চেঁচামেচি শুনে ঘরের লোকজন তাঁর ঘরের সামনে থেকে ছুটে পালাতে থাকে, দাদা কার সাথে চিৎকার করছেন সেটা বোঝা যাচ্ছেনা, কারণ অন্য পক্ষ এত শান্ত গলায় কথা বলছে যে বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছেনা। বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে বড়চাচা আর বড়চাচী বেরিয়ে আসেন। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় দাদা মাথা নুইয়ে বসে আছেন, জানালা থেকে আলো এসে তাঁর গাল বেয়ে চুঁইয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুতে ঠিকরে পড়ে ঝিলিক তুলেছে। এমন দৃশ্য এর আগে কেউ কোনদিন দেখেনি, তাই সবাই ভয় ভুলে চেয়ে থাকে এই অভাবনীয় দৃশ্যের দিকে।