মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

আরজ আলী সমীপে - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ১১/১৩

(১১) বিবিধ

বিবিধঃ

‘বিবিধ’ অংশটি আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের সত্যের সন্ধান বইয়ের সর্বশেষ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে মাতুব্বর সাহেব প্রথম যে প্রশ্নটি করেছেন, সেটি নিয়ে লিখতে গেলে ভলিউমের পর ভলিউম বই লেখা যাবে, কিন্তু শেষ হবে না। অংশটির নাম—‘বিবর্তনবাদ’। বলা হয়, আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা এবং প্রতারণার নাম হলো ‘বিবর্তনবাদ’। তিনি লিখেছেন, ‘আদম কী আদিমানব?’

আদম (আঃ) আদিমানব কি না এই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় তিনি জীববিজ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেছেন। জীবাশ্মবিদদের কথা উল্লেখ করেছেন। পৃথিবীর প্রথম প্রাণী কখন এল, কীভাবে এল ইত্যাদি আলোচনা নিয়ে হাজির হয়েছেন। উনি বলেছেন, জীবতত্ত্ববিদদের মতে, জীবসৃষ্টির শুরুতে অতিক্ষুদ্র এক কোষবিশিষ্ট জীব ‘অ্যামিবা’ থেকে ক্রমবিবর্তন ও ক্রমবিবর্ধনের ফলে প্রথমে ব্যাক্টেরিয়া, সেখান থেকে স্পঞ্জ, মৎস, সরীসৃপ, পশু ইত্যাদি বহু জীবে রূপান্তরিত হয়ে শেষে ‘বন মানুষ’ তথা Anthorpoidape এবং তাদের ক্রমোন্নতির ফলে বর্তমান সভ্য মানুষ এসেছে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার বছর পূর্বে।

বিবর্তনবাদের আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু খুচরা আলাপ সেরে নেওয়া জরুরি মনে করছি।

বিবর্তনবাদীরা, বিশেষ করে বিবর্তনবাদকে যারা সৃষ্টিতত্ত্বের বিপরীতে দাঁড় করাতে চায়, তারা ‘বিবর্তনবাদ’ শব্দটাকে এমনভাবে বলে, যেন এটা একেবারে গাছ থেকে আপেল পড়ার মতো সত্য কোনো জিনিস।

‘বিবর্তন’ শব্দটা অন্য দশটি শব্দের মতো খুব সাধারণ একটি শব্দ। ধর্ম বলতে যেমন যেকোনো ধর্মকে বোঝাতে পারে, প্রাণী বলতে যেমন যেকোনো প্রাণীকে বোঝাতে পারে, মানুষ বলতে যেমন পৃথিবীর যেকোনো ধর্মের, যেকোনো বর্ণের মানুষকে বোঝাতে পারে, ঠিক তেমনই ‘বিবর্তন’ বলতেও সব ধরনের ‘বিবর্তন’কে বোঝাতে পারে। এখন যে কেউ প্রশ্ন করতে পারে বিবর্তন কত প্রকারের হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আপনাকে আগে ‘বিবর্তন’ শব্দের অর্থটা ভালোভাবে বুঝতে হবে। বিবর্তন বলতে আসলে কী বোঝায়?

‘বিবর্তন’ অর্থ পরিবর্তন বা ক্ৰমবিকাশ। অর্থাৎ, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তরণ হওয়াকেই মূলত বিবর্তন বলা হয়। এই ‘বিবর্তন’ শব্দটাকে বিভিন্ন অর্থে প্রয়াোগ করা যায়। এর অর্থ নির্ভর করছে আপনি আসলে এই শব্দটাকে কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন এর ওপর। যেমন : শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের ফলে মাতৃগর্ভে একটি পূর্ণাঙ্গ মানব ভূণের জন্ম, ক্ষুদ্র একটি বীজ থেকে একটি মহিরুহ বৃক্ষের আবির্ভাব, ইট-বালি-সিমেন্ট ইত্যাদির মিশেলের ফলে দৃষ্টিনন্দন দালানকোঠা ইত্যাদি তৈরিকে আপনি বিবর্তন বলতে পারেন। কারণ, এখানে বিভিন্ন উপাদানের মিশেলের ফলে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় উত্তরণ ঘটছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ সমস্ত বিবর্তন একদম দিনের মতোই সত্য। এসবের ব্যাপারে কারও কোনো প্রশ্ন নেই, আপত্তি নেই। কেউ কখনো এসবের পক্ষে প্রমাণও দেখতে চায় না।

অন্যদিকে চার্লস ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনবাদ তত্ত্ব (Theory OF Evolution) হচ্ছে এমন একটি তত্ত্ব, যেখানে ‘বিবর্তন’ অর্থ হলো বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে, একটি মাত্র অণুজীব থেকে এলোমেলো পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পুরো প্রাণিজগৎ এবং উদ্ভিদজগৎ বিবর্তিত হয়েছে।

একটিমাত্র এককোষী অণুজীব থেকে এলোমেলো পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে পুরো উদ্ভিদজগৎ এবং প্রাণিজগতের বিবর্তন এবং ওপরে আলোচ্য বিবর্তন কখনোই এক নয়। ওপরের আলোচ্য বিবর্তনের পক্ষে কোনো প্রমাণাদির দরকার পড়ে না, অন্যদিকে ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে, বিবর্তনবাদের পক্ষে কোনো প্রমাণ না থাকলে পৃথিবীর এতগুলো বিজ্ঞানী তাহলে বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করে কেন? তারা কি বিজ্ঞান বোঝেন না? তারা কি ঘাস খান?

জি। আবারও জোরালোভাবে দাবি করছি, বিবর্তনবাদের পক্ষে বিবর্তনবাদীরা কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ হাজির করতে পারে না। তারা আজ পর্যন্ত যে সমস্ত পরোক্ষ প্রমাণ আমাদের সামনে বা মিডিয়ার সামনে হাজির করেছে, তাও গোঁজামিল এবং কপটতায় ভরপুর। মিসিং লিঙ্ক (Missing Link), জাঙ্ক ডিএনএ (Junk DNA) সহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ভণ্ডামি বার বার আমাদের সামনে এসেছে। তবুও বীরদর্পে বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানমহলে টিকে আছে। কেন টিকে আছে সেটা জানতে হলে আপনাকে এর পেছনের পলিটিক্সটা জানতে হবে। বস্তুবাদকে পৃথিবীতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র এই ‘বিবর্তনবাদ’। ধর্মগুলো মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা, অনন্য হিসেবে দাবি করে থাকে। ধর্মের দাবি, পৃথিবীর সমস্ত কিছু মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আর, এই পৃথিবীই মানুষের জন্য শেষ সময় নয়। পৃথিবীর পাঠ চুকিয়ে তাকে চলে যেতে হবে অনন্ত, অসীম এক সময়ের অধীনে। অন্য একটি জগতে। সেমেটিক ধর্মগুলোর মতে, এটি হলো পারলৌকিক জগৎ। সেই জগতে তার পাপ-পুণ্যের হিসাব দিতে হবে।

কিন্তু বস্তুবাদ তথা ডারউইনবাদ যা ধারণা দেয়, তা থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ আসলে বিশেষ কোনো সৃষ্টি নয়। সে একটি ক্ষুদ্র এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হতে হতে আজকের আধুনিক মানুষ বা উন্নত পশুমাত্র। এই বস্তুবাদের আরও ধারণা হলো এই যে, পরকাল বলতে আসলে কিছু নেই। এই পৃথিবীই শেষ। এরপরে আর কোনো জীবন বা সময় নেই।

এই বস্তুবাদকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে হলে বিবর্তনবাদই হতে পারে এখানে মোক্ষম অস্ত্র। এ জন্য বস্তুবাদের দখলে থাকা বিজ্ঞানীমহল এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন চক্র খুব সুকৌশলে পাঠ্যবইয়ে, ম্যাগাজিন, পত্রিকায় বিবর্তনবাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন এটা একেবারে গাছ থেকে আপেল পড়ার মতোই সত্য। উল্লেখ্য, বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন দেখিয়েছেন যে গাছ থেকে আপেল ভূমিতে পড়ছে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য। পুনঃপুন পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তার সত্যতা প্রত্যক্ষ করেছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করছে যে গাছ থেকে আপেল সব সময় ভূমিতেই পড়ছে, ওপরের দিকে উঠছে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী দেখাতে পারেননি যে চোখের সামনে এক ধরনের শারীরিক গঠনবিশিষ্ট প্রাণী আরেক ধরনের গঠনে বিবর্তিত হয়েছে। অথচ যখনই কোনো বিজ্ঞানী, গবেষক এই বিবর্তনবাদের সমালোচনা করেন, ঠিক তখনই সেই বিজ্ঞানী, গবেষক হয়ে পড়েন অন্ধবিশ্বাসী, ক্রিয়েশনিস্ট, গোঁড়া, মূর্খ ইত্যাদি। মোদ্দাকথা, বিবর্তনবাদের সমালোচনা করলে তাকে আর বিজ্ঞানীমহলে কোনোরকম পাত্তা দেওয়া হয় না। তিনি যত বড় বিজ্ঞানীই হোক, তাঁর যত গবেষণা-কাজ থাকুক না কেন, তাকে বিজ্ঞানমহলে তখন ‘আবর্জনা’ জ্ঞান করা হয়। বিবর্তনবাদ বিরোধীদের সাথে বস্তুবাদী বিজ্ঞানমহল কী রকম আচরণ করে, সেটা নিয়ে একটা বিখ্যাত ডকুমেন্টারি করা হয়েছিল একবার। ইউটিউবে ‘Expelled: No intelligence allowed’ লিখে সার্চ দিলেই সেই ডকুমেন্টারি দেখতে পাবেন।

পশ্চিমা দেশগুলোতে পদোন্নতি পেতে হলে, প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান পেতে হলে এবং বিজ্ঞান-সাময়িকীতে লেখা ছাপাতে হলে বেশকিছু নিয়ম-নীতিমালার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি নিয়ম হলো, চোখমুখ বন্ধ করে বিবর্তনবাদকে বিশ্বাস করে নেওয়া। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ গুনটার বেকলির সাথে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রণিধানযোগ্য। তিনি জার্মানির স্টাটগার্ডে অবস্থিত স্টেট মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি-তে কিউরেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গুনটার বেকলি ছিলেন ফসিল ড্রাগনফ্লাই-এর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তিনি অনেকগুলো ফসিল ড্রাগনফ্লাই প্রজাতি আবিষ্কার করেন এবং তার নামে একাধিক প্রজাতির নামকরণও করা হয়েছে। তিনি ছিলেন বিবর্তনবাদী এবং উক্ত মিউজিয়ামে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর তিনি তার পড়ালেখার আলোকে বিবর্তনবাদের কথিত প্রমাণাদির ওপর সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছান যে, এলোপাতাড়ি বিবর্তনের প্রস্তাবিত কোনো পদ্ধতিই প্রজাতির বিবর্তন প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রথম প্রথম তিনি তার সিদ্ধান্তের বিষয়টি গোপন রাখলেও গত বছর তা প্রকাশ করেন। যার ফল, তাকে মিউজিয়ামের কিউরেটর পদ থেকে কোনো উপযুক্ত কারণ প্রদর্শন না করেই অপসারণ করা হয়। উইকিপিডিয়ার মতো তথাকথিত নিরপেক্ষ অনলাইন বিশ্বকোষ থেকে তার পেইজটিকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়, যেন জীবাশ্মবিদ্যায় তার কোনো অবদানই নেই।[ https://evolutionnews.org/…/wikipedia-erases-paleontologis…/]

একজন বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করলেও সেটা প্রকাশ করতে পারেন না তার সম্মান, মর্যাদা ইত্যাদি হারানোর ভয়ে। বলা চলে, অনেকটা জোর করে বিবর্তনবাদ বিশ্বাস করানো হয়।

আমেরিকান অণুজীব বিজ্ঞানী জোনাথন ওয়েলস ২০০০ সালে প্রকাশিত উনার বই Icons OF Evolution এ লিখেছেন,

“গোঁড়া ডারউইনবাদীরা প্রথমে ডারউইনবাদের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে ঘোষণা করে বসে যে বিজ্ঞানচর্চার এটাই একমাত্র রাস্তা। তখন সমালোচনাকারীরা হয়ে পড়ে অবৈজ্ঞানিক। সমালোচকদের নিবন্ধসমূহ গোঁড়াবাদী বিজ্ঞান-সাময়িকীগুলো প্রত্যাখ্যান করে। সরকারি সংস্থাগুলো সমালোচকদের অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানায়। সবশেষে সমালোচককে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এভাবে, ডারউইনবাদী মতবাদের বিপক্ষে সকল প্রমাণ আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যায়, যেভাবে পুলিশ বাহিনীর বিপক্ষে সাক্ষী অদৃশ্য হয়ে যায়। অথবা প্রমাণগুলোকে কবরস্থ করা হয় বিশেষায়িত প্রকাশনাগুলোতে, যার সন্ধান পান কেবল অতি কৌতূহলোদ্দীপক গবেষকরাই। আর যখনই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রমাণগুলো গায়েব করে দেওয়া যায়, ঠিক তখনই ডারউইনবাদীরা প্রচার করে বেড়ায় যে, বিবর্তনবাদের বিপক্ষে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক আছে, কিন্তু কোনো প্রমাণ মজুদ নেই।”[lcons Of Evolution: 235-236]

এই হচ্ছে বিজ্ঞানমহলকে টুটি চেপে ধরা বস্তুবাদীদের ভেতরের খবর। এভাবেই তারা চায় দুনিয়া থেকে ধর্ম উঠে যাক। স্রষ্টাতত্ত্বকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিতে পারলেই তারা তাদের ‘ভোগবাদী’ দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে। আর এই কাজে তাদের একমাত্র তুরুপের তাস হলো, বিবর্তনবাদ।

সালটা ১৮৩২। ইংল্যান্ড থেকে ছেড়ে যায় H.M.S Beagle নামের একটি জাহাজ। জাহাজে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর যাত্রী। কেউ সাগর ভ্রমণ করবে। মিতালি গড়ে তুলবে দুমড়ে পড়া প্রতিটা ঢেউয়ের সাথে। কেউ উপভোগ করবে প্রকৃতির নিশ্চুপ নৈসর্গিকতা। জাহাজের পাটাতনে শুয়ে কেউ-বা সখ্য গড়ে তুলবে রাতের আকাশের সাথে। এ রকম বিভিন্ন জনের বিভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যাত্রা করে এই জাহাজ। সেই জাহাজে একজন তরুণ লোক ছিল। চেহারায় কাঠিন্যের কোনো ভাব নেই। প্রকৃতি তার বেশ পছন্দের। প্রকৃতির টানে সেও ছুটে এসেছিল সেদিন। লোকটার নাম চার্লস ডারউইন। শখের বিষয় প্রকৃতি হলেও ভদ্রলোককে পড়তে হচ্ছিল প্রাণিবিজ্ঞান। অনেকটা বাধ্য হয়েই পড়া যাকে বলে।

এভাবে জাহাজে জাহাজে কেটে গেল পাঁচ পাঁচটা বছর। বিভিন্ন দ্বীপ, অঞ্চলে গিয়ে জাহাজ নোঙর করত, আর সবাই হুড়মুড় করে নেমে সেই দ্বীপ-অঞ্চলে বিচরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন প্রাণীদের বিভিন্ন গঠন, বিভিন্ন প্রজাতি দেখে অবাক হয় চার্লস ডারউইন। বিশেষ করে, গ্যালাপাগাস নামের এক দ্বীপে এক ধরনের ছোট ছোট পাখি দেখে খুবই আশ্চর্য হয়ে পড়েন। এই পাখিগুলোর ঠোঁটের ভিন্নতা দেখে তিনি মনে করলেন, পাখিগুলোর বাসস্থানের অভিযোজনের ফলে তাদের ঠোঁটে এ রকম ভিন্নতা এসেছে। অর্থাৎ প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে নিতে সময়ের পরিক্রমায় এসব পাখিদের ঠোঁটে ভিন্নতা চলে এসেছে।

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে তিনি মত দিলেন যে, প্রকৃতিতে প্রাণের ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উৎপত্তি ঘটেছে এ রকম অভিযোজনের ফলে। চার্লস ডারউইন এটাকে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বলে উল্লেখ করেছেন।

চার্লস ডারউইনের মতে, প্রকৃতিতে একটি অবিরাম সংগ্রাম চলছে। সেটা হলো টিকে থাকার সংগ্রাম। এই টিকে থাকার সংগ্রামে যেসব প্রাণীরা নিজেদের প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তারা টিকে থাকে এবং যারা এই সংগ্রামে টিকতে ব্যর্থ হয়, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এই সংগ্রামে অভিযোজনের ফলে তাদের মধ্যে নানা রকম বৈশিষ্ট্য যোগ-বিয়োগ হয়। এভাবে, একসময় একটা প্রাণী ভিন্ন একটা প্রজাতির প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়। সংক্ষেপে এটাই হলো ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরও সহজে বোঝা যাবে। ধরুন একটি জঙ্গলে দশটি হরিণ আছে এবং একটি বাঘ আছে। এখন ওই এলাকায় যদি নতুন করে আরও দুটি বাঘের আগমন ঘটে, তাহলে হরিণগুলোর জন্য পরিবেশটা প্রতিকূল হয়ে উঠবে। এখন এ রকম প্রতিকূল পরিবেশে কেবল সেইসব হরিণগুলোই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, যেগুলো বেশি দৌড়াতে পারবে। যেগুলো কম দৌড়াতে পারবে, সেগুলো বাঘের পেটে চলে যাবে।

ঘটনা সত্য। কিন্তু ডারউইন বলেছেন, এই ঘটনা যদি চলমান থাকে, একটা সময়ে হরিণগুলো প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে ভিন্ন একটা প্রজাতিতে রূপান্তরিত হবে।

মজার ব্যাপার হলো, এ রকম প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোনোভাবেই এক প্রজাতি থেকে ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উদ্ভব সম্ভব নয়। এটা যে সম্ভব নয়, সে কথা হাল আমলের বিবর্তনবাদীরাই এখন অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক নির্বাচন কোনোভাবেই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু চার্লস ডারউইন মনে করতেন, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলেই প্রকৃতিতে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। তিনি নিজের বইয়ের নামকরণটাই করেছিলেন, Origin Of Species by means of natural selection!

তবে চার্লস ডারউইনই এই ধরনের তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা নয়। তার আগে এই ধরনের একটি প্রকল্প (Hypothesis) দিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ জীববিজ্ঞানী লামার্ক। লামার্কের মতে, একটি প্রাণী তার অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দেয়। এভাবেই আস্তে আস্তে একটা প্রাণী ভিন্ন একটা প্রাণীতে বিবর্তিত হয়। উদাহরণ হিসেবে তারা জিরাফের কথা বলে। তাদের মতে হরিণজাতীয় একপ্রকার প্রাণী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গলা উঁচিয়ে উঁচু থেকে উঁচুতর ডাল থেকে পাতা খেতে খেতে একসময় তাদের গলা লম্বা হয় এবং এভাবে তারা ভিন্ন একটা প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়। এভাবেই জিরাফের আবির্ভাব বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু আধুনিক জিনতত্ত্ববিদ্যার গবেষণার মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীতে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় লামার্কিজম পরিত্যক্ত হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এপিজেনেটিক্স-এর আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে যে একটি প্রজাতি তার কিছু অর্জিত বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিতে পারে। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে Eva Joblanka এবং Massimo Pigliucci লামার্কিজম পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করছেন নিও-লামার্কিজম নামে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি হয় প্রজাতির গাঠনিক তথ্যের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে না অথবা যে পরিবর্তন আনে তা পরবর্তী অল্প কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। অর্থাৎ নিও-লামার্কিজমও প্রজাতিতে নতুন বৈশিষ্ট্যের আগমন ব্যাখ্যা করতে পারে না।[Stephen Meyer, Darwin’s Doubt; 2013; Harper Collins Publishers, p. 331]

প্রাকৃতিক নির্বাচন যেকোনোভাবেই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করে না । সেটা অকপটে স্বীকার করে British Museum of natural history এর একজন সিনিয়র জীবাশ্মবিদ, যিনি নিজেই একজন বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী, Colin Patterson বলেছিলেন,

“প্রাকতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কেউ কখনো নতুন প্রজাতি উদ্ভব করতে পারেনি। কেউ কখনো এটার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি। নব্য ডারউইনবাদের বেশির ভাগ আলোচনাই এ সম্পর্কে।”[Colin Patterson, “cladistics”, Interview with Brian Leek, Peter Franz, March 4, 1982, BBC]

বিবর্তনবাদীরা তাদের বিবর্তনবাদের বইগুলোতে, ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনকে জায়েজ করতে একটি ঘটনা বর্ণনা করে থাকে। এই ঘটনা প্রথম বর্ণনা করেন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Douglas Futuyma, ১৯৮৬ সালে লেখা উনার The Biology Of Evolution বইতে। এই ঘটনা ‘Industrial Melanis’ নামে পরিচিত।

তিনি লেখেন, ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে, ম্যানচেস্টারের আশপাশের গাছগুলোর বাকলের রং বেশ হালকা বা ফিকে ধরনের ছিল। বাকলের রং ফিকে হওয়ার ফলে কালচে বর্ণের মথগুলো (একধরনের পোকা) সহজে ধরা পড়ত এবং পাখিদের শিকারে পরিণত হতো। কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরে, দূষণের কারণে ভূইফোঁড় বা একজাতীয় ছত্রাক নিঃশেষ হয়ে গেলে ফিকে হওয়া গাছের বাকলের রং আস্তে আস্তে কালচে বর্ণ ধারণ করে। বাকলের রং কালচে হয়ে যাওয়ার ফলে কালচে রঙের মথগুলো আর সহজে ধরা পড়ে না। কিন্তু এবার পাখিদের শিকারে পরিণত হতে শুরু করল ফিকে বা হালকা রঙের মথগুলো। যেহেতু দূষণের কারণে গাছের বাকলের রং পরিবর্তন হয়ে কালচে হয়ে গেল, সেহেতু ফিকে ধরনের মথগুলো সহজেই ধরা পড়তে লাগল।

তো বিবর্তনবাদীরা মনে করে, এই ঘটনা তাদের বিবর্তনবাদের পক্ষে বিশাল বড় একটি প্রমাণ। তারা খুব আনন্দের সাথে এই ঘটনা মানুষকে বলে বেড়ায়। কিতু মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনা কোনোভাবেই বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ নয়। এই ঘটনা কি প্রমাণ করে যে মথগুলো বিবর্তিত হয়ে ভিন্ন কোনো প্রজাতির উদ্ভব ঘটিয়েছে? না। বরং কালচে এবং ফিকে রঙের মথ যেমন শিল্প বিপ্লবের পূর্বেও ছিল, তেমনই শিল্প বিপ্লবের পরেও তাদের অস্তিত্ব ছিল। দূষণের কারণে কেবল তাদের সংখ্যার পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র। এটা কোনোভাবেই বিবর্তনবাদ বা প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে প্রমাণ হতে পারে না।

যদি মথগুলোর নতুন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গজাত, তাদের জিনে নতুন তথ্য যোগ হতো, কেবল তখনই এটা বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ বলে চালানো যেত। কিন্তু বিবর্তনবাদীরা এই ঘটনাকে বিবর্তনবাদ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে চালায়। সাধারণ মানুষকে দিন-দুপুরে তারা ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করে।

তাহলে দেখা গেলো, ডারউইন প্রস্তাবিত পদ্ধতি প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজাতিতে নতুন ও সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আগমন ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ। অর্থাৎ ভুল প্রমাণিত হলো। প্রাকৃতিক নির্বাচন যেকোনোভাবেই নতুন প্রজাতি উদ্ভব করতে পারে না, সেটা প্রমাণিত হবার পরেই তো বিবর্তনবাদ তত্ত্বের তল্পিতল্পাসহ জাদুঘরে চলে যাবার কথা। কিন্তু না। বিবর্তনবাদের প্রাথমিক প্রস্তাবনা ভুল প্রমাণিত হবার পরেও বিবর্তনবাদ বহাল তবিয়তেই বিজ্ঞানমহলে বর্তমান। কিন্তু কেন? ওই যে, বস্তুবাদ। বস্তুবাদকে বাঁচাতে হলে বিবর্তনবাদের চেয়ে ভালো কোনো ‘দাবার চাল’ আর কিছু নেই। সে জন্য যেভাবেই হোক, এই বিবর্তনবাদকে বাঁচাতেই হবে। নাস্তিক জিনতত্ত্ববিদ Richard C. Lewontin-এর ভাষায়,

"বিজ্ঞান ও অতিপ্রকৃতির মাঝে আসল দ্বন্দ্বকে বোঝার চাবি হল কমনসেন্সবিরোধী বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেনে নিতে আমাদের সদিচ্ছার দিকে তাকনো। যদিও বিজ্ঞানের কিছু মতবাদ সুস্পষ্টভাবে হাস্যকর, যদিও এটি জীবন ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের ব্যাপারে নানা উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, যদিও বৈজ্ঞানিক মহল অপ্রমাণযোগ্য কেবলই (শিশুতোষ) গল্প (যেমন প্রাকৃতিক নির্বাচনের কিছু বিষয়) মেনে নিতে সহিষ্ণু তবুও আমরা বিজ্ঞানের পক্ষ নেই। কারণ আমরা আগে থেকেই বস্তুবাদের নিকট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্যাপারটা এমন নয় যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিস্ময়কর জগৎ সম্পর্কে একটি বস্তুবাদী ব্যাখ্যা গ্রহণে কোনো না কোনোভাবে আমাদের বাধ্য করে। বরং, পক্ষান্তরে (বস্তুবাদের প্রতি) পূর্ব থেকেই আনুগত্যের কারণে আমরা বাধ্য হই (জগৎ অনুসন্ধানের) এমন উপকরণ ও কিছু ধারণা তৈরীতে যা বস্তুবাদী ব্যাখ্যাই জন্ম দেয়। সে ব্যাখ্যা যতই কাণ্ডজ্ঞানহীন হোক না কেন, অনভিজ্ঞদের জন্য যতই দুর্বোধ্য হোক না কেন। উপরন্তু, বস্তুবাদই হল অকাট্য কারণ আমরা (আমাদের চিন্তার) দরজায় ঐশ্বরিক পদক্ষেপকে অনুমোদন করতে পারি না।"[রাফান আহমেদ, বিশ্বাসের যৌক্তিকতা, পৃষ্ঠা : ৫১]

এ কারণে, বিবর্তনবাদকে বাঁচাতে পরে বিবর্তনবাদীরা আরও নতুন ফর্মুলা পেশ করেছে। এ রকম কয়েকটি ফর্মুলাগুলো নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

“প্রাকৃতিক নির্বাচন” পদ্ধতির অসারতা এবং বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব কল্যাণে DNA, RNA-এর আবিষ্কার, মলিকুলার লেভেলে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে ডারউইনের ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ পদ্ধতি যখন অসহায় হয়ে ওঠে, তখন বিবর্তনবাদকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে বিবর্তনবাদীরা। বিবর্তনবাদকে কীভাবে রক্ষা করা যায় এ ব্যাপারে তারা শলাপরামর্শের আয়োজন করে। ১৯৪১ সালে Geological Society of America কর্তৃক আয়োজিত এক সভায় বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা একত্র হলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন Ernst Myar, Julian Huxley, George Gaylord Simpson, Glenn L. Jepsen, Ronald Fisher, Sewall Right সহ প্রমুখ। উদ্দেশ্য ছিল, বিবর্তনবাদকে মেরামত করা।

তারা সবাই মিলে নতুন একটি পদ্ধতি দাঁড় করালেন। তারা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে তো পাশে রাখলেনই, সাথে বললেন Random Mutation তথা এলোমেলো পরিবর্তনের ফলে একটি প্রাণীর জিনে নতুন নতুন তথ্য যোগ হয়। এসব নতুন নতুন তথ্যকে তারা নাম দিয়েছে ‘Advantageous Mutation’ বা ‘লাভজনক পরিবর্তন’। অর্থাৎ প্রাণীর জিনে (Gene) মিউটেশনের ফলে নতুন নতুন তথ্য যোগ হওয়ার ফলে একসময় দেখা যায় যে, ওই প্রাণীর মধ্যে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য চলে আসে। তখন সেই প্রাণীটা অন্য নতুন কোনো প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়।

আরেকটু ক্লিয়ার করি। ধরুন, একটি পাখি। এই পাখির জিনে পাখিটার ওড়ার, খাওয়ার, তাকানোর সব রকম জেনেটিক তথ্য আছে। পাখিটা সে মতেই উড়ে, খায়, দেখে। এখন যদি পাখিটার জিনে মিউটেশন (পরিবর্তন) ঘটে, তাহলে সেই পাখিটার জিনোমে তথ্যের পরিবর্তন ঘটবে। দেখা যাবে পাখিটার মধ্যে জলচর কোনো প্রাণীর বৈশিষ্ট্য যোগ হয়ে গেছে। ফলে পাখিটা তখন পাখি থেকে জলচর কোনো প্রাণীতে পরিণত হবে। মোটামুটি বিবর্তনবাদীদের প্রস্তাবিত Random Mutation বা এলোমেলো পরিবর্তনের এটাই সারমর্ম। এটাকে বলা হয়, The Modern synthetic Evolution Theory। আর এটার প্রবক্তাদের বলা হয় Neo-Darwinist।

কিন্তু, তাদের প্রস্তাবিত সেই Random Mutation বা এলোমলো পরিবর্তনের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এ যাবৎকালে গবেষণালব্ধ সকল তথ্য-উপাত্ত এটাই প্রমাণ করে যে, লাভজনক মিউটেশান বা Advantageous Mutation বলতে কিছু আসলে নেই। মিউটেশান কখনোই লাভজনক হয় না। প্রাণীর জিনে মিউটেশান ঘটলে তা কখনোই কোনো উপকার করে না; বরং ক্ষতি করে। মিউটেশনকে একটি দুর্ঘটনার সাথে তুলনা করা যায়। দুর্ঘটনা যেমন কখনোই নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না ধ্বংস ছাড়া, মিউটেশানও ক্ষতি ছাড়া নতুন কোনো কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। ভূমিকম্পের ফলে একটা বিল্ডিং যেভাবে ধসে যায়, মিউটেশানও সে রকম ভাঙার কাজ করে প্রাণীর জিনে। আর এর প্রভাব পড়ে প্রাণীর শরীরে।

এলোমেলো পরিবর্তন কখনোই সুশৃঙ্খল কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। B.G Ranganathan এটাকে উল্লেখ করেছেন এভাবে,

“প্রথমত, খাঁটি মিউটেশন প্রকৃতিতে খুবই বিরল। দ্বিতীয়ত, প্রায় সমস্ত মিউটেশনই ক্ষতিকর, যেহেতু তা জিনের গঠনের সুনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের এলোমেলো পরিবর্তন। অত্যন্ত সুসজ্জিত কোনো সিস্টেমের মধ্যে এলোমেলো পরিবর্তন ভালো করার পরিবর্তে সব সময় খারাপটাই করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে তৈরি দালানে যদি ভূমিকম্প আঘাত করে, তাহলে দালানটির কাঠামোতে একটি এলোমেলো পরিবর্তন ঘটে যাবে, যাতে দালানটির উন্নয়ন সাধিত হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই।”[ B.G Ranganathan, “Origins?” Pennsylvania: The banner of truth trust, 1988]

এখন পর্যন্ত উপকারী মিউটেশনের কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। বরং এ কথা বার বার প্রমাণিত হয়েছে যে, সব ধরনের মিউটেশনই ক্ষতিকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত পারমাণবিক অস্ত্রের বিকিরণে ঘটিত সম্ভাব্য মিউটেশন সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে Committee On Genetic Effects of Atomic Radiation একটি রিপোর্ট তৈরি করে। এই রিপোর্ট সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Warren Weaver বলেছেন,

“অনেকেই এই কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যাবে যে, বাস্তবে আজ পর্যন্ত জানা মিউটেশনের শিকার সকল জিনই ক্ষতিকর। অথচ মিউটেশন হচ্ছে বিবর্তন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাহলে মিউটেশনের মাধ্যমে কীভাবে ভালো ফলাফল বা প্রাণী উন্নতর অবস্থা প্রাপ্ত হবে, যখন সকল মিউটেশনই ক্ষতিকর?”[Warren Weaver, “Genetics Effects Of Atomic Radiation”, Science, vol- 123, June 29, 1956]

বিগত কয়েক দশক ধরে বিবর্তনবাদীরা ‘সফল মিউটেশন’ ঘটানোর জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা বছরের পর বছর ধরে গবেষণাগারে মাছির ওপর মিউটেশন চালিয়ে যাচ্ছে। মাছির ওপর মিউটেশন চালানোর কারণ এটাই যে, মাছি খুব দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে। প্রতি এগারো দিনে মাছি নতুন প্রজন্মের জন্ম দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তনবাদীরা মাছির ওপরে মিউটেশনের কাজ চালিয়ে মাছির একটি নতুন প্রজাতি তো দূরের কথা, একটা নতুন এনজাইমও এখন পর্যন্ত তৈরি করে দেখাতে পারেনি।[Gordon R. Taylor, The great evolution mystery, P- 48]

মাছির ওপর গবেষণা করে মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতি সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়ে গবেষক Michel Pitman বলেছেন,

“মরগান, গোল্ডসচিমিডট, মুলারসহ আরও অনেক প্রজনন-শাস্ত্রবিদ মাছির বিভিন্ন প্রজাতির ওপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। তারা মাছির বিভিন্ন প্রজাতিকে খুব গরম, ঠান্ডা, আলো-অন্ধকার, রাসায়নিক বিকিরণের মধ্যে রেখেছেন। সকল প্রকারের মিউটেশন সংগঠিত হয়েছে, যার সবই বস্তুত ক্ষতিকারক। এটাকে কি মানবসৃষ্ট বিবর্তনের প্রমাণ বলা যাবে? একদম না। উৎপাদিত (মিউটেশনের ফলে বিকৃত) প্রাণীগুলোর অল্পই হয়তো বোতলের বাইরে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, মিউটেশনের ফলে উৎপাদিত প্রজন্ম মারা যায়, বংশবিস্তারে অক্ষম হয়ে পড়ে অথবা বংশানুক্রমে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়।”[Michel Pitman, Adam & Evolution, London: River Publishing, 1984, p- 70]

মাছির মধ্যে মিউটেশনের যে প্রভাব, মানুষের মধ্যেও ঠিক একই রকম প্রভাব দেখা গেছে। মানুষের মধ্যেও আজ পর্যন্ত উপকারী মিউটেশনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মানুষের মধ্যে ঘটা মিউটেশনের ফলাফল হিসেবে যা পাওয়া গেছে আজ পর্যন্ত তা হলো, বিকলাঙ্গতা, বৈকল্য বা জন্মগত মানসিক সমস্যা, ডাউন সিনড্রোম (একটি জিনগত রোগ), আলবিনিজম (ধবলজাতীয় রোগবিশেষ), বামনত্ব অথবা ক্যানসার।

মিউটেশনের ফলে মানুষকে এ রকম ভয়াবহ রোগগুলো পেয়ে বসে। কিন্তু এই মিউটেশনকেই বিবর্তনবাদীরা বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু এ কথা বলে নেওয়া জরুরি যে, যা-ই ক্ষতিকর বা ক্ষতির কারণ, তা কখনোই বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ হতে পারে না। কেননা, বিবর্তনের মূল সারমর্মই হলো বেঁচে থাকার উপযুক্ততা লাভ করা। অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য আগের অবস্থার চেয়ে ভালো অবস্থায় যাওয়া। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম যে বাস্তবে ঘটনা ভিন্ন। মিউটেশন কখনোই উপকারী কোনো কিছু ঘটাতে পারে না। মিউটেশন যা ঘটায়, তার সবটাই ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং, বিবর্তনবাদীরা নতুন প্রজাতির উদ্ভবের জন্য যে মিউটেশনের কথা বলে, তাও ভুল প্রমাণিত হলো।

এরপর, বিবর্তনবাদীরা যখন বুঝতে পারল যে কথিত ধীর এবং ক্রমবিবর্তন অসম্ভব, এবং ধীর প্রক্রিয়ার মিউটেশন কখনোই নতুন প্রজাতি উদ্ভাবনে সক্ষম নয়, তখন বিবর্তনবাদীরা তাদের বিবর্তনবাদকে আবারও ঢেলে সাজাবার প্রয়োজন অনুভব করল। বিবর্তনবাদকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে এবার এগিয়ে আসেন দুই প্রতিথযশা বিজ্ঞানী, আমেরিকান জীবাশ্মবিদ Niles Elredge এবং Stephen Jay Gould। তারা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, নব্য ডারউইনবাদীরা যে ধীর এবং ক্রম বিবর্তনের কথা বলে, সেটা আদতে অসম্ভব। তারা ফসিল রেকর্ড ঘেঁটে বুঝতে পারলেন, প্রকৃতিতে প্রাণীর আগমন ধীরগতিতে নয়, বরং আকস্মিকভাবে। অর্থাৎ প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির উদ্ভবের যে কল্পকাহিনি বিবর্তনবাদীরা আমাদের গেলানোর চেষ্টা করে, সেটা ভুল। তারা মনে করেন, প্রকৃতিতে প্রাণীর আগমন কোনো ধীর প্রক্রিয়ায় নয়, বরং হঠাৎ করেই। এখন যদি হঠাৎ করে প্রাণীর আগমন হয়, তাহলে এতদিন ধরে বিবর্তনবাদীদের আনীত, প্রস্তাবিত সকল প্রস্তাবনাই বাতিল হয়ে যায়। প্রাণীর হঠাৎ আগমনের পেছনে তখন কেবল একটাই যুক্তিযুক্ত, বিজ্ঞানসম্মত উত্তর থাকতে পারে। সেটা হলো, কোনো ডিজাইনারের উপস্থিতি। সেই ডিজাইনার নিঃসন্দেহে স্রষ্টা। কিন্তু বস্তুবাদী বিজ্ঞান আর তার ধারকবাহকেরা যখন হলফ করেই ফেলেছে যে, কোনোভাবেই তারা স্রষ্টাতত্ত্বকে বিজ্ঞানের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেবে না, তখন কীভাবে তারা প্রাণীর আকস্মিক আগমনের জন্য স্রষ্টাকে স্বীকার করে নেবে?

না। তারা যখন সেবারও ব্যর্থ হলো, তখন তারা নতুন আরও একটি প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলো আমাদের সামনে। বিজ্ঞানী Niles Eldredge এবং Stephen Jay, Gould কর্তৃক প্রস্তাবিত সেই পদ্ধতির নাম, Punctuated Equilibrium. এই পদ্ধতি আগের Modern Synthetic Evolution Theory থেকে কিছুটা আলাদা। Modern Synthetic Evolution Theory মতে, প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ পায়। যেমন : একটি মাছের ডিমে কিছু মিউটেশনের ফলে সে আস্তে আস্তে উভচর বা স্থলচর প্রাণীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এভাবে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লাভ করার ফলে, একটা সময় পরে সেটা ভিন্ন একটা প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়।

কিন্তু Punctuated Equilibrium এরচেয়ে একটু আলাদা। তারা প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আসার ব্যাপারটাকে স্বীকার করে না। তাদের মতে, প্রাণীর জিনে আকস্মিক বড় ধরনের মিউটেশনের ফলে খুব অল্প সময়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। অর্থাৎ একটি প্রজাতির জিনে অল্প কয়েক প্রজন্মে অসংখ্য সুনির্দিষ্ট মিউটেশন এলোমেলোভাবে হয়। ফলে উক্ত প্রজাতি থেকে স্বল্প সময়ে অনেকগুলো ভিন্ন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। অতঃপর উক্ত নতুন প্রজাতিগুলো অনেকদিন টিকে থাকে।

অর্থাৎ তাদের দাবি অনুযায়ী, সরীসৃপ থেকে পাখি এসেছে অসংখ্য রেনডম মিউটেশন তথা এলোপাতাড়ি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, অল্প কয়েক প্রজন্মে। চিন্তা করে দেখুন, মাছি যেহেতু অল্প সময়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে, এই পদ্ধতি অনুযায়ী মাছির একটি প্রজাতিতে মিউটেশন ঘটাতে ঘটাতে অল্প কিছু প্রজন্মেই নতুন পোকার জন্ম নেওয়ার কথা। অথচ মাছির ওপর বছরের পর বছরের এলোপাতাড়ি মিউটেশন পরীক্ষা চালিয়েও উপকারী কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি, নতুন বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রজাতির আগমন তো অনেক পরের বিষয়!

এ যেন ঠিক রূপকথার সেই গল্পের মতো, যেখানে গল্পের ব্যাঙ একদিন হঠাৎ করে রাজকুমারে পরিণত হয়। আসলে বিবর্তনবাদীদের প্রস্তাবিত গল্প আর রূপকথা গল্পের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য নেই। কোনো কোনো জায়গায় তাদের গল্প রূপকথার গল্পগুলোকেও হার মানায়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সময়ের বিবর্তনে বিবর্তনবাদীদের গল্পগুলোও বিবর্তিত হয়। তারা আজকে এক পদ্ধতির কথা বলে তো, আগামীকাল আরেক পদ্ধতি। তাদের নিজেদের মধ্যেই তাদের প্রস্তাবিত, আনীত পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য নেই। তারা যখন দেখে যে আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার, মলিকুলার লেভেলের বিস্ময়কর সব উদ্ভাবন তাদের প্রস্তাবিত গল্পগুলোর বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক তখনই তারা এক পদ্ধতি থেকে আরেক পদ্ধতিতে লাফ দেয়।

জীবাশ্ম রেকর্ড : বিবর্তনবাদীদের অসহায়ত্ব

জীবাশ্ম হলো, একটি বিলুপ্ত জীবের পূর্নাঙ্গ দেহ বা তার অংশবিশেষ, যা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত থেকে যায়। এসব জীবাশ্ম থেকে কোটি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া বা অস্তিত্বে থাকা বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কে আমরা জানতে পারি।

এখন বিবর্তনবাদীদের তত্ত্ব অনুসারে, প্রাণের বিবর্তন ঘটেছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। যেমন : একটা মাছের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আসতে আসতে সেটা একসময় ভিন্ন আরেকটা প্রজাতির প্রাণীতে বিবর্তিত হয়েছে। এখন যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রকৃতিতে এ রকম অসংখ্য মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা যার অর্ধেক মাছ, অর্ধেক অন্য প্রজাতির। রূপকথার গল্পের মৎস্যকন্যার কথা মনে আছে? সেই মৎস্যকন্যাকে একটা উৎকৃষ্ট মিসিং লিঙ্ক হিসেবে কল্পনা করা যায়।

[উল্লেখ্য, কিছু কিছু বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, মাছ থেকেই মানুষের বিবর্তন ঘটেছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে মৎস্যকন্যার মতো মিসিং লিঙ্ক থাকা আবশ্যক। যদি মাছ থেকেই মানুষ বিবর্তিত হয়, তাহলে তো আর এক লাফে মাছ মানুষে বিবর্তিত হয়ে যায়নি। বরং মাছে ধীরে ধীরে মানুষের মতো পা গজিয়েছে, হাত গজিয়েছে। এরপর মানুষের মতো চোখ, নাক, কান… এভাবেই সে একটা সময় পরে গিয়ে মানুষ হয়েছে। ঘটনা যদি এটাই হয়, তাহলে এই সময়ের কোনো একপর্যায়ে সেই মাছের মানুষের মতো মাথা আর মাছের মতো লেজ থাকা স্বাভাবিক। সে দৃষ্টিকোণ থেকে মৎস্যকন্যা কোনো রূপকথার চরিত্র নয়; বরং বৈজ্ঞানিক চরিত্র বটে]

এখন বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে যদি প্রমাণ করতেই হয়, তাহলে প্রকৃতিতে মৎস্যকন্যার মতো এ রকম অসংখ্য মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা। কিন্তু বিবর্তনবাদীদের জন্য বড়ই আফসোস এবং পরিতাপের বিষয় এই যে, বিবর্তনবাদীদের দাবি প্রমাণ করে এমন মিসিং লিঙ্ক প্রকৃতিতে মজুদ নেই।

যদি তাদের দাবি অনুযায়ী, ধীর গতির বিবর্তন হয়েও থাকে, তাহলে প্রকৃতিতে হাজার বা কোটি কোটি নয়, মিলিয়ন মিলিয়ন মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা। পৃথিবীতে যত প্রজাতির প্রাণী আছে, তারচেয়ে কয়েক কোটি গুণ বেশি হওয়ার কথা মিসিং লিঙ্কের সংখ্যা। কিন্তু আছে কি? নেই।

এই মিসিং লিঙ্ক যে বিবর্তনবাদের জন্য মরণফাঁদ হতে পারে, সেটা স্বয়ং চার্লস ডারউইনও জানত। তাই তিনি তাঁর লেখা Origin Of Species: By means of natural selection বইয়ের ‘Difficulties of the Theory’ অধ্যায়ে ব্যাপারটা অকপটে স্বীকার করে বলেছেন,

“আমার তত্ত্ব যদি সত্য হয়, তাহলে সমগোত্রীয় প্রজাতিগুলোর মাঝে সংযোগ রক্ষাকারী অসংখ্য মধ্যবর্তী প্রজাতির (Missing Link) অস্তিত্ব থাকার কথা। এদের অস্তিত্বের প্রমাণ শুধু জীবাশ্মের মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে।”[Charles Darwin, The Origin Of Species, A Facsmile of the First Edition, 1964, p-179]

একই অধ্যায়ে তিনি আরও লেখেন,

“যদি এক প্রজাতি অন্য প্রজাতি থেকে সুন্দর ক্রমান্বয় অনুসরণ করে বেরিয়ে আসে, তবে কেন আমরা চারদিকে অসংখ্য মধ্যবর্তী প্রজাতির (Missing Link) দেখা পাই না? কেন প্রজাতিসমূহের প্রকৃতি এলোমেলো হওয়ার পরিবর্তে সুগঠিত? তত্ত্বানুসারে যেহেতু অসংখ্য মধ্যবর্তী প্রজাতির অস্তিত্ব থাকার কথা, কেন পৃথিবীর স্তরে স্তরে সেসবের চিহ্ন অবশিষ্ট নেই? এই সমস্যাটি আমাকে খুব ভাবায়।”[Charles Darwin, The Origin of species, A Facsmile of the First Edition, 1964, P- 179]

ডারউইন মনে করেছিলেন, তার সময়ে বিজ্ঞানের তেমন উন্নতি সাধিত না হওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবাশ্মের সন্ধান মেলেনি। তিনি আশাবাদী ছিলেন যে, একটা সময়ে জীবাশ্মগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মিসিং লিঙ্কের সন্ধান মিলবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, ডারউইনের মৃত্যুর দেড় শ’ বছর অতিক্রম করলেও আজ অবধি এমন কোনো মিসিং লিঙ্কের সন্ধান বিবর্তনবাদীরা বের করতে পারেনি, যা তাদের তত্ত্বকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে। জীবাশ্ম রেকর্ডে মিসিং লিঙ্কের এই ‘শূন্যতা’ দেখে হতাশ হয়ে বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Derek V. Ager বলেছেন,

“আমরা যদি জীবাশ্ম রেকর্ড খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করে দেখি, তাহলে ঘুরেফিরে যে বিষয়টা সামনে আসে তা হলো : একদলের হঠাৎ বিলুপ্তি ও অন্যদলের বিস্ফোরণ কোনো ধীর বিবর্তনের ফল নয়।”[Derek V. Ager, “The nature of the fossil records”, Proceedings of the British Geological Association, Vol-87, 1976]

আরেক বিবর্তনবাদীজীবাশ্মবিদ Mark Czarneck; আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন,

"বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি প্রমাণের একটি বড় অসুবিধা হলো এই জীবাশ্ম রেকর্ড। পৃথিবীর পরতে পরতে সংরক্ষিত বিলুপ্ত প্রজাতিসমূহের ছাপ। এই জীবাশ্ম রেকর্ডে কখনোই ডারউইনের প্রস্তাবিত অন্তবর্তীকালীন রূপের দেখা মেলেনি। এর পরিবর্তে আমরা যা পেয়েছি তা হলো, প্রজাতিসমূহ একদম হঠাৎ করেই আগমন করেছে, আবার হঠাৎ করেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর এই জিনিসটাই সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের এই কথা বলতে ইন্ধন জুগিয়েছে যে, প্রত্যেক প্রজাতিই স্রষ্টার সৃষ্টি।"[Mark czarnecki, The Revival of the Creationist Crusade, 1981, p-133]

মিসিং লিঙ্কের এই ‘শূন্যতা’ বিবর্তনবাদীরাও জানে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে তো আর এসব জানানো যাবে না। জানালে তো থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। এ জন্যই বিবর্তনবাদীরা প্রায়ই কল্পিত মিসিং লিঙ্ক তৈরি করে মানুষকে ধোঁকায় ফেলে। তারা বিভিন্ন মিসিং লিঙ্কের ছবি কম্পিউটারে ফটোশপ করে, এঁকে পাঠ্যবইয়ে এমনভাবে ছাপায়, যেন এটা একেবারে গ্র্যাভিটির মতো সত্য কোনো বিষয়। আদতে বিবর্তনবাদীরা জালিয়াতি, প্রতারণা করে এসব মিসিং লিঙ্ক বানিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয়। তারা তাদের ইচ্ছা এবং কল্পনামাফিক প্রাণীদের নাক, কান, চুল, ইত্যাদি অঙ্কন করে পাঠ্যপুস্তকে ছাপায়। অথচ এসবের কোনো কিছুই জীবাশ্ম রেকর্ডে পাওয়া যায় না। তাহলে ওরা কীভাবে আঁকে? স্রেফ কল্পনা। সেভাবে তারা এক প্রাণীর হাড়, অন্য প্রাণীর নাক, আরেকটা প্রাণীর চোয়াল এনে জোড়াতালি দিয়ে একটা কল্পিত ‘মিসিং লিঙ্ক’ তৈরি করে এবং বিবর্তনবাদী ও বস্তুবাদী মিডিয়া সেটাকে ফলাও করে প্রচার করে বেড়ায়।

এবার আমরা সে রকম কিছু ইতিহাস জানব, যেখানে বিবর্তনবাদীরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েও ধরা খেয়েছে বার বার।

কিছু ধাপ্পাবাজির গল্প

এক ফোঁটা উল্লুক এবং দুই ফোঁটা ওরাংওটাং মিলে হয় একটি পিল্টডাউন মানব

১৯১২ সালে ইংল্যান্ডের পিন্টডাউন শহরে একটি জীবাশ্ম পাওয়া যায় বলে চারদিকে শোরগোল পড়ে। একটা খনির মধ্যে চোয়ালের কিছু হাড় এবং করোটির কিছু টুকরো পাওয়া যায়। চোয়ালের হাড়টা উল্লুকের মতো হলেও, করোটির টুকরোগুলো মানুষের খুলির মতো। প্রাপ্ত এই নমুনাগুলোর নাম দেওয়া হলো ‘Piltdown Man’ বা ‘পিল্টডাউন মানব’। এই পিল্টডাউন মানবের বয়স দেখানো হলো ৫,০০,০০০ বছর। রাতারাতি এই পিল্টডাউন মানবকে নিয়ে বিবর্তন পাড়ায় হইচই শুরু হয়ে গেল। এটাকে বলা হলো, মানুষ এবং এপের মধ্যকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই পিল্টডাউন মানব নিয়ে বিজ্ঞান-সাময়িকীতে লেখা হয় অসংখ্য প্রবন্ধ, অসংখ্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলে আসে চারিদিক থেকে। এটাকে উল্লেখ করা হয়েছে বিবর্তনবাদের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে। এই জীবাশ্মের ওপরে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য ৫০০টিরও বেশি থিসিস লেখা হয়েছিল।[Malcolm Muggeridge, “The end of Chirtendom”, Grand Rapids, 1980]

১৯২১ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে গিয়ে নৃতত্ত্ববিদ Henry Fairfield Osborn বলেন,

'পিন্টডাউন মানব মানুষের প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।'[Stephen Jay Gould, “Smith Woodward’s Folly”, April-05, 1979]

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলসহ নামকরা সব বিজ্ঞান-সাময়িকী, ম্যাগাজিন, পিয়ার রিভিউ জার্নালে দিনরাত এই পিল্টডাউন মানবকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হতো।

কিন্তু ১৯৪৯ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিজ্ঞান বিভাগের দায়িত্বরত জীবাশ্মবিদ, Kenneth Oakley ফ্লুরিন টেস্ট করলেন। উল্লেখ্য ফ্লুরিন টেস্ট হলো জীবাশ্মের বয়স নির্ণয়ের নতুন পদ্ধতি। Kenneth Oakley যখন পিল্টডাউন মানবের ওপর ফ্লুরিন টেস্ট করলেন, উক্ত টেস্ট শেষে তিনি যা ফলাফল পেলেন তা রীতিমতো চমকে যাবার মতো। উনি দেখতে পেলেন যে, পিন্টডাউন মানবের চোয়ালে কোনো ফ্লুরিনই নেই। এতে বোঝা গেল যে, এটি মাত্র কয়েক বছর ধরে মাটির নিচে ছিল। পিল্টডাউন মানবের খুলিতে খুব অল্প পরিমাণে ফ্লুরিন পাওয়া গেল, যা প্রমাণ করে যে এটা মাত্র কয়েক বছর আগেই সমাধিস্থ কোনো খুলি।

প্রমাণ হলো যে, পিল্টডাউন মানবে চোয়াল এবং দাঁতের অংশটা মূলত ওরাংওটাং নামে আলাদা একটা প্রাণীর। এগুলোকে ঘষেমেজে, পুরোনো বানিয়ে জোড়াতালি দিয়ে পিন্টডাউন মানব বলে চালানো হয়েছে।

এরপর Joseph Weiner এর পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের পরে, ১৯৫৩ সালে পিল্টডাউন মানব নিয়ে জালিয়াতির ব্যাপারটা সকলের সামনে চলে এল। প্রমাণ হলো যে, পিন্টডাউন মানবের মাথার খুলিটি পাঁচ শ’ বছর আগে মারা যাওয়া একজন মানুষের এবং চোয়াল আর দাঁত সম্প্রতি মারা যাওয়া একটি উল্লুকের। সেগুলোকে ঘষেমেজে, কৃত্রিম উপায়ে পুরোনো একটা আমেজ তৈরি করে,[KennethOakley, William Le Gros Clark & J.S, “Piltdown”, Meydan Larousse, Vol-10, p-113] জোড়াতালি দিয়ে বানানো হয়েছিল এই পিল্টডাউন মানব। এভাবেই দীর্ঘ চল্লিশ বছর ভুয়া, নকল এবং জালিয়াতিপূর্ণ এই জিনিস বিজ্ঞানমহলে ‘বিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ’ হিসেব সংরক্ষিত ছিল। জালিয়াতি ধরা পড়ার পর রাতারাতি সেটাকে ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

পিল্টডাউন মানব নিয়ে এ রকম জালিয়াতি দেখে Sir Wilfred Le Gros Clark বলেন, "কৃত্রিম ঘষামাজার চিহ্নগুলো খুব সহজেই নজরে এল। বাস্তবিক অর্থে, এই কৃত্রিম সংযোজনগুলো এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, প্রশ্ন করা যেতে পারে, এগুলো এতদিন নজর এড়িয়ে ছিল কীভাবে?"[Stephen Jay Gould, “Smith Woodwords Folly”, New Scientist, April-05, 1979]

পাঠক এই হলো বিজ্ঞানমহলে সেসব বিজ্ঞানীদের ভেতরের গল্প, যাদের আমরা চোখমুখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে ফেলি। একটা মতবাদকে দাঁড় করানোর জন্য তারা কী পরিমাণ যে অসততার আশ্রয় নিতে পারে, সেটা রীতিমতো অবাক করার মতো। এতো গেল এক কাহিনি। এ রকম আরও কাহিনি আছে যা শুনলে আপনার পিলে চমকে উঠবে।

নেব্রাসকা ম্যান : একটি শুকরের দাঁত থেকে একগুচ্ছ গল্প

বিবর্তনবাদীরা তাদের কল্পিত বিবর্তনবাদকে প্রমাণ করার জন্য যেসব জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে, নেব্রাসকা মানবের ঘটনা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ১৯২২ সালে American Musuem of Natural History এর পরিচালক Henry Fairfield Osborn দাবি করলেন যে, তিনি স্নেইক ব্রুক (Snake Brook) এর কাছাকাছি অঞ্চলে, পশ্চিম নেব্রাসকায় প্লাইওসিন যুগের মাড়ির একটি দাঁত পেয়েছেন। আরও দাবি করা হলো, এই দাঁতে নাকি মানুষ এবং উল্লুক উভয়ের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যস, এই দাঁতটির নাম দেওয়া হলো নেব্রাসকা মানব। কেউ কেউ দাবি করল এটা আসলে পিথেক্যানথ্রোপাস ইরেক্টাস, আবার কেউ কেউ দাবি করল এটা আসলে মানুষের নিকটবর্তী কোনো প্রজাতির। রাতারাতি এই ‘নেব্রাসকা মানব’ এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হলো Hesperopithecusharoldcooki।

এই একটিমাত্র দাঁতের ওপর ভিত্তি করে বিবর্তনবাদীরা নেব্রাসকা মানবের পুরো একটি দেহ এঁকে ফেলল রাতারাতি। শুধু কি নেব্রাসকা মানবের দেহ? ওই একটি দাঁতের ওপর ভিত্তি করে তারা নেব্রাসকা মানবের স্ত্রী, সন্তানসহ পুরো পরিবারের চিত্র এবং এই নেব্রাসকা মানব যে পরিবেশে বেঁচে ছিল, সেই পরিবেশের ছবি পর্যন্ত এরা এঁকে ফেলল। চিন্তা করে দেখুন এদের কল্পনাশক্তি কত প্রখর। একটিমাত্র দাঁত থেকে তারা পুরো বংশতালিকা বের করে ফেলেছে। সাধারণ বোধসম্পন্ন যে কারও কাছে এটাকে রূপকথার গল্প বলে মনে হলেও, বিজ্ঞানের ঠিকাদারদের কাছে এটাই ‘বিশুদ্ধ’ বিজ্ঞান বলে পরিচিত।

সে যাই হোক, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা Osborn সাহেবের এই কল্পিত চিত্রকর্মকে খাঁটি বিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি দিয়ে দিলেন। বিবর্তনবাদ মহলে তখন খুশির আমেজ। এতদিন পর মিলেছে পরম আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর সন্ধান। কিন্তু William Bryan নামের একজন গবেষক বেঁকে বসলেন। একটিমাত্র দাঁতের ওপর ভিত্তি করে পুরো বংশতালিকা প্রণয়ন এবং বিবর্তনবাদীদের চিত্রকর্মে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। জোর দাবি জানালেন যে, এটা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। এটা নিয়ে আরও গবেষণা করা উচিত। কিন্তু কে শোনে কার কথা? বিবর্তনবাদীদের কি আর সে সময় আছে? তারা উল্টো william Bryan সাহেবকে নানাদিক থেকে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করতে লাগল।

মজার ব্যাপার হলো, এর কিছু বছর পরে, অর্থাৎ ১৯২৭ সালে ওই দাঁতটি যে প্রাণীর ছিল, গবেষকরা সেটার পুরো কঙ্কালটাই খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়। কঙ্কালটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেল, এটা না মানুষ ছিলো, না উল্লুক। বরং, এই দাঁতটি ছিল আমেরিকার বিলুপ্ত হওয়া একপ্রকার শূকরের।

বিবর্তনবাদীরা একটি শূকরের দাঁতকে জালিয়াতি করে মানুষ এবং এর মধ্যবর্তী প্রজাতির বলে ঘোল খাইয়েছিল। পরে যখন প্রমাণ হয় যে এটা আসলে শূকরের দাঁত, তখন তারা তড়িঘড়ি করে তাদের বিবর্তনবাদের সব সাইট থেকে এই নেব্রাসকা মানবের ইতিহাস নামিয়ে ফেলল। বিজ্ঞানী william Gregory এই ঘটনার ওপরে Science ম্যাগাজিনে নিবন্ধ লিখেছিলেন ‘Hesperopithecus: Not an Ape not a Man’ শিরোনামে।[W.K Gregory, “Hesperopithecus: Apparently Not an Ape not a Man”, Science, Vol-66, December 1927]

ওটা বেঙ্গা : খাঁচার ভেতর অচিন মানুষ

উহু, বিবর্তনবাদী জালিয়াতি কিন্তু এখানেই থেমে যায়নি। চার্লস ডারউইন মনে করতেন, একধরনের উল্লুকের মতো প্রাণী থেকেই আধুনিক মানুষের উৎপত্তি হয়েছে। তিনি তাঁর The Descent Of Man বইতে এমনটাই দাবি করেছিলেন। ডারউইনের এই কল্পনানির্ভর চিন্তা অনেক বিবর্তনবাদীদের মনে দাগ কাটে। তারা ভাবল, যেহেতু উল্লুকজাতীয় কোনো প্রাণী থেকেই আধুনিক মানুষের উৎপত্তি, সেহেতু এখনো তাহলে পৃথিবীতে কিছু ‘অর্ধেক উল্লুক অর্ধেক মানুষ’ জাতীয় প্রাণীর সন্ধান মিলতে পারে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা ‘উল্লুক মানুষ’ খোঁজার মিশনে নেমে পড়ে। ১৯০৪ সালে একজন বিবর্তনবাদী আফ্রিকার কঙ্গো থেকে ‘ওটা বেঙ্গা’ নামের একজন পিগমি (পিগমি হলো আফ্রিকা মহাদেশের অধিবাসীদের একটি দল। এরা খুব বেঁটে ধরনের হয়ে থাকে। এ জন্য এদের সাধারণ মানুষদের চেয়ে খানিকটা ভিন্ন মনে হয়) সম্প্রদায়ের লোককে ধরে আনা হয়। দাবি করা হয় এই ওটা বেঙ্গা নাকি উল্লুক এবং মানুষের মধ্যবর্তী কোনো প্রজাতি। তাকে বিবর্তনবাদীরা শিকল দিয়ে বেঁধে আমেরিকায় নিয়ে আসে। St. Louis World Fair নামক মেলায় তাকে অন্যান্য উল্লুকের সাথে মানুষ এবং উল্লুকের মধ্যবর্তী রূপ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। দুই বছর পরে তাকে নিউইয়র্কের ব্রংক্স চিড়িয়াখানাতে প্রদর্শন করা হয় মানুষের প্রাচীন পূর্বপুরুষ হিসেবে। চিড়িয়াখানায় ওটা বেঙ্গাকে রাখা হয় কিছু শিপ্পাঞ্জি, ডাইনাহ নামের একটি গরিলা ও ডোহাং নামের একটি ওরাংওটাংয়ের সাথে। তার সাথে এমন আচরণ করা হয় যেন সে একটি পশু। বেচারা এই অপমান সহ্য করতে না পেরে পরে আত্মহত্যা করে বসে। খবর পাওয়া যায়, তার এক স্ত্রী এবং দুই সন্তান ছিল।[Philips Verner Bradford, Harvey Blume, “Ota Benga: The Pigmy In the Zoo”, New York, Delta Books 1992]

এভাবে বিবর্তনবাদীদের জালিয়াতির সাক্ষী হতে গিয়ে প্রাণ হারায় ‘পিগমি’ সম্প্রদায়ের এই মানুষটি। অপরাধ হলো শারীরিকভাবে সে একটু বেঁটে।

জোড়াতালির জোয়ার

১৯৭২ সালে কেনিয়ার রুডলফে কিছু টুকরো জীবাশ্ম পাওয়া যায়। এগুলোর নাম হয় Homo Rudolfensis। এই জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী রিচার্ড লেকি। তিনি এই জীবাশ্মের খুলির নাম দেন ‘KNM-ER-1470’। রিচার্ড লেকির মতে, এই জীবাশ্মের বয়স আটাশ লক্ষ বছর এবং এটি নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। রিচার্ড লেকির মন্তব্যকে অনেক নৃতত্ত্ববিদ সমর্থন করে বললেন, এই হাোমো রুডলোফিনসিসের সাথে হোমো হ্যাবিলিসের কোনো পার্থক্য নেই।

রিচার্ড লেকির দাবি ছিল, এই হোমো রুডলোফিনসিসের করোটির আকৃতি অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মতো এবং এর মুখের আকৃতি আধুনিক মানুষের মতো। ব্যস! রিচার্ড লেকি সিদ্ধান্ত দিয়ে বসলেন যে, এটি হোমো রুডলোফিনসিস মানুষ এবং অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মধ্যকার প্রজাতি।

কিন্তু ১৯৯২ সালে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানী Tim Bromage হোমো রুডলোফিনসিসের ওপর গবেষণা করে প্রমাণ করেন যে, রিচার্ড লেকি হোমো রুডলোফিনসিসের যে খুলির নাম ‘KNM-ER-1470’ রেখেছিলেন, সেই খুলিটি আসলে জোড়াতালি দিয়ে লাগানো।[Tim Bromage, New Scientist, Vol- 133, 1992, p- 38-41] খুলিটি মূলত একটি মানুষের। বিজ্ঞানী J.E Cronin, মিশিগান ইউনিভার্সিটির C. Loring Brace এবং জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির Alan Walker সহ প্রথম সারির সকল নৃতত্ত্ববিদরা একমত হলেন যে, এই ‘KNM-ER-1470’ আসলে মানুষ এবং অস্ট্রোলোফিথেইসাইনের মধ্যবর্তী কোনো প্রজাতি নয়; বরং এটি অস্ট্রোলোফিথেসাইন গ্রুপেরই সদস্য।[Allan Walker, Scientific American, Vol- 239 (2), 1978, p-54]

এরপর, যেসব বিবর্তনবাদী সাময়িকী, মিডিয়া এই জীবাশ্মটিকে বিবর্তনবাদের প্রমাণ বলে পোস্টার টানিয়েছিল, তারা সকলে রাতারাতি তাদের পোস্টার নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

Ida-তাদের মোনালিসার উত্থান-পতন

২০০৯ সাল। বিবর্তনবাদ মহলে ঈদের আমেজ। তাদের মতে, তারা তাদের বিবর্তনবাদকে সত্য প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটি পেয়ে গেছে। কী নাম সেটার? সেটার নাম হলো Ida। Ida নামের একটি ফসিলকে বিবর্তনবাদীরা তাদের তত্ত্বটির পক্ষে ইতিহাস-বিখ্যাত প্রমাণ বলে চালাতে লাগল। কেউ কেউ এটাকে বলল, ‘The eighth wonder of the world’। আবার কেউ কেউ এটাকে ‘Our Monalisa’ খেতাবও দিয়ে ফেলেছে ততক্ষণে। তারা জোর গলায় বলতে লাগল, ‘আজ থেকে কেউ যদি দাবি করে যে বিবর্তনবাদের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, তাহলে তারা যেন Ida প্রমাণস্বরূপ উপস্থিত করে।’

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, হিস্ট্রি, ডিসকোভারিসহ সব বিবর্তনবাদী মিডিয়ায় দিনরাত ফলাও করে প্রচার করা হলো তথাকথিত মিসিং লিঙ্ক Ida’র খবর।

কিন্তু মাত্র তিন বছর পরেই, ২০১০ সালে বিবর্তনবাদীদের কান্নার জলে ভাসিয়ে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো এবং ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মিলে প্রমাণ করে দেখালেন যে আসলে কোনো মিসিং লিঙ্ক নয়; বরং এটি Lamour নামক একটি প্রাণীর ফসিলমাত্র।[Missing Link? Ida wasn’t even a close relative say fossil experts, Daily Mail, October 22, 2009]

ব্যস! সাথে সাথে বিবর্তনবাদ দুনিয়া থেকে Ida’র সব রকম চিহ্ন মুছে ফেলা হলো। এত বড় জালিয়াতির পরেও তারা তাদের কল্পিত তত্ত্ব থেকে কোনোভাবে বিশ্বাস হারালো না। এ রকম জালিয়াতি, কপটতা, অসততার পরেও বীরদর্পে বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানীমহলে কেন টিকে আছে পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন।

মানুষের বংশতালিকার ব্যবচ্ছেদ

এবার আমরা দেখে নেব বিবর্তনবাদীদের দাবিকৃত বংশতালিকার ঘাপলাটি। উল্লেখ্য, আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব জীবাশ্মবিদ এবং জীববিজ্ঞানীদের দোহাই দিয়ে আধুনিক মানুষকে ত্রিশ হাজার বছর পূর্বের এবং মনুষ্য প্রজাতিটিকে লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বের বলে বিবর্তনের একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনাকে সত্য হিসেবে ধরে নিয়েছেন। যদিও তিনি বিস্তারিত কোনো আলোচনা করেননি এ বিষয়ে।

বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ বছর আগে, একপ্রকার উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকে আধুনিক মানুষের বিবর্তন শুরু হয়। সেই ক্রম অনুসারে, বিবর্তনবাদীরা মানুষের বংশতালিকাটিকে মৌলিক চার ভাগে ভাগ করে। সেগুলো হলোঃ

১। অস্ট্রোলোফিথেসাইন
২। হোমো হাবিলিস
৩। হোমো ইরেক্টাস
৪। হোমো স্যাপিয়েনস বা আজকের আধুনিক মানুষ।

অর্থাৎ বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, আজ থেকে চল্লিশ বা পঞ্চাশ হাজার বছর আগে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন নামক একপ্রকার উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকেই মানুষের বিবর্তন শুরু হয়। সে অনুসারে, অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মাঝে হালকা কিছু মানুষের বৈশিষ্ট্য প্রথম দেখা যায়। অস্ট্রোলোফিথেসাইন থেকেই মানুষের বিবর্তন সূত্রপাত ধরে নিলেও, তারা অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে হোমো (মানুষ) ক্যাটাগরিতে ফেলল না। তাদের দাবি, অস্ট্রোলোফিথেসাইন উল্লুক শ্রেণির হলেও এরা মানুষের মতো দুই পায়ে হাঁটত যা সাধারণ উল্লুক পারে না। তারা মনে করে, দুই পায়ে হাঁটতে পারাটাই অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মানুষে বিবর্তিত হবার প্রথম পদক্ষেপ। এ জন্য, তারা তাদের বংশতালিকার একেবারে সামনে রাখে এই অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে। এরপর সেই অস্ট্রোলোফিথেসাইন থেকে যেসব প্রজাতি বের হয়েছে, তাদের সবাইকে তারা ‘হোমো’ ক্যাটাগরিতে ফেলল। যেমনঃ হোমো হাবিলিস, হোমো ইরেক্টাস। প্রথমে দেখে নেওয়া যাক অস্ট্রোলোফিথেসাইন কি আসলেই দুই পায়ে হাঁটত কি না।

অস্ট্রোলোফিথেসাইন যে দুই পায়ে হাঁটত, এই দাবি প্রথম উত্থাপন করে Richard Leakey এবং Donald C. Johanson। কিন্তু এরপরে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার দুজন বিশ্ববিখ্যাত জীবদেহ বিশেষজ্ঞ solly Zuckerman এবং Prof. Charles Oxnard অস্ট্রোলোফিথেসাইনের বিভিন্ন প্রজাতির ওপর ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমাণ করেছেন যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন কখনোই মানুষের মতো সোজা হয়ে হাঁটত না।

একজন বিবর্তনবাদী হয়েও, Solly Zuckerman (Solly Zuckerman, Beyond The Ivory Tower, New York, Toplinger Publications, P- 75-94) এবং পাঁচ সদস্যের একটি গবেষকদল ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় পনেরো বছর ধরে অস্ট্রোলোফিথেসাইনের হাড়ের ওপর দীর্ঘ গবেষণা পরিচালনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইনরা কখনোই দুই পায়ে হাঁটত না এবং তাদের বৈশিষ্ট্যের আর সাধারণ উল্লুকদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোনো ফারাক নেই।

এবং এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী, Charles E. Oxnard অকপটে স্বীকার করেছেন যে- অস্ট্রোলোফিথেসাইনরা দুই পায়ে হাঁটতো না। বরং তাদের গঠন বর্তমানের ওরাংওটাং প্রাণীর মতোই।[Charles E. Oxnard, “THe Place of Australopithecines: Ground For Doubts”, Nature, volume-258, P- 389]

তাহলে বিবর্তনবাদীরা যে অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে ‘দুই পায়ে হাঁটার বৈশিষ্ট্য’-এর জন্য মানুষের পূর্বপ্রজাতি বলে দাবি করে, সেই দাবিটা মিথ্যা, ভুল।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের আবির্ভাব প্রমাণের জন্য কতগুলো বিভিন্ন আকৃতির কঙ্কাল বা ক্রমান্বয়ে বড় আকৃতির করোটি দেখিয়ে দেয়াই কি যথেষ্ট? কেউ যদি একটি উল্লুক এবং একজন মানুষের ছবি সামনে রেখে কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে পার্থক্যের একটি বড় তালিকা তৈরি করে ফেলতে পারবে। যেমনঃ চার পায়ের পরিবর্তে দুটি পা, হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, হাতের আকৃতি, লেজের অনুপস্থিতি, গায়ের পশম, ত্বকের রং, মাথার আকার, কথা বলার যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি অনেকগুলো পার্থক্যে মানুষ বিশেষায়িত। অন্যদিকে আমরা জানি, একটি প্রজাতির সবগুলো অঙ্গ পারস্পরিক সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে কাজ করে। সে হিসেবে একটি প্রজাতিকে অন্য প্রজাতিতে পরিণত হতে হলে অনেকগুলো অঙ্গে একই সঙ্গে পরিবর্তন আসতে হবে। কোনো একটি অঙ্গে পরিবর্তন হলে, অন্য একাধিক অঙ্গে আনুষঙ্গিক পরিবর্তন যদি না আসে তাহলে উক্ত প্রজাতিটি বেঁচে থাকার সংগ্রামে টিকে থাকতে পারবে না।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি একটি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির কথাই চিন্তা করি—একটি উল্লুকজাতীয় প্রাণীর বৃদ্ধাঙ্গুলিকে থেকে মানুষের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে পরিবর্তিত হতে হলে কবজির সাথে বৃদ্ধাঙ্গুলির সন্ধিতে (জয়েন্ট) পরিবর্তন আসতে হবে, হাড়ের উচ্চতায় পরিবর্তন আসতে হবে, বৃদ্ধাঙ্গুলির সাথে সংশ্লিষ্ট মাংসপেশির সংখ্যা ও সংযোগস্থলে পরিবর্তন আসতে হবে, সংশ্লিষ্ট স্নায়ু ও রক্তনালিতে পরিবর্তন আসতে হবে এবং মস্তিষ্কের যেই অংশ হাতের নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশে পরিবর্তন আসতে হবে। অর্থাৎ শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির জন্যই মানবশরীরের তিনটি পৃথক তন্ত্রে সুনির্দিষ্ট ও যুগ্ম পরিবর্তন আসতে হবে। সুতরাং যখন ওপরে উল্লেখিত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে বিবেচনা আনা হবে তখন উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের বিবর্তনের গল্পটি রূপকথাকেও ছাড়িয়ে যায়।

এছাড়াও প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মানুষের মতো চিন্তাভাবনার ক্ষমতাসম্পন্ন মস্তিষ্কের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, বেঁচে থাকার সংগ্রামের জন্য দরকার অধিক প্রজননক্ষমতা। অথচ মানুষের উন্নত মস্তিষ্ক এমন একটি অঙ্গ যা খাদ্য উপাদান থেকে সংগৃহীত শক্তির একটা বড় অংশ খেয়ে ফেলে। যার ফল হলো, প্রজননক্ষমতার ব্যবহার কমে যাওয়া। অর্থাৎ বেঁচে থাকার সংগ্রামে উন্নত চিন্তাশক্তিসম্পন্ন মস্তিষ্ক কোনো ‘সারভাইভাল বেনিফিট’ দেয় না। সুতরাং বিবর্তনবাদ মানুষের উন্নত মস্তিষ্কের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। এটা আমাদের কথা না। স্বয়ং বিবর্তনবাদীরাই এ কথা বলছেন। ডিএনএ-এর গঠন আবিস্কারকদের একজন, বিবর্তনবাদী নাস্তিক ফ্রান্সিস ক্রিক বলেন,

“সর্বোপরী আমাদের অত্যন্ত বিকশিত মস্তিষ্ক বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কারের জন্য বিবর্তিত হয়নি; বরং কেবলেই বেঁচে থাকা ও বংশধর রেখে যাওয়ার জন্য আমাদের যথেষ্ট দক্ষ করে তুলতে বিবর্তিত হয়েছে।”[বিশ্বাসের যৌক্তিকতা, রাফান আহমেদ, পৃষ্ঠা নং : ৪১]

অস্ট্রোলোফিথেসাইনের পরে এল হোমো হাবিলিসের পালা। অস্ট্রোলোফিথেসাইনের পরের ধাপ হলো গিয়ে হোমো ইরেক্টাস। এখন অস্ট্রোলোফিথেসাইন থেকে সরাসরি হোমো ইরেক্টাসে লাফ দেওয়া কিন্তু সম্ভব না। কারণ, অস্ট্রোলোফিথেসাইন ‘হোমো’ অর্থাৎ মানুষের ক্যাটাগরির না। এখন উল্লুকশ্রেণির একটি প্রাণী ধপাস করেই যে হোমো ক্যাটাগরির কোনো প্রাণীতে লাফ দেবে, এটা স্বয়ং বিবর্তনেরই নীতিবিরুদ্ধ। তাহলে কী করা যায়? সমাধান হলো মাঝখানে নতুন কোনো গল্প ফাঁদা। মাঝখানের সেই গল্পটির নামই হলো ‘দ্য স্টোরি অফ হোমো হাবিলিস’।

১৯৬০ সালের দিকেই প্রথম হোমো হাবিলিসের ধারণা প্রবর্তন করা হলো। বলা হলো, এদের করোটির আকৃতি আপেক্ষিকভাবে বড়, এরা সোজা হয়ে হাঁটতে পারত এবং এরা কাঠের সরঞ্জামাদি ব্যবহার করত। এ জন্যই এরা মানুষের পূর্বপুরুষ।

কিন্তু ১৯৮০ সালের দিকে নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কার হওয়ার পরে এই ধারণা সম্পূর্ণভাবে পাল্টে গেলো। Bernard Wood এবং C. Loring Brace এর মতো গবেষকরা নতুন জীবাশ্মগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, হোমো হাবিলিসকে আসলে ‘হোমো হাবিলিস’ না বলে ‘অস্ট্রোলোফিকেথাস হাবিলিস’ বলা উচিত। অর্থাৎ এটাকে মানুষের ক্যাটাগরিতে না ফেলে বরং উল্লুকের ক্যাটাগরিতে ফেলাই অধিক যুক্তিযুক্ত এবং পরীক্ষিত। অস্ট্রোলোফিথেসাইন প্রজাতির উল্লুকের সাথে ছিল এদের প্রচুর মিল। এদের লম্বা হাত, খাট পা, উল্লুকের মতো কঙ্কালের গঠন—সবকিছুই অস্ট্রোলোফিথেসাইন প্রজাতির সাথেই মিল। এবং এদের হাত এবং পায়ের আঙুল ছিল গাছে চড়ার উপযোগী। এদের করোটির ধারণক্ষমতা ছিল ৬০০ ঘন সেন্টিমিটার। এদের ছিল উল্লুকের মতোই চোয়াল। মোদ্দাকথা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গবেষকরা বললেন, হোমো হাবিলিস আসলে হোমো ক্যাটাগরির কিছু না। এটা অস্ট্রোলোফিথেসাইন ক্যাটাগরির উল্লুক।

১৯৯৪ সালে Holly Smith নিখুঁত গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, হোমো হাবিলিস আসলে হোমোই না; বরং এটা অস্ট্রোলোফিথেসাইন জাতের উল্লুক। অস্ট্রোলোফিথেসাইন, হোমো হাবিলিস, হোমো ইরেক্টাস এবং হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিসের দাঁতের ওপরে গবেষণা করে তিনি বলেন,

"দাঁতের ওপরে বিস্তারিত গবেষণা এটাই প্রমাণ করে যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন এবং হোমো হাবিলিস আফ্রিকান উল্লুকশ্রেণির।"[Charles E. Oxnard, The place of Australopithecines in human evolution: Ground for Doubts, Nature, Volume-258, P-389]

তাহলে এটাও স্পষ্ট যে, হোমো হাবিলিস আদতে ‘হোমো’ ক্যাটাগরির কোনো প্রাণী নয়; বরং এটি উল্লুকশ্রেণিরই প্রাণীবিশেষ।

এরপর বিবর্তনবাদী গল্পগুলো সরাসরি ‘হোমো’ ক্যাটাগরিতে ঢুকে পড়ে। পরের গল্পগুলো তারা এভাবে সাজায়ঃ হোমো ইরেক্টাস-হোমো স্যাপিয়েনস এবং নিয়ান্ডারথাল মানব-হোমো স্যাপিয়েনস স্যাপিয়েনস। এই প্রজাতিগুলোর বৈশিষ্ট্যে সামান্য বৈসাদৃশ্যের কারণে বিবর্তনবাদী গোষ্ঠী এগুলোকে একেকটা আলাদা আলাদা শ্রেণিতে ফেলে দেয়। আদতে এরা সবাই মানুষ ছিল। এরা ছিল মানবপ্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী। আফ্রিকান একটি জনগোষ্ঠীর সাথে ইউরোপের একটি জনগোষ্ঠীর যে পার্থক্য, একজন পিগমি শ্রেণির মানুষের সাথে একজন রেড ইন্ডিয়ান শ্রেণির যে পার্থক্য, এখানেও পার্থক্যগুলো ঠিক সে রকম। তাই বলে একজন পিগমি সম্প্রদায়ের লোককে ইউরোপের একটি জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ বা পূর্বপ্রজাতি বলা কতটুকু সমীচীন?

যেমন : হোমো ইরেক্টাসের কথাই ধরুন। ‘হোমো ইরেক্টাস’ শব্দের অর্থ হলো ‘খাড়া হয়ে হাঁটা মানুষ’। বিবর্তনবাদীরা এই হোমো ইরেক্টাসকে অন্যান্য জীবাশ্ম থেকে আলাদা করেছে একটিমাত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে। সেটা হলো এটার খাড়া হয়ে হাঁটতে পারার বৈশিষ্ট্য।

মূলত যে মৌলিক কারণ দেখিয়ে বিবর্তনবাদীরা হোমো ইরেক্টাসকে ‘আদিম মানব’ বানিয়ে দেয়, তা হলো এটার করোটির ধারণক্ষমতা এবং বাইরের দিকে বের হয়ে আসা ভ্রূণ।

হোমো ইরেক্টাসের করোটির ধারণক্ষমতা ৯০০-১১০০ সিসি যা আধুনিক মানুষের করোটির ধারণক্ষমতার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম।

কিন্তু কেবল করোটির ধারণক্ষমতার স্বল্পতা এবং বাইরের দিকে বের হয়ে আসা ভ্রুণের ভিত্তিতে একটি জীবাশ্মকে ‘আদিম’ রূপ বলে চালিয়ে দেওয়া আদৌ কি ন্যায়সংগত?

হোমো ইরেক্টাসের সমান খুলিবিশিষ্ট মানুষ তো বর্তমানেও আছে। যেমনঃ আফ্রিকার পিগমি সম্প্রদায়। এদের করোটির ধারণক্ষমতা সাধারণ মানুষের তুলনায় গড়পড়তা হারে কম। আবার বাইরের দিকে বের হয়ে আসা ভ্রূণসমৃদ্ধ মানুষও আজকাল ঢের দেখা যায়। যেমন : অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় অধিবাসী। এদের ভ্রূণ বাইরের দিকে বের হওয়া। এখন এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আমরা কি বলব যে আফ্রিকার পিগমি এবং অস্ট্রেলিয়ার অধিবাসীরা মানুষের পূর্বপ্রজাতি? আদিম মানব?

আরও মজার ব্যাপার, বিবর্তনবাদীরা মনে করে, করোটির ধারণক্ষমতার ওপর মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে। হোমো ইরেক্টাসের করোটি যেহেতু তুলনামূলক ছোট, এ জন্য বিবর্তনবাদীরা অনুমান করে নিয়েছে যে, তাহলে হোমো ইরেক্টাস প্রজাতি বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়েও মনে হয় আধুনিক মানুষের চেয়ে পিছিয়ে।

অথচ আজকের আধুনিক বিজ্ঞান এ কথা অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে যে, করোটির ধারণক্ষমতা বা আয়তনের ওপরে বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে না। বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ গঠনের ওপর।[Marvin Lubenow, Bones of connection, Grands Rapids, Baker 1992, P-83]

বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Richard Leakey বলেছেন,

“আলাদা আলাদা মানবসম্প্রদায়ের পার্থক্যের মতোই হোমো ইরেক্টাস আর আধুনিক মানুষের মাঝে পার্থক্য।”[Richard Leakey, The making of Mankind]

অথচ এ কথা সকলেই জানি যে, আলাদা আলাদা শারীরিক গঠন মূলত লম্বা সময় ধরে ভৌগোলিক দূরত্বে অবস্থানের কারণে হয়ে থাকে।[Richard Leakey, The making of Mankind, P-62]

এখন এই ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে কিছু শারীরিক বৈসাদৃশ্যের কারণে একটা সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা সম্প্রদায়ের বলে চালানো কতটুকু বৈজ্ঞানিক?

হোমো ইরেক্টাসের অস্তিত্ব নিয়ে ২০০০ সালে বিজ্ঞানীদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। Senckenberg সম্মেলনের সেই বিতর্কের বিষয় ছিল হোমো ইরেক্টাস বলে কোনো শ্রেণি আছে কি না। তর্কাতর্কির পরে সেই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, প্রজাতি হিসেবে হোমো ইরেক্টাস বলে আসলে কিছু ছিল না। প্রজাতি হিসেবে বিশ লক্ষ বছর থেকে বিস্তৃত একমাত্র প্রজাতি হোমো স্যাপিয়েনসেরই অন্তর্ভুক্ত।[Pat Shipman, “Doubting Dmanisi”, American Scientist, November-December 2000]

কিন্তু যত যা-ই বলুন আর দেখান না কেন, বিবর্তনবাদী গোঁড়া সম্প্রদায় তাদের মত এবং কল্পনাপ্রসূত ধারণার মধ্যে অনড় থাকবে। বিচার মানবে কিন্তু তালগাছ তাদের।

আমরা দেখতে পেলাম যে বিবর্তনবাদী দৃশ্যপটের প্রত্যেক পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ধাপ্পাবাজি আর জালিয়াতির গল্প। এই গল্পগুলো কেউ তুলির আঁচড়ে আঁকে, কেউ জোড়াতালি লাগায় এবং কেউ মিডিয়া এবং পাঠ্যপুস্তকে মুখরোচক করে উপস্থাপন করে।

বস্তুবাদীদের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে হলে মানুষের উচিত বিজ্ঞানকে ‘দেবতার’ আসন থেকে সরিয়ে দেওয়া। বস্তুবাদীরা ধর্মহীন পৃথিবী গড়ার যে মিশন নিয়ে নেমেছে, বিবর্তনবাদ সেই মিশনের অন্যতম একটি হাতিয়ার। এই বস্তুবাদীদের হাত থেকে বিজ্ঞান এবং ধর্মকে বাঁচাতে হলে চাই আসল বিজ্ঞানের চর্চা।

আরজ আলী মাতুব্বর যেমন কোনো তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই একচেটিয়াভাবে মানুষকে ত্রিশ হাজার বছর আগের বলে চালিয়ে দিয়ে ‘বিবর্তন তত্ত্ব’কে গাছ থেকে আপেল পড়ার মতো সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে আদম (আঃ) কে আদি মানবের লিস্ট থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন, ঠিক সে রকম বিবর্তনবাদী দুনিয়াও বিজ্ঞানকে অপব্যাখ্যা, বিকৃত এবং অর্ধসত্য জিনিসকে প্রচার করে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিবর্তনবাদ আসলে স্বল্প আলোচনার কোনো বিষয় নয়। তবুও স্বল্প আলোচনার মধ্যে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, বিবর্তনবাদীদের বলে বেড়ানো, প্রচার করা তথ্যগুলো আসলে কতটা সত্যি?

তাদের আষাঢ়ে গল্পগুলো সাধারণ মানুষ জানতে পারে না। সাধারণ মানুষ তাদের দেবতা জ্ঞান করে। তারা যা বলে তা-ই বিশ্বাস করে নেয়। এই সুযোগেই তারা তাদের কাল্পনিক গল্পগুলো আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে।