আরজ আলী সমীপে - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ৫/১৩
(০৫) ভূমিকার বিশ্লেষণ
ভূমিকার বিশ্লেষণঃ
আরজ আলী মাতুব্বর উনার লেখা সত্যের সন্ধান বইয়ের শুরুর দিকে বলেছেন,
“জগতে এমন অনেক বিষয় আছে, যেসব বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না।”
প্রথমত, জগতের কোন কোন বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না তা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয়ত, জগতের কিছু কিছু বিষয়ে যে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্ম এক কথা বলে না তা আসলে সত্য। সত্য এ কারণে যে, জগতের সকল বিষয়ে সমানভাবে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্মকে কথা বলতে হয় না। আরজ আলী সাহেব যে ভুলটা শুরুতেই করে বসেছেন তা হলো, তিনি দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্মকে এক করে ফেলেছেন। অথচ, এ কথা স্বীকার্য যে, এই তিনটি বিষয়ের আলোচ্য বস্তু ভিন্ন ভিন্ন।
পদার্থ কী কী দিয়ে গঠিত তা বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। ধর্মে পদার্থের গঠনের সরাসরি কোনো পাঠ নেই। আবার, ব্যভিচার করলে কেন শাস্তি পাওয়া উচিত সে পাঠ ধর্মের, কোনো কোনো দর্শনে কিছু বলা থাকলেও, বিজ্ঞানে তার উত্তর নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে ধর্ম, দর্শন আর বিজ্ঞানের বিষয়াদি এক নয়। এমতাবস্থায়, ভিন্ন ভিন্ন আলোচনার জিনিসকে একই বাটখারায় রেখে পরিমাপ করাটা নিতান্তই বোকামি।
একই পৃষ্ঠায় আরজ আলী সাহেব লিখেছেনঃ
“সাধারণত আমরা যাহাকে ধর্ম বলি তাহা হইলো মানুষের কল্পিত ধর্ম, যুগে মহাজ্ঞানীগণ এই বিশ্বসংসারের স্রষ্টা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য কী তাহা নির্ধারণ করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। স্রষ্টার প্রতি মানুষের কী কোন কর্তব্য নাই, নিশ্চয়ই আছে’–এইরূপ চিন্তা করিয়া তাহারা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য তাহা নির্ধারণ করিয়া দিলেন। অধিকন্তু, মানুষের সমাজ ও কর্মজীবনের গতিপথও দেখাইয়া দিলেন সেই মহাজ্ঞানীগণ। এইরূপে হইলো কল্পিত ধর্মের আবির্ভাব।”
আরজ আলী সাহেব উনার পুরো বইটি জুড়ে দর্শন, বিজ্ঞান আর যুক্তিবোধের জয়গান গাইলেও, বইয়ের শুরুতে কোনরকম তথ্য, উপাত্ত, পরীক্ষালব্ধ প্রমাণাদি ছাড়াই দাবি করে বসলেন যে, ধর্মগুলো কথিত ধর্মগুরুদের বানানো। মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বেই যিনি নিজ বিশ্বাসের ওপর রায় দিয়ে ফলাফল জানিয়ে বসেন, তিনি আমাদের ঠিক কতটুকু “সত্যের সন্ধান দিতে পারেন? ব্যাপারটা অনেকটা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের মতো, যে প্রশাসন, মিডিয়া সবকিছু নিজের আয়ত্তে রেখে জনগণের উদ্দেশে ঘোষণা দেয়—“আসসা, আজ আমি তোমাদের শেখাব সুষ্ঠু নির্বাচন কাকে বলে।” আরজ আলী সাহেবের অবস্থাও ঠিক দুর্নীতিগ্রস্ত সেই সরকারের মতো নয় কি?
মাতুব্বর সাহেব বলেছেন,
“হিন্দুদের নিকট গোময় (গোবর) পবিত্র, অথচ অহিন্দু মানুষ মাত্রেই অপবিত্র। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের নিকট কবুতরের বিষ্ঠাও পাক, অথচ অমুসলমান মাত্রেই নাপাক। পুকুরে সাপ, ব্যাঙ মরিয়া পচিলেও উহার জল নষ্ট হয় না, কিন্তু বিধর্মী মানুষ ছুইলেই উহা হয় অপবিত্র। কেহ কেহ একথা বলেন যে, অমুসলমান পর্ব উপলক্ষ্যে কলা, কচু, পাঠা বিক্রিও মহাপাপ। এমনকি মুসলমানের দোকান থাকিতে হিন্দুর দোকানে কোনকিছু ক্রয় করাও পাপ। এই কী মানুষের ধর্ম? না ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা?”
আরজ আলী সাহেব শুরুতেই হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে যে অভি্যোগ টেনেছেন কতটুকু সত্য আমি জানি না। তবে হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা সম্পর্কে কিছু ধারণা বৈকি! সে মতে উচ্চবর্ণের কোনো হিন্দু নিম্নবর্ণের কোনো হিন্দুর পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাকেও পাপ মনে করে। এমনকি একটা সময়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পড়া দূরে থাক, ছোঁয়াটাও নিষিদ্ধ ছিল পুরোহিত কর্তৃক। পুরোহিততন্ত্রের এই বিধান এখনো হিন্দুধর্মে বলবৎ আছে কি না জানি না, তবে ভারতের অনেক জায়গায় এই রীতির এখনো চর্চা হতে পারে।
আরজ আলী সাহেব যে ভুলটা করেছেন তা হলো, তিনি হিন্দুধর্মের এই কালচারের সাথে ইসলামও গুলিয়ে ফেলেছেন। উনি বলেছেন, মুসলমানদের কাছে অমুসলমানমাত্রই নাপাক। কিন্তু ইসলামের দিকে তাকালে আমরা ঠিক এর বিপরীত চিত্রটাই দেখতে পাই।
আমরা সকলেই জানি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোটবেলাতেই বাবা-মা দুজনকে হারিয়েছিলেন। তখন থেকেই তিনি তাঁর আপন চাচা আবু তালিবের গৃহে বড় হন। চাচা আবু তালিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের আপন ছেলের মতোই দেখাশুনা করেন। বড় করেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা আবু তালিব কিন্তু মুশরিক ছিলেন। এমনকি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্তও তিনি ঈমান আনেননি। আরজ আলী সাহেবের মতে, ইসলামে অমুসলিমমাত্রই যদি অপবিত্র হবে, তাহলে ইসলামের সর্বশেষ নবীকে আল্লাহ তাআলা চাচা আবু তালিবের বাসায় রেখে কেন বড় করে তুলবেন? একজন অপবিত্র লোকের সোহবতে? আশ্চর্য না ব্যাপারটা?
এমনও প্রমাণ পাওয়া যায়, চাচা আবু তালিবের মৃত্যুশয্যায় উনার পাশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত ছিলেন এবং উনাকে কালেমা পাঠ করার জন্য অনুরোধ করেন। এখন, ইসলামে অমুসলিম ব্যক্তিমাত্রই যদি অপবিত্র হয়, নাপাক হয়, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে উনার চাচা, যিনি একজন মুশরিক ছিলেন, তার নিকট অবস্থান করেন?
মূলত আরজ আলী সাহেব এই জায়গায় এসে যে ভুলটা করেছেন সেটা হলো, ইসলামের পাক-নাপাকের যে কনসেপ্ট, সেই কনসেপ্টে ভদ্রলোক গুলিয়ে ফেলেছেন।
পবিত্র কুরআনে মুশরিকদের যদিও অপবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে,
"হে মুমিনগণ, মুশরিকরা অপবিত্র। কাজেই তারা যেন এ বছরের পর আর কখনোই মসজিদুল হারামের কাছে না আসতে পারে।"[১]
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এখানে মুশরিকরা অপবিত্র বলতে তাদের শারীরিক অপবিত্রতার কথা বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়। এখানে যে অপবিত্রতা-এর কথা বলা হয়েছে তা শারীরিক নয়; বরং আত্মিক। এবং সকল প্রসিদ্ধ তাফসীরে এই কথাটাই জোরালোভাবে বলা হয়েছে। যেমন : তাফসীরে মারেফুল কুরআনে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে,
"আসলে এখানে দৈহিক নয়; বরং আত্মিক অপবিত্রতার কথাই বলা হচ্ছে। তাদের শরীর নোংরা, একথা বলা হয়নি। এটা কুরআনের বিশেষ বাচনভঙ্গি।"[২]
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আত্মিক অপবিত্রতাটাই আবার কী রকম? আর মুশরিকরা কেন আত্মিকভাবে অপবিত্র? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের জানতে হবে ইসলামের একেবারে গোড়ার কনসেপ্ট। ইসলাম যে মূল ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে সেটা হলো তাওহীদ। তাওহীদ’ শব্দের অর্থ : ‘একত্ববাদ’।
ইসলামে একমাত্র উপাস্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। এর বাইরে আর দ্বিতীয় কোনো উপাস্য ইসলামে নেই। আল্লাহর বাইরে অন্য কারও ইবাদাত করা ইসলামে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাপ। এটা এমন পর্যায়ের পাপ, যার কোনো ক্ষমা নেই। ইসলামে আল্লাহই যে একমাত্র উপাস্য সত্তা, কুরআনের বহু জায়গায় তার উল্লেখ আছে। যেমনঃ
“তাঁর কোনো শরীক নেই।” [৩]
“তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।”[৪]
ইসলামে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য চাওয়াও শির্কের পর্যায়ভুক্ত। যেমন : সূরা ফাতিহায় বলা হচ্ছে,
“আমরা তোমারই ইবাদাত করি আর কেবল তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।”[৫]
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইসলামে একমাত্র উপাস্য কেবল আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা। তাঁর বাইরে অন্য কারও পূজা, ইবাদাত করা ইসলামে হারাম ও শির্ক। কিন্তু মুশরিকদের ধর্মীয় নিয়ম তার উল্টো। মুশরিকরা একই সাথে অনেক দেব-দেবীর পূজা করে। তাওহীদের যে কনসেপ্ট, তার একেবারে বিপরীত তাদের অবস্থান।
ইসলামের দৃষ্টিতে যারা তাওহীদবাদী, যারা কেবল আল্লাহকেই একমাত্র উপাস্য হিসেবে মানে, যারা কেবল আল্লাহরই ইবাদাত করে, তারা মনের দিক থেকে পবিত্র। আর যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য অনেকগুলো দেব-দেবীর পূজা করে, উপাস্য জ্ঞান করে, তারা মনের দিক থেকে অপবিত্র। এমতাবস্থায় হারাম শরীফের মতো মুসলিমদের পবিত্র জায়গায় একই সাথে তাওহীদবাদী এবং মুশরিকদের অবস্থান থাকতে পারে না। তাই কুরআন মুশরিকদের আত্মিক দিক থেকে অপবিত্র ঘোষণা করে বায়তুল হারামে তাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এটাকে আরজ আলী সাহেব শারীরিক অপবিত্রতার সাথে গুলিয়ে বলেছেন, “অমুসলমান ছুঁইলেই ইহা অপবিত্র হয়।”
মুশরিকদের যদি শারীরিকভাবে অপবিত্র ঘোষণা করা হতো, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই চাচা আবু তালিবের সাথে এ রকম মেলামেশা করতেন না। তিনি অবশ্যই অমুসলিমদের সাথে চুক্তি করতেন না। এ ছাড়াও, ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে এ রকম অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে, যেখানে মুসলিমরা অমুসলিমদের সাথে বসবাস করত, ব্যবসা-বাণিজ্য করত। এমনকি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম যে ঘটনা, “মদিনা সনদ”ই তো করা হয়েছে ইয়াহুদীদের সাথে।
আরজ আলী সাহেব বলেছেন, ইসলামে নাকি মুসলমানদের দোকান থাকতে হিন্দুর দোকান থেকে কোনো কিছু ক্রয় করাও পাপ। এই ফতোয়াটাও আরজ আলী সাহেব ঠিক কোথায় পেয়েছেন বা কার কাছে শুনেছেন আমি জানি না। তবে, ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ আল বুখারীতে উল্লেখ করেছেন,
আবদুর রহমান ইবন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তখন এক মুশরিক ব্যক্তি তার কিছু ভেড়াসহ আমাদের কাছে এল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এগুলো কি বিক্রির জন্য নাকি হাদিয়ার জন্য?' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের জন্য ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ভেড়া ক্রয় করে নিলেন।"[৬]
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরজ আলী সাহেব ‘অমুসলিম ব্যক্তিমাত্রই নাপাক, তাদের কাছ থেকে কিছু কেনাও যাবে না’ মর্মে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দাঁড় করিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। বরং আমরা জানলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিজীবনে অমুসলিম পরিবারে বড় হয়েছেন, অমুসলিমদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন, চুক্তি করেছেন, ক্রয়-বিক্রয় করেছেন। এতদসত্ত্বেও, ইসলামের বিরুদ্ধে এ রকম ভিত্তিহীন, বানোয়াট, মনগড়া অভিযোগ আনার হেতু কী তা কি আরজ আলী সাহেবের ভক্তকুল আমাদের জানিয়ে বাধিত করবেন?
আরজ আলী মাতুব্বর অভি্যোগ তুলেছেন এই মর্মে যে, ধর্ম নাকি জ্ঞান অর্জনে বাধা প্রয়োগ করে। তিনি বলেছেন,
“এই যে জ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা, মনের অদম্য স্পৃহায় আঘাত, আত্মার অতৃপ্তি, ইহারই প্রতিক্রিয়া মানুষের ধর্মকর্মে শৈথিল্য। এক কথায়—মন যাহা চায় ধর্মের কাছে তাহা পায় না। মানুষের মনের ক্ষুধা অতৃপ্তই থাকিয়া যায়। ক্ষুধার্ত বলদ যেমনি রশি ছিড়িয়া অন্যের ক্ষেতের ফসলে উদর পূর্তি করে, মানুষের মনও তেমন ধর্ম ক্ষেত্রের সীমা অতিক্রম করিয়া ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য ছুটিয়া যায় দর্শন আর বিজ্ঞানের কাছে।”
আরজ আলী সাহেবের এই কথাগুলো মোটাদাগে অন্য ধর্মের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলতে পারি না, কিন্তু ইসলামের সাথে এর ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নেই।
হিন্দুধর্মে একটা সময়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ স্পর্শও করতে পারত না। শুধু ব্রাম্মণরাই পুজো-অর্চনা, উপাসনা করতে পারত। খ্রিষ্টধর্মের চার্চ কর্তৃক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের ওপর খড়গহস্তে নেমে পড়ার কাহিনিও সবার জানা। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এ রকম কোনো ঘটনা নেই যেখানে ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে; বরং ইসলাম বরাবরই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে এসেছে। বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান সর্বজনবিদিত। চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের রয়েছে অভূতপূর্ব অবদান। অন্ধকার ইউরোপে সর্বপ্রথম আলোকবর্তিকা হাতে ইসলাম প্রবেশ করেছে। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য—সবখানে মুসলিমদের ছিল জয়জয়কার।
আল-কুরআনে জ্ঞানার্জনের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল-কুরআন নাজিলের প্রথম যে শব্দ, সেই শব্দ ছিল—পড়ো। যে জানে এবং যে জানে না তাদের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে কুরআন বলেছে—
“যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি কখনো সমান হতে পারে?”[৭]
সুন্দর একটি পার্থক্য টেনে কুরআন বুঝিয়ে দিলো যে, যারা জানে তারা উত্তম তাদের চেয়ে, যারা জানে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।”[৮]
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন বহু মুসলিম বিজ্ঞানীর নাম আমরা দেখতে পাই যারা তাদের কর্মের মাধ্যমে বিজ্ঞান, দর্শনজগতে অবদান রেখেছিলেন। তাদের নাম সারা বিশ্বের মানুষ স্মরণ রেখেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় অবদানের কথা স্বীকার করতে গিয়ে বর্তমান সময়ের বিখ্যাত নাস্তিক রিচার্ড ডকিন্স একবার টুইট করেছিলেন এই বলে : “1000 years ago, the Islamic golden age embraced all the world’s learning, books & science. Can we have a new Islamic golden age, please?”[৯]
নাস্তিকরাও একথা অকপটে স্বীকার করে যে, ইসলাম কখনোই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার, বিরুদ্ধে ছিল না; বরং জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সম্প্রসারিত করার জন্য ইসলাম যা করেছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম তা করেনি। তা ছাড়া, ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের যে দ্বন্দ্বের কথা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেছেন, তা কতটুকু সত্য, যেখানে ফ্রান্সিস বেকন, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও, আইনস্টাইন এবং নিউটনের মতো বিজ্ঞানীরা ধর্ম এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন?
আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,
“অধিকাংশ ধর্ম এবং ধর্মের অধিকাংশ তথ্য অন্ধবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”
এবার অবশ্য আরজ আলী সাহেব ঠিক কথা বলেছেন। ধর্মের কিছু তথ্য অবশ্যই বিশ্বাসের ওপরে নির্ভর করে, যেমন : আল্লাহতে বিশ্বাস, জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাস, আখেরাত, ফেরেশতা ইত্যাদিতে বিশ্বাস। একজন মুসলিম এ সবকিছু না দেখেই বিশ্বাস করে। পবিত্র কুরআনের শুরুতেই বলা হয়েছে,
“যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।”[১০]
ঈমানের মূল হচ্ছে গায়েবে বিশ্বাস। এমন কিছুতে বিশ্বাস করা যা দেখা যাচ্ছে না, ধরা যাচ্ছে না, ছোঁয়া যাচ্ছে না। মানুষ চাইলেই পৃথিবীতে বসে আল্লাহকে দেখতে পাবে না। সে চাইলেই জান্নাত-জাহান্নাম অবলোকন করতে পারবে না ফেরেশতাদের সাথে মতবিনিময় করতে পারবে না। সে পারবে না, কারণ–সে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে বন্দী। সেটা কী রকম?
সেটা হচ্ছে মানুষ সময়ের বাইরে কল্পনা করতে পারে না। সে সময়ের ফ্রেমে বন্দী। সে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই তিন ফ্রেমের মধ্যে বন্দী পাখির মতো। সে চিন্তা করতে পারে অতীতে কী হয়েছিল তা নিয়ে। সে চিন্তা করতে পারে আজ কী হচ্ছে তা নিয়ে। সে চিন্তা করতে পারে আগামীকাল কী হতে পারে তা নিয়ে। কিন্তু এই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের বাইরে এসে কোনো কিছুই সে কল্পনা করতে পারে না। কারণ, সে টাইম-ফ্রেমের মধ্যে বন্দী। কিন্তু বাই ডেফিনেইশান, স্রষ্টা কোনো টাইম-ফ্রেমে বন্দী নন। তিনি ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
মানুষের সীমাবদ্ধতার দরুন সে বাহ্যিক জগতেও অনেক কিছু দেখতে পায় না, অনেক কিছু শুনতে পায় না। যেমন ধরুন মানুষের চোখ। সাধারণত ৩৯০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো মানুষ দেখতে পারে। এরচেয়ে কম বা এরচেয়ে বেশি আলো মানুষ দেখতে পারে না। কেন পারে না? এটা মানুষের সীমাবদ্ধতা।
আবার ধরুন মানুষের কান। সাধারণত 20Hz-20,000Hz এর মধ্যে থাকলেই কেবল আমরা শব্দ শুনতে পাই। এরচেয়ে কম বা বেশি হলে সেই শব্দ আমরা শুনতে পাই না। কেন শুনতে পাই না? আমাদের সীমাবদ্ধতা।
এত এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা কীভাবে আশা করি যে স্রষ্টা আমাদের ল্যাবের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এসে ধরা দেবেন? মানুষকে স্রষ্টা এই ক্ষমতা দেননি। এ জন্য তিনি বলেছেন তাকে না দেখে বিশ্বাস করতে হবে। তবে কি মানুষ কখনোই স্রষ্টাকে দেখবে না? অবশ্যই দেখবে। তবে সেটা নির্দিষ্ট সময়ে। সেটি কোন সময়? আখেরাত।
কড়া বা হালকা বিজ্ঞানমনস্করা এতটুকু পড়ে হয়তো-বা আমাকে দু-চারবার মনে মনে গালমন্দ করে ফেলেছেন। বলছেন, “না দেখে আবার বিশ্বাস কী!”
বিজ্ঞানকে যারা দেখে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত অথবা যারা যারা Seeing is believing তত্ত্বানুরাগী, তাদের জন্য আমাদের কাছে রয়েছে মহা দুঃসংবাদ। দুঃসংবাদটি হলো, বিজ্ঞান নিজেও এখন আর Seeing is believing তত্ত্বে বিশ্বাস করে না। কারণ, এতদিন ধরে যারা ‘মহাবিশ্বকে জেনে ফেলেছি, বুঝে ফেলেছি’ বলতে বলতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেন, তাদের জন্য ভয়ংকর দুঃসংবাদ শোনাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’।
তারা বলছে, এতদিন ধরে, এত বছর শ্রমসাধনা করে আমরা মহাবিশ্বের যতটুকু জেনেছি সেটার পরিমাণ খুবই ক্ষুদ্র। NASA স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, আমাদের জানার পরিমাণ মাত্র ৫% এরও কম। বাকি ৯৫ % তাহলে কী? বাকি ৯৫% ডার্ক ম্যাটার বা ‘অদৃশ্য বস্তু’। এই ৯৫ % অদৃশ্য বস্তু নিয়েই আমাদের সমগ্র মহাবিশ্ব পরিবেষ্টিত। কিন্তু এই অদৃশ্য বস্তুগুলোকে আমরা বুঝতে পারছি না। দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের শত শত বছরের উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করেও আমরা জানতে পারছি না এই অদৃশ্য বস্তু আসলে কী আর এখানে কী হয়।
NASA-এর বিজ্ঞানীরা বলছে,
"More is unknown than is known. No one expected this, no one knew how to explain it. But something was causing it. It is a complete mystery. But it is an important mystery."
তাদের মতে, ‘এটা যতটুকু না জানা গেছে তারচেয়ে বেশি অজানা।’
তাহলে, এই অজানা বস্তুকে আমরা কী করব? বিজ্ঞানীরা কী করবেন? পদার্থবিজ্ঞানীরা কী করবেন? এগুলোকে অস্বীকার করবেন? ‘নাই নাই’ বলে পাশ কাটবেন? একদম না। বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে হলে তাদের এই বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য বস্তুকে ‘বিশ্বাস’ করে আগাতে হবে। ধরে নিতে হবে যে—‘আছে। এরা আছে।’
ব্যাপারটাকে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন ডক্টর জাফর ইকবাল। মানুষ যে আদতে প্রকৃতির সব রহস্য ভেদ করতে পারবে না, তা এখনকার বিজ্ঞান অকপটে স্বীকার করে। অধ্যাপক জাফর ইকবাল তাঁর লেখা কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইতে লিখেছেন,
“কাজেই যারা বিজ্ঞান চর্চা করে তারা ধরেই নিয়েছে আমরা যখন বিজ্ঞান দিয়ে পুরো প্রকৃতিটাকে বুঝে ফেলবো, তখন আমরা সবসময় সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। যদি কখনো দেখি কোনো একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছি না, তখন বুঝতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানটা তখনো জানা হয়নি। যখন জানা হোবে তখন সেটা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। এককথায়, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বা ভবিষ্যদ্বাণী সবসময়েই নিখুঁত এবং সুনিশ্চিত, কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের এই ধারণাটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করে যে, প্রকৃতি আসলে কখনোই সবকিছু জানতে দেবে না। সে তার ভিতরের কিছু কিছু জিনিস মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। মানুষ কখনোই সেটা জানতে পারবে।। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এটা কিন্তু বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা অসম্পূর্ণতা নয়। এটাই হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানীরা একটা পর্যায়ে গিয়ে কখনোই আর জোরগলায় বলবেন না ‘হবে’, তারা মাথা নেড়ে বলবেন—‘হতে পারে’।”[১১]
অধ্যাপক জাফর ইকবালের কথার সারমর্ম এই যে, বিজ্ঞানীরা কোনোদিনও প্রকৃতির সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারবেন না। এই না পারাটা কি বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের অক্ষমতা? জাফর ইকবাল বলছেন, ‘না। এটা বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটাই বিজ্ঞানের ধর্ম।’ বিজ্ঞানীরা আর উঁচু গলায় বলতে পারবেন না যে—‘হবে’। তাদের বলতে হবে—‘হতে পারে’।
এই হচ্ছে বিজ্ঞানের অবস্থা। এই যে প্রকৃতির কিছু রহস্য বিজ্ঞান উদঘাটন করতে পারছে না বা পারবে না, তার মানে কি আমাদের ধরে নিতে হবে যে এগুলোর অস্তিত্ব নেই? নাহ। বিজ্ঞান মোটেও তা বলে না। বিজ্ঞান সেই না-জানা, না-দেখা, না-বুঝতে পারা রহস্যতেও ঈমান আনে। বিশ্বাস করে। বিজ্ঞান এভাবেই আগায়। বিজ্ঞানকে এভাবেই আগাতে হয়। সুতরাং আরজ আলী সাহেবের মতে শুধু ধর্মই ‘বিশ্বাস’ নিয়ে আগায় না, তাদের পরম পূজিত বিজ্ঞানও আধুনিককালে এত্তোগুলোতে ঈমান নিয়ে চলে। এই ঈমান ছাড়া তারা এগুতে পারে না।
এই অধ্যায়ের শেষের দিকে আরজ আলী সাহেব আরও মজার বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তিনি লিখেছেন,
“আজকাল যেখানে-সেখানে শোনা যাইতেছে যে, সংসারে নানা প্রকার জিনিসপত্র হইতে বরকত উঠিয়া গিয়াছে। কারণ লোকের আর পূর্বের মতো ঈমান অর্থাৎ বিশ্বাস নাই। পূর্বে লোকের ঈমান ছিলো, ফলে তাহারা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করিতো। আর আজকাল মানুষের ঈমান নাই। তাই তাহাদের অভাব ঘোচে না। ঈমান নাই বলিয়াই ক্ষেতে আর সাবেক ফসল জন্মে না। ফলের গাছে ফল ধরে না। পুকুরে-নদীতে মাছ পড়ে না। ঈমান নাই বলিয়াই মানুষের ওপর গজবরূপে কলেরা, বসন্ত, বন্যা-বাদল, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি নানা প্রকার বালা-মুছিবত নাজেল হয়। অথচ মানুষের হুঁশ হয় না। এইরূপ যে নানা প্রকার অভাব-অভিযোগের জন্য ঈমানের অভাবকেই দায়ী করা হয়, তাহা কটোটুকু সত্য?”
আরজ আলী সাহেবের বক্তব্য হলো, মুসলিমগণ বিশ্বাস করে যে, ঈমান কমে গেলে আয়-রোজগার, সাংসারিক জিনিসপত্রাদি থেকে ‘বরকত’ উঠে যায়। আর আলী সাহেবের এই কথা শুনে আমার দাদির কথা মনে পড়ে গেল। আমার দাদি ছিলেন অশিক্ষিত, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন এক গ্রাম্য মহিলা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো ছিলই না, আমার দাদি যে অন্ততপক্ষে স্বশিক্ষিত ছিলেন, এমনটাও না। ছোটবেলায় দাদির কাছে ঠিক এ রকম গল্পই শুনতাম আমরা। মানুষের ঈমান চলে যাচ্ছে বলেই সংসারের আয়-রোজগারে ভাটা পড়ছে, রোগে-শোকে ধরছে। দাদির মতে, এসবের পেছনে একটাই কারণ—ঈমানের ঘাটতি।
কিন্তু বড় হয়ে যখন আমি ধর্মতত্ত্ব পড়া শুরু করলাম, ধর্মীয় বইপত্র অধ্যয়ন শুরু করলাম, সবিস্ময়ে লক্ষ করলাম, এতদিন দুঃখ-দুর্দশা আর আয়-রোজগার থেকে বরকত উঠে যাওয়ার জন্য ঈমানের যে ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছিল, তা সম্পূর্ণ বিপরীত।
আমি যতদূর জানি, আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবেরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। নিজে নিজে অনেকদূর পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। শোনা যায়, বরিশাল বি.এম কলেজের পাঠাগারে থাকা মোটা মোটা দর্শন, বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা আর ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন ভদ্রলোক। এতৎসত্ত্বেও, কেন তিনি মফস্বলে অশিক্ষিত মানুষগুলোর লোকমুখে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারকে ইসলামের সাথে বেঁধে দিয়ে প্রশ্ন ছুড়েছেন, সেটাই আমি বুঝতে পারছি না।
তাঁর মতে, মুসলিমদের বিশ্বাস হলো, ঈমান দুর্বল হলে সংসারের আয়-বরকত কমে যায়। আমার প্রশ্ন হলো, এই জগৎ-সংসারে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরচেয়ে বেশি ঈমানদার, বেশি পরহেযগার, বেশি তাকওয়াবান, বেশি আমলকারী লোক আর কেউ ছিল কি? যদি না থাকে, তাহলে এই সর্বোচ্চ ঈমানদার, সর্বোচ্চ পরহেযগার, সর্বোচ্চ তাকওয়াবান, সর্বোচ্চ আমলকারী ব্যক্তির ঘরে কেন এক দিন চুলোয় আগুন জ্বললে চার দিন জ্বলত না? কেন তাঁকে খেজুর পাতার চাটাইয়ে শুতে হতো, যার ফলে তাঁর পিঠে, হাতে, ঘাড়ে দাগ পড়ত? তাঁর কি ঈমানের ঘাটতি ছিল? যদি না থাকে তাহলে কেন তাঁকে অনাহারে থাকতে হতো? কেন নবীনন্দিনী ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর পুত্রদের খেতে দিতে পারতেন না?
তাহলে দেখা যাচ্ছে, রুযী-রোজগার বৃদ্ধি-ঘাটতি সব সময় ঈমানের ওপর নির্ভর করে না, আর অভাব-অনটন, দুর্দশা ইত্যাদিও সর্বদা দুর্বল ঈমানের ফল নয়। বরং অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশা ইত্যাদি হলো মজবুত ঈমানের ফল। যার ঈমান যত পাকাপোক্ত, তার জন্য পরীক্ষাও তত বেশি, তত কঠিন। যার জ্বলন্ত উদাহরণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন,
“দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফেরদের জন্য জান্নাতের মতো!”[১২]
জেলখানা কেমন? খুব কি আরামের জায়গা? নাকি কষ্টের? অবশ্যই জেলখানা কষ্টের জায়গা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের জন্য দুনিয়াকে সেই কষ্টের জায়গা জেলখানার সাথে তুলনা করেছেন। আর জান্নাত কেমন? জান্নাত হচ্ছে আরামদায়ক জায়গা। যেখানে কষ্ট নেই, দুঃখ নেই, ক্লান্তি নেই, অভাব-অনটন কিছু নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের জন্য দুনিয়াকে জান্নাতের সাথেই তুলনা করেছেন।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে, দুনিয়ায় যে যত বেশি ঈমানদার, সে তত বেশি পরীক্ষার মধ্যে থাকবে। দুঃখ-কষ্টের পরীক্ষা, রোগ-শোকের পরীক্ষা ইত্যাদি। আর যার ঈমান নেই, তার পরীক্ষা কম। সে সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে। তাহলে এখান থেকে আমরা দেখতে পেলাম, ইসলামী বিশ্বাস হিসেবে ‘ঈমান দুর্বল থাকলে বা কমে গেলে বরকত উঠে যায়’ মর্মে যে তত্ত্ব আরজ আলী সাহেব আমাদের গিলাতে চেয়েছেন, তার সাথে মূল ইসলামের ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নাই; বরং আসল কাহিনি আরজ আলী যা বলেছেন তার বিপরীত।
এ জন্য দুনিয়ার সামগ্রী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টভঙ্গি হচ্ছে, তা ধোঁকার সামগ্রী। এটা দিয়েও আল্লাহ কাউকে পরীক্ষা করেন, আবার না দিয়েও পরীক্ষা করেন। ভালো-মন্দ উভয় অবস্থাই ঈমানদারের জন্য পরীক্ষার বিষয়। যেমন কুরআনে বলা হচ্ছে,
‘আর আমি পরীক্ষা করি সুখ এবং দুঃখ দিয়ে যাতে তারা ফিরে আসে।’[১৩]
বরং আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে যদি সব মানুষ কাফের হওয়ার আশঙ্কা না থাকত তাহলে তিনি কাফেরদের ঘর-বাড়ি স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে মুড়িয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি দুনিয়াতেও তাদের পরিমিত প্রদান করেন।[১৪] তবে কখনো কখনো ঈমান ও তাকওয়া থাকলে আল্লাহ তার আকাশস্থিত বরকত ও যমীনস্থ প্রভূত কল্যাণের দ্বার উন্মোচন করেন বলে ঘোষণা করেছেন।[১৫] সেটাও মূলত পরীক্ষা। সুতরাং ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এসবকে ঈমানদার পরীক্ষার সামগ্রী হিসেবেই গ্রহণ করে। কাউকে ধন-সম্পদ দিলে তাকে ভালোবাসার প্রমাণ যেমন নয়, তেমনি না দিলে ভালো না-বাসার প্রমাণও তা নয়। কাফের মুশরিকরাই শুধু দুনিয়ার জীবনের প্রাচুর্যকে স্রষ্টার ভালোবাসার নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।[১৬]
ঈমানদারের দৃষ্টি আখেরাতের দিকে হওয়ার কারণে সে প্রাচুর্য দেখলে সর্বদা ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে, না জানি তার আখেরাতের হিসাব শূন্য হয়ে গেল! পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হচ্ছে,
কেউ পার্থিব সুখ সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছা সত্ত্বর দিয়ে থাকি; পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি যেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত এবং অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত অবস্থায়।[১৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম[১৮] এবং আমাদের পূর্বসূরি সাহাবায়ে কিরামও এমনটি বলেছেন।[১৯]
ইসলামের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ টানার পরে তিনি চীন, রাশিয়াসহ প্রভৃতি উন্নত দেশের উদাহরণ টেনে বোঝাতে চাইলেন, এই সমস্ত দেশের মানুষের কোনো ধর্ম নেই। থাকলেও তারা আল্লা-বিল্লা করে না। তথাপি, তাদের সংসার সোনায় সোহাগা। তাদের ব্যাংক-ব্যালেন্স ভর্তি টাকা-পয়সা, ইয়া বড় বড় অট্টালিকা। তাদের দেশে রোগ-শোক কম। টাইফয়েড, কলেরার মতো মহামারি অনেক আগেই সেখান থেকে তল্পিতল্পা নিয়ে বিদেয় হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের মতো যে সকল গরিব দেশের মানুষ আল্লা-বিল্লা করে, তারা কেন গরিব হবে? তাদের কেন না খেয়ে মরতে হবে? তাদের কেন বাড়ি নেই, গাড়ি নেই? এই সকল দেশে কেন কলেরা-টায়ফয়েডের মতো রোগ মহামারিরূপে দেখা দেবে?
আরজ আলী উনার সেই আগের ভুলের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। উনি মনে করেছেন। আল্লা-বিল্লা করলে আর পাক্কা মুমিন হলেই বুঝি আকাশ থেকে টাকার বস্তা ধপাস করে উঠোনে এসে পড়ে!
আরজ আলী সাহেবদের এসব অভিযোগ পুরোনো। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের কাফেররাও এই প্রশ্নগুলো করত। তাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“কাফিরদের নিকট পার্থিব জীবনকে মোহনীয় করা হয়েছে। ফলে তারা মুমিনদের বিদ্রুপ করে থাকে। বস্তুত কিয়ামতের দিন মুত্তাকীগণ তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দিয়ে থাকেন।”[২০]
আল্লাহ বলছেন, যারা কাফের, তাদের সামনে তিনি দুনিয়াকে মোহনীয় করে দিয়েছেন। ফলে দুনিয়ালাভের প্রতি্যোগিতায় তারা বিভোর। এতই বিভোর যে, মুত্তাকীদের উদ্দেশে তারা এই আরজ আলী সাহেবদের মতো বিদ্রুপাত্মক প্রশ্ন করে, “তোমরা তো খুব আল্লা-বিল্লাহ করো; কই, তোমাদের কষ্ট তো লাঘব হয় না? অথচ আমরা এর কিছুই করি না। দেখো, আমরা কত সুখে আছি।”
আল্লাহ পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছেন, “বস্তুত কিয়ামতের দিন মুত্তাকীগণ তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে। অন্য আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও সুস্পষ্ট করে বলছেন,
“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। অতএব (হে রাসূল), আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন।”[২১]
সুতরাং এই আয়াত থেকেও এটা সুস্পষ্ট যে, ভয়-ক্ষুধা-মৃত্যু-জীবন আর ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি কখনোই দুর্বল ঈমানের কারণ নয়; বরং তা আল্লাহর কাছ থেকে ঈমানদারদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।
আরজ আলী সাহেবেরা যে ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করে ইসলামকে একহাত নেয়ার চেষ্টা করে, সেই ইসলাম গ্রামের কুসংস্কার বৈ কিছু নয়। আসল ইসলামের সাথে এর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু সেই কুসংস্কারকে লক্ষ্যবস্তু ধরে আরজ আলী সাহেবেরা যখন ধর্মতর্কে আসেন, তখন আমরা সেটাকে নিছক ছেলেমানসি ছাড়া কীই-বা বলতে পারি?
এ রকম আরও অনেক হাস্যকর যুক্তি তর্ক আমরা সামনে দেখতে পাব। এই অধ্যায়ের শেষে উনি আরও যে কয়টি হাস্যকর তথ্য ইসলামের নামে ছুড়ে দিয়েছেন তা সংক্ষেপে আলোচনা করছি।
তিনি লিখেছেন,
“বলা হয় যে, আল্লাহর অসাধ্য কোনো কাজ নাই। বিশেষ বিশ্বাসী ভক্তদের অনুরোধে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেন। সোলায়মান নবী নাকি সিংহাসনে বসিয়া সপরিষদ শূন্যে ভ্রমণ করিতেন। তাই বলিয়া ‘আল্লাহ তা’লা ইচ্ছা করিলে জায়নামাজশুদ্ধ আমাকেও নিমেষের মধ্যে মক্কায় পৌঁছাইতে পারেন’–এইরূপ বিশ্বাস কোনো পীর সাহেবের আছে কি? থাকিলে একবারও তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন কি? না দেখিয়াই বা উড়োজাহাজে চড়িবার কারণ কী? উড়োজাহাজে চড়িবার বিপদ আছে, ভাড়া আছে, আর সময়ও লাগে যথেষ্ট। তবুও উহার ওপর জন্মিয়াছে বিশ্বাস।”
মজার ব্যাপার হলো, আরজ আলী সাহেব আল্লাহর নবী-রাসূলদের সাথে পীর সাহেবদের গুলিয়ে একাকার করে ফেলেছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ নবী ছিলেন। উনাকে তিনি আগুনের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ইউনুস আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবী ছিলেন। উনাকে আল্লাহ তাআলা মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছেন। সুলাইমান আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর নবী। তিনি পশুপাখীর ভাষা বুঝতেন এবং জ্বীনরা হাওয়ায় উড়ে তাঁর সিংহাসন বহন করত। মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবী ছিলেন। উনি হাত থেকে লাঠি রাখলেই তা সাপ হয়ে যেত এবং মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর সাথে বিনা মাধ্যমে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ঈসা আলাইহিস সালাম পেয়েছিলেন মৃতকে জীবন দান করার ক্ষমতা এবং কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্যদানের ক্ষমতা।
আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি মিরাজের মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও কথা বলার সুযোগ লাভ করেছেন। তারা এ সবকিছুর সুযোগ পেয়েছিলেন, কারণ—তারা আল্লাহর নবী, আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর দূত ছিলেন।
আরজ আলী সাহেব পীর সাহেবানদেরও এ রকম সুযোগের জন্য ‘ট্রাই করার উপদেশ দিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পীর সাহেব কি আল্লাহর প্রেরিত কোনো নবী? কোনো রাসূল? বা বিশেষ কোনো দূত? যদি না হয়, তাহলে তারা কীভাবে এ রকম সুযোগ লাভ করতে পারে? আর কোন সেন্স থেকেই বা আরজ আলী পীর সাহেবদের কাছে এ রকম প্রস্তাব রাখে যেখানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে দুনিয়ার বুকে শ্রেষ্ঠ মানব আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুরা এই সুযোগ পাননি?
তিনি আরও লিখেছেন,
“অতীতে কোন কোন বোজর্গান হাঁটিয়াই নদী পার হইতে পারিতেন। যেহেতু তাহাদের বিশ্বাস ছিল যে, নদী পার করাইবেন আল্লাহ তা’আলা। নৌকা বা জলযানের দরকার নাই। আর বর্তমানে খোদার ওপর বিশ্বাস নাই, নদী পার হইতে সাহায্য লইতে হয় নৌকার।”
পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে হাসা শুরু করেছেন। ভাবছেন, আরে! লোকটা কিসের সাথে কি মেলায়? আসলেই তা-ই। উনার জানা ইসলাম আর মূল ইসলাম এক নয়। উনি বিকৃত যে ইসলামকে চিনতেন বা জানতেন, সেটাকে পুঁজি করেই এগিয়েছেন। খুব ভালো করতেন যদি কোনো ভালো আলেমের সান্নিধ্যলাভের চেষ্টা করতেন। বুজুর্গানের হেঁটে নদী পার হওয়া উনার কাছে যদি সঠিক ইসলাম হয়, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গাধার পিঠে চড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করাকে আমরা ঠিক কী বলতে পারি? উনি আরও লিখেছেন,
“সূফীগণ ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পৃথিবীর কোথায় কী ঘটিতেছে তাহা জানিতে ও দেখিতে পাইতেন। এখন কয়টি লোকে উহা বিশ্বাস করে?”
আবারও হাস্যকর কিছু কথাবার্তার ফুলঝুরি। এ কথা শরীয়তসম্মত যে, ভবিষ্যৎ বা গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর হাতেই। এমনকি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গায়েব জানতেন না। ঠিক ততটুকুই জানতেন, যতটুকু আল্লাহ তাঁকে জানাতেন। কুরআনুল কারীমে বলা হচ্ছে,
“আপনি বলুন, (হে রাসূল) আমি তোমাদের বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তা ছাড়া, আমি গায়েবের ব্যাপারেও অবগত নই। আমি এমনও বলি না যে আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু সে ওহীর অনুসরণ করি যা আমার কাছে আসে।”[২২]
আরও বলা হচ্ছে,
“আপনি বলে দিন, (হে রাসূল) আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই কেবল যা আল্লাহ চান (তা ছাড়া)। আর আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে আমার কোনো অমঙ্গল কখণই হতে পারত না।”[২৩]
যেখানে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েবের খবর রাখতেন না, সেখানে কোন সে পীরানে পীর যে রাসূলের চেয়েও অ্যাডভান্সড?
এসব কথা আমরা ইসলামের নামে গ্রামের প্রচলিত কুসংস্কারগুলোতে দেখতে পাই। কিন্তু আরজ আলী সাহেবের মতো একজন দায়িত্ববান, স্বশিক্ষিত লোক যদি এসব কুসংস্কারকে হাতিয়ার করে ধর্মকে আক্রমণ করে বসে, তখন ব্যথিত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কীই-বা করার থাকে?
-------------------------------------------------------------------------------------
[১] সূরা আত-তাওবা (০৯) : ২৮
[২] তাফসীরে মারেফুল কুরআন, সূরা তাওবা (০৯) : ২৮
[৩] সূরা আল-আন'আম (০৬) : ১৬৩
[৪] সূরা ইখলাস (১১২) : ০৪
[৫] সূরা ফাতিহা (০১) : ০৪
[৬] সহীহ আল বুখারী, ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়, হাদীস : ২২১৬
[৭] সূরা আয যুমার (৩৯) : ০৯
[৮] ইবনু মাজাহ, হাদীস : ২২৪; মিশকাত, হাদীস : ২১৮
[৯] https://twitter.com/richarddawki…/status/678074638119882752…
[১০] সূরা বাক্বারা (০২) : ০৩
[১১] কোয়ান্টাম মেকানিক্স, মু. জাফর ইকবাল, পৃষ্ঠা : ১০
[১২] সহীহ মুসলিম, ২৯৫৬
[১৩] সূরা আল-আরাফ (০৭) : ১৬৮
[১৪] সূরা আয-যুখরুফ (৪৩) : ৩৩
[১৫] সূরা আল-আরাফ (০৭) : ০৯
[১৬] সূরা সাবা (৩৪) : ৩৫
[১৭] সূরা আল-ইসরা (১৭) : ০১
[১৮] বুখারী : ২৪৬৮
[১৯] বুখারী : ১২৭৪, ১২৭৫
[২০] সুরা বাকারা (০২) : ১১২
[২১] সূরা বাকারা (০২) : ১৫৫
[২২] সূরা আল-আনআম (০৬) : ৫০
[২৩] সূরা আল-আরাফ (০৭) : ১৮৮
আরজ আলী মাতুব্বর উনার লেখা সত্যের সন্ধান বইয়ের শুরুর দিকে বলেছেন,
“জগতে এমন অনেক বিষয় আছে, যেসব বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না।”
প্রথমত, জগতের কোন কোন বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না তা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয়ত, জগতের কিছু কিছু বিষয়ে যে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্ম এক কথা বলে না তা আসলে সত্য। সত্য এ কারণে যে, জগতের সকল বিষয়ে সমানভাবে দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্মকে কথা বলতে হয় না। আরজ আলী সাহেব যে ভুলটা শুরুতেই করে বসেছেন তা হলো, তিনি দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্মকে এক করে ফেলেছেন। অথচ, এ কথা স্বীকার্য যে, এই তিনটি বিষয়ের আলোচ্য বস্তু ভিন্ন ভিন্ন।
পদার্থ কী কী দিয়ে গঠিত তা বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। ধর্মে পদার্থের গঠনের সরাসরি কোনো পাঠ নেই। আবার, ব্যভিচার করলে কেন শাস্তি পাওয়া উচিত সে পাঠ ধর্মের, কোনো কোনো দর্শনে কিছু বলা থাকলেও, বিজ্ঞানে তার উত্তর নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে ধর্ম, দর্শন আর বিজ্ঞানের বিষয়াদি এক নয়। এমতাবস্থায়, ভিন্ন ভিন্ন আলোচনার জিনিসকে একই বাটখারায় রেখে পরিমাপ করাটা নিতান্তই বোকামি।
একই পৃষ্ঠায় আরজ আলী সাহেব লিখেছেনঃ
“সাধারণত আমরা যাহাকে ধর্ম বলি তাহা হইলো মানুষের কল্পিত ধর্ম, যুগে মহাজ্ঞানীগণ এই বিশ্বসংসারের স্রষ্টা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য কী তাহা নির্ধারণ করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। স্রষ্টার প্রতি মানুষের কী কোন কর্তব্য নাই, নিশ্চয়ই আছে’–এইরূপ চিন্তা করিয়া তাহারা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের কর্তব্য তাহা নির্ধারণ করিয়া দিলেন। অধিকন্তু, মানুষের সমাজ ও কর্মজীবনের গতিপথও দেখাইয়া দিলেন সেই মহাজ্ঞানীগণ। এইরূপে হইলো কল্পিত ধর্মের আবির্ভাব।”
আরজ আলী সাহেব উনার পুরো বইটি জুড়ে দর্শন, বিজ্ঞান আর যুক্তিবোধের জয়গান গাইলেও, বইয়ের শুরুতে কোনরকম তথ্য, উপাত্ত, পরীক্ষালব্ধ প্রমাণাদি ছাড়াই দাবি করে বসলেন যে, ধর্মগুলো কথিত ধর্মগুরুদের বানানো। মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বেই যিনি নিজ বিশ্বাসের ওপর রায় দিয়ে ফলাফল জানিয়ে বসেন, তিনি আমাদের ঠিক কতটুকু “সত্যের সন্ধান দিতে পারেন? ব্যাপারটা অনেকটা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের মতো, যে প্রশাসন, মিডিয়া সবকিছু নিজের আয়ত্তে রেখে জনগণের উদ্দেশে ঘোষণা দেয়—“আসসা, আজ আমি তোমাদের শেখাব সুষ্ঠু নির্বাচন কাকে বলে।” আরজ আলী সাহেবের অবস্থাও ঠিক দুর্নীতিগ্রস্ত সেই সরকারের মতো নয় কি?
মাতুব্বর সাহেব বলেছেন,
“হিন্দুদের নিকট গোময় (গোবর) পবিত্র, অথচ অহিন্দু মানুষ মাত্রেই অপবিত্র। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের নিকট কবুতরের বিষ্ঠাও পাক, অথচ অমুসলমান মাত্রেই নাপাক। পুকুরে সাপ, ব্যাঙ মরিয়া পচিলেও উহার জল নষ্ট হয় না, কিন্তু বিধর্মী মানুষ ছুইলেই উহা হয় অপবিত্র। কেহ কেহ একথা বলেন যে, অমুসলমান পর্ব উপলক্ষ্যে কলা, কচু, পাঠা বিক্রিও মহাপাপ। এমনকি মুসলমানের দোকান থাকিতে হিন্দুর দোকানে কোনকিছু ক্রয় করাও পাপ। এই কী মানুষের ধর্ম? না ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা?”
আরজ আলী সাহেব শুরুতেই হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে যে অভি্যোগ টেনেছেন কতটুকু সত্য আমি জানি না। তবে হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা সম্পর্কে কিছু ধারণা বৈকি! সে মতে উচ্চবর্ণের কোনো হিন্দু নিম্নবর্ণের কোনো হিন্দুর পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাকেও পাপ মনে করে। এমনকি একটা সময়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পড়া দূরে থাক, ছোঁয়াটাও নিষিদ্ধ ছিল পুরোহিত কর্তৃক। পুরোহিততন্ত্রের এই বিধান এখনো হিন্দুধর্মে বলবৎ আছে কি না জানি না, তবে ভারতের অনেক জায়গায় এই রীতির এখনো চর্চা হতে পারে।
আরজ আলী সাহেব যে ভুলটা করেছেন তা হলো, তিনি হিন্দুধর্মের এই কালচারের সাথে ইসলামও গুলিয়ে ফেলেছেন। উনি বলেছেন, মুসলমানদের কাছে অমুসলমানমাত্রই নাপাক। কিন্তু ইসলামের দিকে তাকালে আমরা ঠিক এর বিপরীত চিত্রটাই দেখতে পাই।
আমরা সকলেই জানি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোটবেলাতেই বাবা-মা দুজনকে হারিয়েছিলেন। তখন থেকেই তিনি তাঁর আপন চাচা আবু তালিবের গৃহে বড় হন। চাচা আবু তালিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের আপন ছেলের মতোই দেখাশুনা করেন। বড় করেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা আবু তালিব কিন্তু মুশরিক ছিলেন। এমনকি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্তও তিনি ঈমান আনেননি। আরজ আলী সাহেবের মতে, ইসলামে অমুসলিমমাত্রই যদি অপবিত্র হবে, তাহলে ইসলামের সর্বশেষ নবীকে আল্লাহ তাআলা চাচা আবু তালিবের বাসায় রেখে কেন বড় করে তুলবেন? একজন অপবিত্র লোকের সোহবতে? আশ্চর্য না ব্যাপারটা?
এমনও প্রমাণ পাওয়া যায়, চাচা আবু তালিবের মৃত্যুশয্যায় উনার পাশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত ছিলেন এবং উনাকে কালেমা পাঠ করার জন্য অনুরোধ করেন। এখন, ইসলামে অমুসলিম ব্যক্তিমাত্রই যদি অপবিত্র হয়, নাপাক হয়, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে উনার চাচা, যিনি একজন মুশরিক ছিলেন, তার নিকট অবস্থান করেন?
মূলত আরজ আলী সাহেব এই জায়গায় এসে যে ভুলটা করেছেন সেটা হলো, ইসলামের পাক-নাপাকের যে কনসেপ্ট, সেই কনসেপ্টে ভদ্রলোক গুলিয়ে ফেলেছেন।
পবিত্র কুরআনে মুশরিকদের যদিও অপবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে,
"হে মুমিনগণ, মুশরিকরা অপবিত্র। কাজেই তারা যেন এ বছরের পর আর কখনোই মসজিদুল হারামের কাছে না আসতে পারে।"[১]
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এখানে মুশরিকরা অপবিত্র বলতে তাদের শারীরিক অপবিত্রতার কথা বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়। এখানে যে অপবিত্রতা-এর কথা বলা হয়েছে তা শারীরিক নয়; বরং আত্মিক। এবং সকল প্রসিদ্ধ তাফসীরে এই কথাটাই জোরালোভাবে বলা হয়েছে। যেমন : তাফসীরে মারেফুল কুরআনে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে,
"আসলে এখানে দৈহিক নয়; বরং আত্মিক অপবিত্রতার কথাই বলা হচ্ছে। তাদের শরীর নোংরা, একথা বলা হয়নি। এটা কুরআনের বিশেষ বাচনভঙ্গি।"[২]
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আত্মিক অপবিত্রতাটাই আবার কী রকম? আর মুশরিকরা কেন আত্মিকভাবে অপবিত্র? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের জানতে হবে ইসলামের একেবারে গোড়ার কনসেপ্ট। ইসলাম যে মূল ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে সেটা হলো তাওহীদ। তাওহীদ’ শব্দের অর্থ : ‘একত্ববাদ’।
ইসলামে একমাত্র উপাস্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। এর বাইরে আর দ্বিতীয় কোনো উপাস্য ইসলামে নেই। আল্লাহর বাইরে অন্য কারও ইবাদাত করা ইসলামে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাপ। এটা এমন পর্যায়ের পাপ, যার কোনো ক্ষমা নেই। ইসলামে আল্লাহই যে একমাত্র উপাস্য সত্তা, কুরআনের বহু জায়গায় তার উল্লেখ আছে। যেমনঃ
“তাঁর কোনো শরীক নেই।” [৩]
“তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।”[৪]
ইসলামে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য চাওয়াও শির্কের পর্যায়ভুক্ত। যেমন : সূরা ফাতিহায় বলা হচ্ছে,
“আমরা তোমারই ইবাদাত করি আর কেবল তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।”[৫]
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইসলামে একমাত্র উপাস্য কেবল আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা। তাঁর বাইরে অন্য কারও পূজা, ইবাদাত করা ইসলামে হারাম ও শির্ক। কিন্তু মুশরিকদের ধর্মীয় নিয়ম তার উল্টো। মুশরিকরা একই সাথে অনেক দেব-দেবীর পূজা করে। তাওহীদের যে কনসেপ্ট, তার একেবারে বিপরীত তাদের অবস্থান।
ইসলামের দৃষ্টিতে যারা তাওহীদবাদী, যারা কেবল আল্লাহকেই একমাত্র উপাস্য হিসেবে মানে, যারা কেবল আল্লাহরই ইবাদাত করে, তারা মনের দিক থেকে পবিত্র। আর যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য অনেকগুলো দেব-দেবীর পূজা করে, উপাস্য জ্ঞান করে, তারা মনের দিক থেকে অপবিত্র। এমতাবস্থায় হারাম শরীফের মতো মুসলিমদের পবিত্র জায়গায় একই সাথে তাওহীদবাদী এবং মুশরিকদের অবস্থান থাকতে পারে না। তাই কুরআন মুশরিকদের আত্মিক দিক থেকে অপবিত্র ঘোষণা করে বায়তুল হারামে তাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এটাকে আরজ আলী সাহেব শারীরিক অপবিত্রতার সাথে গুলিয়ে বলেছেন, “অমুসলমান ছুঁইলেই ইহা অপবিত্র হয়।”
মুশরিকদের যদি শারীরিকভাবে অপবিত্র ঘোষণা করা হতো, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই চাচা আবু তালিবের সাথে এ রকম মেলামেশা করতেন না। তিনি অবশ্যই অমুসলিমদের সাথে চুক্তি করতেন না। এ ছাড়াও, ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে এ রকম অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে, যেখানে মুসলিমরা অমুসলিমদের সাথে বসবাস করত, ব্যবসা-বাণিজ্য করত। এমনকি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম যে ঘটনা, “মদিনা সনদ”ই তো করা হয়েছে ইয়াহুদীদের সাথে।
আরজ আলী সাহেব বলেছেন, ইসলামে নাকি মুসলমানদের দোকান থাকতে হিন্দুর দোকান থেকে কোনো কিছু ক্রয় করাও পাপ। এই ফতোয়াটাও আরজ আলী সাহেব ঠিক কোথায় পেয়েছেন বা কার কাছে শুনেছেন আমি জানি না। তবে, ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ আল বুখারীতে উল্লেখ করেছেন,
আবদুর রহমান ইবন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তখন এক মুশরিক ব্যক্তি তার কিছু ভেড়াসহ আমাদের কাছে এল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এগুলো কি বিক্রির জন্য নাকি হাদিয়ার জন্য?' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের জন্য ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ভেড়া ক্রয় করে নিলেন।"[৬]
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরজ আলী সাহেব ‘অমুসলিম ব্যক্তিমাত্রই নাপাক, তাদের কাছ থেকে কিছু কেনাও যাবে না’ মর্মে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দাঁড় করিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। বরং আমরা জানলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিজীবনে অমুসলিম পরিবারে বড় হয়েছেন, অমুসলিমদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন, চুক্তি করেছেন, ক্রয়-বিক্রয় করেছেন। এতদসত্ত্বেও, ইসলামের বিরুদ্ধে এ রকম ভিত্তিহীন, বানোয়াট, মনগড়া অভিযোগ আনার হেতু কী তা কি আরজ আলী সাহেবের ভক্তকুল আমাদের জানিয়ে বাধিত করবেন?
আরজ আলী মাতুব্বর অভি্যোগ তুলেছেন এই মর্মে যে, ধর্ম নাকি জ্ঞান অর্জনে বাধা প্রয়োগ করে। তিনি বলেছেন,
“এই যে জ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা, মনের অদম্য স্পৃহায় আঘাত, আত্মার অতৃপ্তি, ইহারই প্রতিক্রিয়া মানুষের ধর্মকর্মে শৈথিল্য। এক কথায়—মন যাহা চায় ধর্মের কাছে তাহা পায় না। মানুষের মনের ক্ষুধা অতৃপ্তই থাকিয়া যায়। ক্ষুধার্ত বলদ যেমনি রশি ছিড়িয়া অন্যের ক্ষেতের ফসলে উদর পূর্তি করে, মানুষের মনও তেমন ধর্ম ক্ষেত্রের সীমা অতিক্রম করিয়া ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য ছুটিয়া যায় দর্শন আর বিজ্ঞানের কাছে।”
আরজ আলী সাহেবের এই কথাগুলো মোটাদাগে অন্য ধর্মের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলতে পারি না, কিন্তু ইসলামের সাথে এর ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নেই।
হিন্দুধর্মে একটা সময়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ স্পর্শও করতে পারত না। শুধু ব্রাম্মণরাই পুজো-অর্চনা, উপাসনা করতে পারত। খ্রিষ্টধর্মের চার্চ কর্তৃক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের ওপর খড়গহস্তে নেমে পড়ার কাহিনিও সবার জানা। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এ রকম কোনো ঘটনা নেই যেখানে ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে; বরং ইসলাম বরাবরই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে এসেছে। বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান সর্বজনবিদিত। চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের রয়েছে অভূতপূর্ব অবদান। অন্ধকার ইউরোপে সর্বপ্রথম আলোকবর্তিকা হাতে ইসলাম প্রবেশ করেছে। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য—সবখানে মুসলিমদের ছিল জয়জয়কার।
আল-কুরআনে জ্ঞানার্জনের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল-কুরআন নাজিলের প্রথম যে শব্দ, সেই শব্দ ছিল—পড়ো। যে জানে এবং যে জানে না তাদের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে কুরআন বলেছে—
“যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি কখনো সমান হতে পারে?”[৭]
সুন্দর একটি পার্থক্য টেনে কুরআন বুঝিয়ে দিলো যে, যারা জানে তারা উত্তম তাদের চেয়ে, যারা জানে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।”[৮]
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন বহু মুসলিম বিজ্ঞানীর নাম আমরা দেখতে পাই যারা তাদের কর্মের মাধ্যমে বিজ্ঞান, দর্শনজগতে অবদান রেখেছিলেন। তাদের নাম সারা বিশ্বের মানুষ স্মরণ রেখেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় অবদানের কথা স্বীকার করতে গিয়ে বর্তমান সময়ের বিখ্যাত নাস্তিক রিচার্ড ডকিন্স একবার টুইট করেছিলেন এই বলে : “1000 years ago, the Islamic golden age embraced all the world’s learning, books & science. Can we have a new Islamic golden age, please?”[৯]
নাস্তিকরাও একথা অকপটে স্বীকার করে যে, ইসলাম কখনোই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার, বিরুদ্ধে ছিল না; বরং জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সম্প্রসারিত করার জন্য ইসলাম যা করেছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম তা করেনি। তা ছাড়া, ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের যে দ্বন্দ্বের কথা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেছেন, তা কতটুকু সত্য, যেখানে ফ্রান্সিস বেকন, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও, আইনস্টাইন এবং নিউটনের মতো বিজ্ঞানীরা ধর্ম এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন?
আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,
“অধিকাংশ ধর্ম এবং ধর্মের অধিকাংশ তথ্য অন্ধবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”
এবার অবশ্য আরজ আলী সাহেব ঠিক কথা বলেছেন। ধর্মের কিছু তথ্য অবশ্যই বিশ্বাসের ওপরে নির্ভর করে, যেমন : আল্লাহতে বিশ্বাস, জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাস, আখেরাত, ফেরেশতা ইত্যাদিতে বিশ্বাস। একজন মুসলিম এ সবকিছু না দেখেই বিশ্বাস করে। পবিত্র কুরআনের শুরুতেই বলা হয়েছে,
“যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।”[১০]
ঈমানের মূল হচ্ছে গায়েবে বিশ্বাস। এমন কিছুতে বিশ্বাস করা যা দেখা যাচ্ছে না, ধরা যাচ্ছে না, ছোঁয়া যাচ্ছে না। মানুষ চাইলেই পৃথিবীতে বসে আল্লাহকে দেখতে পাবে না। সে চাইলেই জান্নাত-জাহান্নাম অবলোকন করতে পারবে না ফেরেশতাদের সাথে মতবিনিময় করতে পারবে না। সে পারবে না, কারণ–সে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে বন্দী। সেটা কী রকম?
সেটা হচ্ছে মানুষ সময়ের বাইরে কল্পনা করতে পারে না। সে সময়ের ফ্রেমে বন্দী। সে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই তিন ফ্রেমের মধ্যে বন্দী পাখির মতো। সে চিন্তা করতে পারে অতীতে কী হয়েছিল তা নিয়ে। সে চিন্তা করতে পারে আজ কী হচ্ছে তা নিয়ে। সে চিন্তা করতে পারে আগামীকাল কী হতে পারে তা নিয়ে। কিন্তু এই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের বাইরে এসে কোনো কিছুই সে কল্পনা করতে পারে না। কারণ, সে টাইম-ফ্রেমের মধ্যে বন্দী। কিন্তু বাই ডেফিনেইশান, স্রষ্টা কোনো টাইম-ফ্রেমে বন্দী নন। তিনি ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
মানুষের সীমাবদ্ধতার দরুন সে বাহ্যিক জগতেও অনেক কিছু দেখতে পায় না, অনেক কিছু শুনতে পায় না। যেমন ধরুন মানুষের চোখ। সাধারণত ৩৯০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো মানুষ দেখতে পারে। এরচেয়ে কম বা এরচেয়ে বেশি আলো মানুষ দেখতে পারে না। কেন পারে না? এটা মানুষের সীমাবদ্ধতা।
আবার ধরুন মানুষের কান। সাধারণত 20Hz-20,000Hz এর মধ্যে থাকলেই কেবল আমরা শব্দ শুনতে পাই। এরচেয়ে কম বা বেশি হলে সেই শব্দ আমরা শুনতে পাই না। কেন শুনতে পাই না? আমাদের সীমাবদ্ধতা।
এত এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা কীভাবে আশা করি যে স্রষ্টা আমাদের ল্যাবের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এসে ধরা দেবেন? মানুষকে স্রষ্টা এই ক্ষমতা দেননি। এ জন্য তিনি বলেছেন তাকে না দেখে বিশ্বাস করতে হবে। তবে কি মানুষ কখনোই স্রষ্টাকে দেখবে না? অবশ্যই দেখবে। তবে সেটা নির্দিষ্ট সময়ে। সেটি কোন সময়? আখেরাত।
কড়া বা হালকা বিজ্ঞানমনস্করা এতটুকু পড়ে হয়তো-বা আমাকে দু-চারবার মনে মনে গালমন্দ করে ফেলেছেন। বলছেন, “না দেখে আবার বিশ্বাস কী!”
বিজ্ঞানকে যারা দেখে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত অথবা যারা যারা Seeing is believing তত্ত্বানুরাগী, তাদের জন্য আমাদের কাছে রয়েছে মহা দুঃসংবাদ। দুঃসংবাদটি হলো, বিজ্ঞান নিজেও এখন আর Seeing is believing তত্ত্বে বিশ্বাস করে না। কারণ, এতদিন ধরে যারা ‘মহাবিশ্বকে জেনে ফেলেছি, বুঝে ফেলেছি’ বলতে বলতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেন, তাদের জন্য ভয়ংকর দুঃসংবাদ শোনাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’।
তারা বলছে, এতদিন ধরে, এত বছর শ্রমসাধনা করে আমরা মহাবিশ্বের যতটুকু জেনেছি সেটার পরিমাণ খুবই ক্ষুদ্র। NASA স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, আমাদের জানার পরিমাণ মাত্র ৫% এরও কম। বাকি ৯৫ % তাহলে কী? বাকি ৯৫% ডার্ক ম্যাটার বা ‘অদৃশ্য বস্তু’। এই ৯৫ % অদৃশ্য বস্তু নিয়েই আমাদের সমগ্র মহাবিশ্ব পরিবেষ্টিত। কিন্তু এই অদৃশ্য বস্তুগুলোকে আমরা বুঝতে পারছি না। দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের শত শত বছরের উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করেও আমরা জানতে পারছি না এই অদৃশ্য বস্তু আসলে কী আর এখানে কী হয়।
NASA-এর বিজ্ঞানীরা বলছে,
"More is unknown than is known. No one expected this, no one knew how to explain it. But something was causing it. It is a complete mystery. But it is an important mystery."
তাদের মতে, ‘এটা যতটুকু না জানা গেছে তারচেয়ে বেশি অজানা।’
তাহলে, এই অজানা বস্তুকে আমরা কী করব? বিজ্ঞানীরা কী করবেন? পদার্থবিজ্ঞানীরা কী করবেন? এগুলোকে অস্বীকার করবেন? ‘নাই নাই’ বলে পাশ কাটবেন? একদম না। বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে হলে তাদের এই বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য বস্তুকে ‘বিশ্বাস’ করে আগাতে হবে। ধরে নিতে হবে যে—‘আছে। এরা আছে।’
ব্যাপারটাকে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন ডক্টর জাফর ইকবাল। মানুষ যে আদতে প্রকৃতির সব রহস্য ভেদ করতে পারবে না, তা এখনকার বিজ্ঞান অকপটে স্বীকার করে। অধ্যাপক জাফর ইকবাল তাঁর লেখা কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইতে লিখেছেন,
“কাজেই যারা বিজ্ঞান চর্চা করে তারা ধরেই নিয়েছে আমরা যখন বিজ্ঞান দিয়ে পুরো প্রকৃতিটাকে বুঝে ফেলবো, তখন আমরা সবসময় সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। যদি কখনো দেখি কোনো একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছি না, তখন বুঝতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানটা তখনো জানা হয়নি। যখন জানা হোবে তখন সেটা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। এককথায়, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বা ভবিষ্যদ্বাণী সবসময়েই নিখুঁত এবং সুনিশ্চিত, কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের এই ধারণাটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করে যে, প্রকৃতি আসলে কখনোই সবকিছু জানতে দেবে না। সে তার ভিতরের কিছু কিছু জিনিস মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। মানুষ কখনোই সেটা জানতে পারবে।। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এটা কিন্তু বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা অসম্পূর্ণতা নয়। এটাই হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানীরা একটা পর্যায়ে গিয়ে কখনোই আর জোরগলায় বলবেন না ‘হবে’, তারা মাথা নেড়ে বলবেন—‘হতে পারে’।”[১১]
অধ্যাপক জাফর ইকবালের কথার সারমর্ম এই যে, বিজ্ঞানীরা কোনোদিনও প্রকৃতির সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারবেন না। এই না পারাটা কি বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের অক্ষমতা? জাফর ইকবাল বলছেন, ‘না। এটা বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটাই বিজ্ঞানের ধর্ম।’ বিজ্ঞানীরা আর উঁচু গলায় বলতে পারবেন না যে—‘হবে’। তাদের বলতে হবে—‘হতে পারে’।
এই হচ্ছে বিজ্ঞানের অবস্থা। এই যে প্রকৃতির কিছু রহস্য বিজ্ঞান উদঘাটন করতে পারছে না বা পারবে না, তার মানে কি আমাদের ধরে নিতে হবে যে এগুলোর অস্তিত্ব নেই? নাহ। বিজ্ঞান মোটেও তা বলে না। বিজ্ঞান সেই না-জানা, না-দেখা, না-বুঝতে পারা রহস্যতেও ঈমান আনে। বিশ্বাস করে। বিজ্ঞান এভাবেই আগায়। বিজ্ঞানকে এভাবেই আগাতে হয়। সুতরাং আরজ আলী সাহেবের মতে শুধু ধর্মই ‘বিশ্বাস’ নিয়ে আগায় না, তাদের পরম পূজিত বিজ্ঞানও আধুনিককালে এত্তোগুলোতে ঈমান নিয়ে চলে। এই ঈমান ছাড়া তারা এগুতে পারে না।
এই অধ্যায়ের শেষের দিকে আরজ আলী সাহেব আরও মজার বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তিনি লিখেছেন,
“আজকাল যেখানে-সেখানে শোনা যাইতেছে যে, সংসারে নানা প্রকার জিনিসপত্র হইতে বরকত উঠিয়া গিয়াছে। কারণ লোকের আর পূর্বের মতো ঈমান অর্থাৎ বিশ্বাস নাই। পূর্বে লোকের ঈমান ছিলো, ফলে তাহারা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করিতো। আর আজকাল মানুষের ঈমান নাই। তাই তাহাদের অভাব ঘোচে না। ঈমান নাই বলিয়াই ক্ষেতে আর সাবেক ফসল জন্মে না। ফলের গাছে ফল ধরে না। পুকুরে-নদীতে মাছ পড়ে না। ঈমান নাই বলিয়াই মানুষের ওপর গজবরূপে কলেরা, বসন্ত, বন্যা-বাদল, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি নানা প্রকার বালা-মুছিবত নাজেল হয়। অথচ মানুষের হুঁশ হয় না। এইরূপ যে নানা প্রকার অভাব-অভিযোগের জন্য ঈমানের অভাবকেই দায়ী করা হয়, তাহা কটোটুকু সত্য?”
আরজ আলী সাহেবের বক্তব্য হলো, মুসলিমগণ বিশ্বাস করে যে, ঈমান কমে গেলে আয়-রোজগার, সাংসারিক জিনিসপত্রাদি থেকে ‘বরকত’ উঠে যায়। আর আলী সাহেবের এই কথা শুনে আমার দাদির কথা মনে পড়ে গেল। আমার দাদি ছিলেন অশিক্ষিত, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন এক গ্রাম্য মহিলা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো ছিলই না, আমার দাদি যে অন্ততপক্ষে স্বশিক্ষিত ছিলেন, এমনটাও না। ছোটবেলায় দাদির কাছে ঠিক এ রকম গল্পই শুনতাম আমরা। মানুষের ঈমান চলে যাচ্ছে বলেই সংসারের আয়-রোজগারে ভাটা পড়ছে, রোগে-শোকে ধরছে। দাদির মতে, এসবের পেছনে একটাই কারণ—ঈমানের ঘাটতি।
কিন্তু বড় হয়ে যখন আমি ধর্মতত্ত্ব পড়া শুরু করলাম, ধর্মীয় বইপত্র অধ্যয়ন শুরু করলাম, সবিস্ময়ে লক্ষ করলাম, এতদিন দুঃখ-দুর্দশা আর আয়-রোজগার থেকে বরকত উঠে যাওয়ার জন্য ঈমানের যে ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছিল, তা সম্পূর্ণ বিপরীত।
আমি যতদূর জানি, আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবেরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। নিজে নিজে অনেকদূর পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। শোনা যায়, বরিশাল বি.এম কলেজের পাঠাগারে থাকা মোটা মোটা দর্শন, বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা আর ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন ভদ্রলোক। এতৎসত্ত্বেও, কেন তিনি মফস্বলে অশিক্ষিত মানুষগুলোর লোকমুখে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারকে ইসলামের সাথে বেঁধে দিয়ে প্রশ্ন ছুড়েছেন, সেটাই আমি বুঝতে পারছি না।
তাঁর মতে, মুসলিমদের বিশ্বাস হলো, ঈমান দুর্বল হলে সংসারের আয়-বরকত কমে যায়। আমার প্রশ্ন হলো, এই জগৎ-সংসারে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরচেয়ে বেশি ঈমানদার, বেশি পরহেযগার, বেশি তাকওয়াবান, বেশি আমলকারী লোক আর কেউ ছিল কি? যদি না থাকে, তাহলে এই সর্বোচ্চ ঈমানদার, সর্বোচ্চ পরহেযগার, সর্বোচ্চ তাকওয়াবান, সর্বোচ্চ আমলকারী ব্যক্তির ঘরে কেন এক দিন চুলোয় আগুন জ্বললে চার দিন জ্বলত না? কেন তাঁকে খেজুর পাতার চাটাইয়ে শুতে হতো, যার ফলে তাঁর পিঠে, হাতে, ঘাড়ে দাগ পড়ত? তাঁর কি ঈমানের ঘাটতি ছিল? যদি না থাকে তাহলে কেন তাঁকে অনাহারে থাকতে হতো? কেন নবীনন্দিনী ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর পুত্রদের খেতে দিতে পারতেন না?
তাহলে দেখা যাচ্ছে, রুযী-রোজগার বৃদ্ধি-ঘাটতি সব সময় ঈমানের ওপর নির্ভর করে না, আর অভাব-অনটন, দুর্দশা ইত্যাদিও সর্বদা দুর্বল ঈমানের ফল নয়। বরং অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশা ইত্যাদি হলো মজবুত ঈমানের ফল। যার ঈমান যত পাকাপোক্ত, তার জন্য পরীক্ষাও তত বেশি, তত কঠিন। যার জ্বলন্ত উদাহরণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন,
“দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফেরদের জন্য জান্নাতের মতো!”[১২]
জেলখানা কেমন? খুব কি আরামের জায়গা? নাকি কষ্টের? অবশ্যই জেলখানা কষ্টের জায়গা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের জন্য দুনিয়াকে সেই কষ্টের জায়গা জেলখানার সাথে তুলনা করেছেন। আর জান্নাত কেমন? জান্নাত হচ্ছে আরামদায়ক জায়গা। যেখানে কষ্ট নেই, দুঃখ নেই, ক্লান্তি নেই, অভাব-অনটন কিছু নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের জন্য দুনিয়াকে জান্নাতের সাথেই তুলনা করেছেন।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে, দুনিয়ায় যে যত বেশি ঈমানদার, সে তত বেশি পরীক্ষার মধ্যে থাকবে। দুঃখ-কষ্টের পরীক্ষা, রোগ-শোকের পরীক্ষা ইত্যাদি। আর যার ঈমান নেই, তার পরীক্ষা কম। সে সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে। তাহলে এখান থেকে আমরা দেখতে পেলাম, ইসলামী বিশ্বাস হিসেবে ‘ঈমান দুর্বল থাকলে বা কমে গেলে বরকত উঠে যায়’ মর্মে যে তত্ত্ব আরজ আলী সাহেব আমাদের গিলাতে চেয়েছেন, তার সাথে মূল ইসলামের ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নাই; বরং আসল কাহিনি আরজ আলী যা বলেছেন তার বিপরীত।
এ জন্য দুনিয়ার সামগ্রী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টভঙ্গি হচ্ছে, তা ধোঁকার সামগ্রী। এটা দিয়েও আল্লাহ কাউকে পরীক্ষা করেন, আবার না দিয়েও পরীক্ষা করেন। ভালো-মন্দ উভয় অবস্থাই ঈমানদারের জন্য পরীক্ষার বিষয়। যেমন কুরআনে বলা হচ্ছে,
‘আর আমি পরীক্ষা করি সুখ এবং দুঃখ দিয়ে যাতে তারা ফিরে আসে।’[১৩]
বরং আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে যদি সব মানুষ কাফের হওয়ার আশঙ্কা না থাকত তাহলে তিনি কাফেরদের ঘর-বাড়ি স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে মুড়িয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি দুনিয়াতেও তাদের পরিমিত প্রদান করেন।[১৪] তবে কখনো কখনো ঈমান ও তাকওয়া থাকলে আল্লাহ তার আকাশস্থিত বরকত ও যমীনস্থ প্রভূত কল্যাণের দ্বার উন্মোচন করেন বলে ঘোষণা করেছেন।[১৫] সেটাও মূলত পরীক্ষা। সুতরাং ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এসবকে ঈমানদার পরীক্ষার সামগ্রী হিসেবেই গ্রহণ করে। কাউকে ধন-সম্পদ দিলে তাকে ভালোবাসার প্রমাণ যেমন নয়, তেমনি না দিলে ভালো না-বাসার প্রমাণও তা নয়। কাফের মুশরিকরাই শুধু দুনিয়ার জীবনের প্রাচুর্যকে স্রষ্টার ভালোবাসার নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।[১৬]
ঈমানদারের দৃষ্টি আখেরাতের দিকে হওয়ার কারণে সে প্রাচুর্য দেখলে সর্বদা ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে, না জানি তার আখেরাতের হিসাব শূন্য হয়ে গেল! পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হচ্ছে,
কেউ পার্থিব সুখ সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছা সত্ত্বর দিয়ে থাকি; পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি যেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত এবং অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত অবস্থায়।[১৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম[১৮] এবং আমাদের পূর্বসূরি সাহাবায়ে কিরামও এমনটি বলেছেন।[১৯]
ইসলামের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ টানার পরে তিনি চীন, রাশিয়াসহ প্রভৃতি উন্নত দেশের উদাহরণ টেনে বোঝাতে চাইলেন, এই সমস্ত দেশের মানুষের কোনো ধর্ম নেই। থাকলেও তারা আল্লা-বিল্লা করে না। তথাপি, তাদের সংসার সোনায় সোহাগা। তাদের ব্যাংক-ব্যালেন্স ভর্তি টাকা-পয়সা, ইয়া বড় বড় অট্টালিকা। তাদের দেশে রোগ-শোক কম। টাইফয়েড, কলেরার মতো মহামারি অনেক আগেই সেখান থেকে তল্পিতল্পা নিয়ে বিদেয় হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের মতো যে সকল গরিব দেশের মানুষ আল্লা-বিল্লা করে, তারা কেন গরিব হবে? তাদের কেন না খেয়ে মরতে হবে? তাদের কেন বাড়ি নেই, গাড়ি নেই? এই সকল দেশে কেন কলেরা-টায়ফয়েডের মতো রোগ মহামারিরূপে দেখা দেবে?
আরজ আলী উনার সেই আগের ভুলের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। উনি মনে করেছেন। আল্লা-বিল্লা করলে আর পাক্কা মুমিন হলেই বুঝি আকাশ থেকে টাকার বস্তা ধপাস করে উঠোনে এসে পড়ে!
আরজ আলী সাহেবদের এসব অভিযোগ পুরোনো। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের কাফেররাও এই প্রশ্নগুলো করত। তাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“কাফিরদের নিকট পার্থিব জীবনকে মোহনীয় করা হয়েছে। ফলে তারা মুমিনদের বিদ্রুপ করে থাকে। বস্তুত কিয়ামতের দিন মুত্তাকীগণ তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দিয়ে থাকেন।”[২০]
আল্লাহ বলছেন, যারা কাফের, তাদের সামনে তিনি দুনিয়াকে মোহনীয় করে দিয়েছেন। ফলে দুনিয়ালাভের প্রতি্যোগিতায় তারা বিভোর। এতই বিভোর যে, মুত্তাকীদের উদ্দেশে তারা এই আরজ আলী সাহেবদের মতো বিদ্রুপাত্মক প্রশ্ন করে, “তোমরা তো খুব আল্লা-বিল্লাহ করো; কই, তোমাদের কষ্ট তো লাঘব হয় না? অথচ আমরা এর কিছুই করি না। দেখো, আমরা কত সুখে আছি।”
আল্লাহ পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছেন, “বস্তুত কিয়ামতের দিন মুত্তাকীগণ তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে। অন্য আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও সুস্পষ্ট করে বলছেন,
“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। অতএব (হে রাসূল), আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন।”[২১]
সুতরাং এই আয়াত থেকেও এটা সুস্পষ্ট যে, ভয়-ক্ষুধা-মৃত্যু-জীবন আর ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি কখনোই দুর্বল ঈমানের কারণ নয়; বরং তা আল্লাহর কাছ থেকে ঈমানদারদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।
আরজ আলী সাহেবেরা যে ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করে ইসলামকে একহাত নেয়ার চেষ্টা করে, সেই ইসলাম গ্রামের কুসংস্কার বৈ কিছু নয়। আসল ইসলামের সাথে এর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু সেই কুসংস্কারকে লক্ষ্যবস্তু ধরে আরজ আলী সাহেবেরা যখন ধর্মতর্কে আসেন, তখন আমরা সেটাকে নিছক ছেলেমানসি ছাড়া কীই-বা বলতে পারি?
এ রকম আরও অনেক হাস্যকর যুক্তি তর্ক আমরা সামনে দেখতে পাব। এই অধ্যায়ের শেষে উনি আরও যে কয়টি হাস্যকর তথ্য ইসলামের নামে ছুড়ে দিয়েছেন তা সংক্ষেপে আলোচনা করছি।
তিনি লিখেছেন,
“বলা হয় যে, আল্লাহর অসাধ্য কোনো কাজ নাই। বিশেষ বিশ্বাসী ভক্তদের অনুরোধে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেন। সোলায়মান নবী নাকি সিংহাসনে বসিয়া সপরিষদ শূন্যে ভ্রমণ করিতেন। তাই বলিয়া ‘আল্লাহ তা’লা ইচ্ছা করিলে জায়নামাজশুদ্ধ আমাকেও নিমেষের মধ্যে মক্কায় পৌঁছাইতে পারেন’–এইরূপ বিশ্বাস কোনো পীর সাহেবের আছে কি? থাকিলে একবারও তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন কি? না দেখিয়াই বা উড়োজাহাজে চড়িবার কারণ কী? উড়োজাহাজে চড়িবার বিপদ আছে, ভাড়া আছে, আর সময়ও লাগে যথেষ্ট। তবুও উহার ওপর জন্মিয়াছে বিশ্বাস।”
মজার ব্যাপার হলো, আরজ আলী সাহেব আল্লাহর নবী-রাসূলদের সাথে পীর সাহেবদের গুলিয়ে একাকার করে ফেলেছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ নবী ছিলেন। উনাকে তিনি আগুনের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ইউনুস আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবী ছিলেন। উনাকে আল্লাহ তাআলা মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছেন। সুলাইমান আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর নবী। তিনি পশুপাখীর ভাষা বুঝতেন এবং জ্বীনরা হাওয়ায় উড়ে তাঁর সিংহাসন বহন করত। মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবী ছিলেন। উনি হাত থেকে লাঠি রাখলেই তা সাপ হয়ে যেত এবং মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর সাথে বিনা মাধ্যমে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ঈসা আলাইহিস সালাম পেয়েছিলেন মৃতকে জীবন দান করার ক্ষমতা এবং কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্যদানের ক্ষমতা।
আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি মিরাজের মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও কথা বলার সুযোগ লাভ করেছেন। তারা এ সবকিছুর সুযোগ পেয়েছিলেন, কারণ—তারা আল্লাহর নবী, আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর দূত ছিলেন।
আরজ আলী সাহেব পীর সাহেবানদেরও এ রকম সুযোগের জন্য ‘ট্রাই করার উপদেশ দিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পীর সাহেব কি আল্লাহর প্রেরিত কোনো নবী? কোনো রাসূল? বা বিশেষ কোনো দূত? যদি না হয়, তাহলে তারা কীভাবে এ রকম সুযোগ লাভ করতে পারে? আর কোন সেন্স থেকেই বা আরজ আলী পীর সাহেবদের কাছে এ রকম প্রস্তাব রাখে যেখানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে দুনিয়ার বুকে শ্রেষ্ঠ মানব আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুরা এই সুযোগ পাননি?
তিনি আরও লিখেছেন,
“অতীতে কোন কোন বোজর্গান হাঁটিয়াই নদী পার হইতে পারিতেন। যেহেতু তাহাদের বিশ্বাস ছিল যে, নদী পার করাইবেন আল্লাহ তা’আলা। নৌকা বা জলযানের দরকার নাই। আর বর্তমানে খোদার ওপর বিশ্বাস নাই, নদী পার হইতে সাহায্য লইতে হয় নৌকার।”
পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে হাসা শুরু করেছেন। ভাবছেন, আরে! লোকটা কিসের সাথে কি মেলায়? আসলেই তা-ই। উনার জানা ইসলাম আর মূল ইসলাম এক নয়। উনি বিকৃত যে ইসলামকে চিনতেন বা জানতেন, সেটাকে পুঁজি করেই এগিয়েছেন। খুব ভালো করতেন যদি কোনো ভালো আলেমের সান্নিধ্যলাভের চেষ্টা করতেন। বুজুর্গানের হেঁটে নদী পার হওয়া উনার কাছে যদি সঠিক ইসলাম হয়, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গাধার পিঠে চড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করাকে আমরা ঠিক কী বলতে পারি? উনি আরও লিখেছেন,
“সূফীগণ ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পৃথিবীর কোথায় কী ঘটিতেছে তাহা জানিতে ও দেখিতে পাইতেন। এখন কয়টি লোকে উহা বিশ্বাস করে?”
আবারও হাস্যকর কিছু কথাবার্তার ফুলঝুরি। এ কথা শরীয়তসম্মত যে, ভবিষ্যৎ বা গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর হাতেই। এমনকি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গায়েব জানতেন না। ঠিক ততটুকুই জানতেন, যতটুকু আল্লাহ তাঁকে জানাতেন। কুরআনুল কারীমে বলা হচ্ছে,
“আপনি বলুন, (হে রাসূল) আমি তোমাদের বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তা ছাড়া, আমি গায়েবের ব্যাপারেও অবগত নই। আমি এমনও বলি না যে আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু সে ওহীর অনুসরণ করি যা আমার কাছে আসে।”[২২]
আরও বলা হচ্ছে,
“আপনি বলে দিন, (হে রাসূল) আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই কেবল যা আল্লাহ চান (তা ছাড়া)। আর আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে আমার কোনো অমঙ্গল কখণই হতে পারত না।”[২৩]
যেখানে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েবের খবর রাখতেন না, সেখানে কোন সে পীরানে পীর যে রাসূলের চেয়েও অ্যাডভান্সড?
এসব কথা আমরা ইসলামের নামে গ্রামের প্রচলিত কুসংস্কারগুলোতে দেখতে পাই। কিন্তু আরজ আলী সাহেবের মতো একজন দায়িত্ববান, স্বশিক্ষিত লোক যদি এসব কুসংস্কারকে হাতিয়ার করে ধর্মকে আক্রমণ করে বসে, তখন ব্যথিত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কীই-বা করার থাকে?
-------------------------------------------------------------------------------------
[১] সূরা আত-তাওবা (০৯) : ২৮
[২] তাফসীরে মারেফুল কুরআন, সূরা তাওবা (০৯) : ২৮
[৩] সূরা আল-আন'আম (০৬) : ১৬৩
[৪] সূরা ইখলাস (১১২) : ০৪
[৫] সূরা ফাতিহা (০১) : ০৪
[৬] সহীহ আল বুখারী, ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়, হাদীস : ২২১৬
[৭] সূরা আয যুমার (৩৯) : ০৯
[৮] ইবনু মাজাহ, হাদীস : ২২৪; মিশকাত, হাদীস : ২১৮
[৯] https://twitter.com/richarddawki…/status/678074638119882752…
[১০] সূরা বাক্বারা (০২) : ০৩
[১১] কোয়ান্টাম মেকানিক্স, মু. জাফর ইকবাল, পৃষ্ঠা : ১০
[১২] সহীহ মুসলিম, ২৯৫৬
[১৩] সূরা আল-আরাফ (০৭) : ১৬৮
[১৪] সূরা আয-যুখরুফ (৪৩) : ৩৩
[১৫] সূরা আল-আরাফ (০৭) : ০৯
[১৬] সূরা সাবা (৩৪) : ৩৫
[১৭] সূরা আল-ইসরা (১৭) : ০১
[১৮] বুখারী : ২৪৬৮
[১৯] বুখারী : ১২৭৪, ১২৭৫
[২০] সুরা বাকারা (০২) : ১১২
[২১] সূরা বাকারা (০২) : ১৫৫
[২২] সূরা আল-আনআম (০৬) : ৫০
[২৩] সূরা আল-আরাফ (০৭) : ১৮৮