মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

আরজ আলী সমীপে - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ৩/১৩

(০৩) লেখকের কথা

লেখকের কথাঃ

আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। শুকরিয়া সেই মহান সত্তার, যিনি আমাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন। দরূদ এবং সালাম প্রিয় নবী (সাঃ) এর প্রতি।

বাংলা অন্তর্জালে কিংবা বাংলাসাহিত্যে নাস্তিক্যবাদী লেখাজোখা বলতেই প্রথমে যার নাম চলে আসে তিনি হলেন আরজ আলী মাতুব্বর। নিজের অবিশ্বাসী দর্শনের পক্ষে উনি কিছু বইপত্র লিখেছেন। প্রশ্ন করেছেন। যুক্তি দেখিয়েছেন।

প্রশ্ন করতে কার না ভালো লাগে? মানুষের স্বভাবজাত একটি বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, সে প্রশ্ন করতে পারে। এই ক্ষমতা আছে বলেই সে মানুষ। একটি গরুর সামনে যদি কিছু প্ল্যাস্টিক রাখা হয়, তাহলে গরুটি প্রথমে প্ল্যাস্টিকের গন্ধ শুকবে। এরপর হয়তো-বা আলতো করে জিহ্বা দিয়ে একটু পরীক্ষা করবে। যখন দেখবে এই জিনিস তার গলাধঃকরণ করার উপযুক্ত না, গরুটি তখন ভদ্রভাবে তার বিশাল মাথাটি অন্যদিকে সরিয়ে নেবে। গরুটি জানতে চায় না প্ল্যাস্টিক খেলে কী হয়, জানতে চায় না প্ল্যাস্টিক খাওয়া যায় না কেন ইত্যাদি। কিন্তু একজন মানবশিশু, যে সবেমাত্র একটু আধটু বুঝতে শিখছে, সে প্রশ্ন করে। সে তার বাবার হাতের আঙুল ধরে জানতে চায় আকাশ নীল কেন, রাত কেন কালো, পাহাড় কেন এত উঁচু, পাখি কেন উড়তে পারে ইত্যাদি প্রশ্নবাণে সে জর্জরিত করে তার বাবা-মাকে, তার আশপাশের সবাইকে। এই যে প্রশ্ন করার ক্ষমতা, চিন্তা করার ক্ষমতা, এটা প্রাণিজগতে একমাত্র মানুষেরই আছে।

মানুষ অজানাকে জানার জন্য প্রশ্ন করে। সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের জন্য প্রশ্ন করে। তার আদিমতম কৌতুহল থেকে জন্ম নেয় প্রশ্নের। সে প্রশ্নগুলোর ডাল চতুর্দিকে বিস্তৃত হয়। জানার কৌতুহলটা যদিও মানুষের আদিম কৌতুহলগুলোর একটি, তবুও সে কতটুকু জানছে আর কী জানছে তা নির্ভর করে সে কোথা থেকে জানছে আর কার কাছ থেকে জানছে।

সঠিক প্রশ্ন নিয়ে সে যদি ভুল মানুষের কাছে যায়, তাহলে সে ভুল উত্তর পাবে তা ভুল জানবে। ভুল প্রশ্ন নিয়ে যদি সে সঠিক মানুষের কাছে যায়, তবুও সে সঠিক উত্তর পাবে। কারণ, সঠিক মানুষটা প্রথমে তার প্রশ্ন শুধরে দেবে। এরপর সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে। সুতরাং শুধু প্রশ্ন করতে পারাটাই বাহাদুরি নয়, সেই প্রশ্নের উত্তরের জন্য কোথায় আর কার কাছে যাওয়া হচ্ছে সঠিক জ্ঞানার্জনের জন্য সেটাও অন্যতম একটা বিষয়।

আরজ আলী মাতুব্বর। জন্মেছেন বরিশাল। যখন থেকে উনার লেখার সাথে পরিচয়, তখন থেকে উনার যে বিশেষ গুণটি আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে, তা হলো উনার প্রশ্ন করার ক্ষমতা। উনি প্রশ্ন করেছেন ধর্ম নিয়ে, ঈশ্বর নিয়ে। প্রশ্ন করেছেন আত্মা, পরকাল নিয়ে। ধর্মের সাথে দর্শন আর বিজ্ঞানের অসামঞ্জস্য নিয়েও বিস্তর আলাপ করেছেন। উনার প্রশ্ন করার এই ক্ষমতাকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু উনি যে বিশেষ অ্যাঙ্গেল থেকে প্রশ্ন করে ধর্মকে, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, সেই অ্যাঙ্গেলটা আসলে মূল ইসলাম না।

আগেই বলেছিলাম, প্রশ্ন করতে পারাটা সাধুবাদের। কিন্তু প্রশ্নের সোর্স যদি ভুল হয়, সঠিক উত্তরের আশা করাটা তখন বোকামিমাত্র। আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হয়েছে। উনি ভুল ইসলাম দিয়ে মূল ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। উনার জানা “ইসলাম” টা যে আসল ইসলাম নয়, সেটাই এই বইতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া এ জন্যই যে, প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ এর পরে তিনি আমাকে আরও একটি কাজ সমাপ্ত করার তাওফিক দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

বইটি লিখতে গিয়ে আমাকে এমন কিছু বিষয়ের মুখখামুখি হতে হয়েছে, যা উম্মাহর মাঝেই ইখতিলাফ তথা মতপার্থক্য আছে। এখন সেই বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়াটা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে আমাকে নির্দিষ্ট একটা অবস্থান থেকে সেই বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা করতে হয়েছে। আমার উদ্দেশ্য ছিল আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের সংশয়বাদী প্রশ্ন এবং যুক্তিগুলোর উত্তরপ্রদান, ইখতিলাফকৃত বিষয় নিয়ে উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করা কখনোই আমার উদ্দেশ্য নয়। সুতরাং বইটি পড়তে গিয়ে কোনো পাঠক যদি এই বইয়ের কোনো কিছুকে উনার বিশ্বাস বা আকীদার সাথে আপাতবিরোধী পায়, তাহলে আমার অনুরোধ, তিনি যেন সেটাকে নিতান্তই ইখতিলাফ ভেবে বইয়ের মূল যে উদ্দেশ্য, সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পাঠ করেন।

এই বইটিতে ভুলত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। বইতে যা কিছু ভুল তা একান্তই আমার পক্ষ থেকে। আর যা কিছু ভালো তা আল্লাহ সুবাহান ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে। রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে অটল, অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন, আমীন।

আরিফ আজাদ